গোল্ডেন রেকর্ড: স্বর্ণে মোড়ানো মহাজাগতিক কলের গান

গোল্ডেন রেকর্ডের প্রচ্ছদছবি: উইকিপিডিয়া

১৯৭৭ সালে গোল্ডেন রেকর্ডের দুটি কপি ভয়েজার–১ ও ভয়েজার–২ নভোযানের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। এই গোল্ডেন রেকর্ডকে বলা যায় এক মহাজাগতিক টাইম ক্যাপসুল। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সৌরজগৎ ও এর বাইরের মহাশূন্যের তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টায় এ প্রকল্প হাতে নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল, নভোযান দুটির মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ ও অন্যান্য বুদ্ধিমান প্রাণী সম্পর্কে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের (যদি থাকে) কিছুটা ধারণা দেওয়া।

এ রেকর্ডে সূচনা বক্তব্য দেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম। রেকর্ডটি চালালেই শোনা যায় তাঁর কথা। তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রহের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমরা সৌরজগৎ থেকে মহাবিশ্বে পা রাখছি শুধু শান্তি ও বন্ধুত্বের সন্ধানে। যদি আমাদের শেখানোর উদ্দেশে ডাকা হয়, তবে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করব। যদি শিখতে চান, তবে সাড়া দেব সানন্দে। আমরা ভালো করেই জানি, আমাদের গ্রহ এবং এর সব অধিবাসী চারপাশে বিরাজমান বিশাল মহাবিশ্বের একটি ছোট্ট অংশ। এটি জেনেবুঝেই আমরা বিনয় ও আশা বুকে নিয়ে এ পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

মানুষের খাওয়া এবং পানি পানের এই চিত্রটি রেকর্ডে রাখা হয়েছে
ছবি: ট্রেভর প্যাগলেন

ওয়াল্ডহেইম এখানে মানবজাতির শেখা এবং শেখানোর কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য বলে, এ রেকর্ড আমাদের মহাজাগতিক পটভূমিতে শেখার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এ রেকর্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো, পৃথিবীর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর সম্পর্কে ভিনগ্রহীদের জানানো। মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়া। বিজ্ঞানীদের আশা, মহাবিশ্বের অন্য কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতা আমাদের পাঠানো এসব তথ্য খুঁজে পেলে পাঠোদ্ধার করতে পারবে।

আরও পড়ুন
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম বলেন, ‘আমাদের গ্রহের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমরা সৌরজগৎ থেকে মহাবিশ্বে পা রাখছি শুধু শান্তি ও বন্ধুত্বের সন্ধানে।'

প্রথম বার্তা

প্রথমবারের মতো মানুষ স্বেচ্ছায় ভিনগ্রহী প্রাণীদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল সংকেতাবদ্ধ একটি বেতার পোস্টকার্ডের মতো করে। এটিকে আরেসিবো বার্তা বলা হয়। ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডের মতোই এতেও মানবজাতির কথা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বাইনারি ভাষা, যেন ভিনগ্রহীরা সহজেই এ বার্তার পাঠোদ্ধার করতে পারে।

বার্তা গ্রহণকারী ০ ও ১ ব্যবহার করে গ্রিডগুলো আবার তৈরি করতে পারবে। বেতারতরঙ্গে পাঠানো মূল বার্তাটিতে নিম্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দিয়ে বোঝানো হয়েছে ০ এবং উচ্চ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দিয়ে বোঝানো হয়েছে ১। এভাবে করে সব কটি গ্রিড তৈরি করে পুরো বার্তাটি বুঝতে পারবে ভিনগ্রহীরা।

আরেসিবো বার্তা
ছবি: উইকিপিডিয়া

গ্রিডগুলো তৈরি করে সঠিক বিন্যাসে সাজালে বোঝা যাবে মানুষের আকৃতি ও তৎকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যার পরিমাণ। সেই সঙ্গে বোঝা যাবে অন্যান্য তথ্যও। বার্তাটি পুয়ের্তো রিকোর আরেসিবো মানমন্দির থেকে সম্প্রচার করা হয়েছিল।

এই বার্তায় আরও ছিল গণিত, ডিএনএ ও সৌরজগতের বিবরণ। বার্তাটি পাঠানোর সময় আরসিবো মানমন্দির ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেডিও টেলিস্কোপ। সে সময় মেসিয়ার ১৩ গ্যালাক্সিপুঞ্জ লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল বার্তাটি।

আরও পড়ুন
বেতারতরঙ্গে পাঠানো মূল বার্তাটিতে নিম্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দিয়ে বোঝানো হয়েছে ০ এবং উচ্চ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দিয়ে বোঝানো হয়েছে ১।

গোল্ডেন রেকর্ডের বিভিন্ন অংশ

১. কীভাবে চালাতে হয়: কীভাবে চালাতে হবে, তা বোঝানোর জন্য রেকর্ডারে একটি ছবি খোদাই করে দেওয়া হয়েছে। রেকর্ডটি চালানোর জন্য স্টাইলাস বা কাঁটার অবস্থান দেখানো হয়েছে বৃত্তের ডানে। এ থেকে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকে কীভাবে চালাতে হবে ডিস্কটি।

২. পাশ থেকে: রেকর্ড ও স্টাইলাসটিকে পাশ থেকে কেমন দেখা যাবে, তা দেখানো হয়েছে। এর নিচে বাইনারি সংখ্যায় লেখা আছে রেকর্ডটির এক পাশ কত সময় ধরে চলবে। স্টাইলাসটি প্রতিবার ঘুরতে ৩ দশমিক ৬ সেকেন্ড সময় নেয়। এভাবে রেকর্ডটির এক পাশ চলবে টানা এক ঘণ্টা।

৩. পালসার ম্যাপ: আশপাশের পালসার নক্ষত্রগুলোর সঙ্গে তুলনা করে আমাদের সৌরজগৎকে রাখা হয়েছে কেন্দ্রে। পালসার হলো দ্রুত ঘূর্ণমান বিকিরণশীল নিউট্রন নক্ষত্র। প্রতিটি রেখা একেকটি পালসারের দূরত্ব বোঝায়।

৪. ছবি নির্মাণ: এই ডায়গ্রাম দেখাচ্ছে, রেকর্ডটি কীভাবে পৃথিবী সম্পর্কিত বিভিন্ন ছবি তৈরি করে। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের গ্রাফটি প্রতিটি স্ক্যানের জন্য ভিডিওর সংকেত দেখাচ্ছে ক্রমানুসারে। ডায়াগ্রামটি দেখাচ্ছে, প্রতিবার স্ক্যান করতে তিন মিলিসেকেন্ড সময় লাগে।

৫. ছবির গ্রিড: এই আয়তাকার ছবির ফ্রেমটি বোঝায়, একটি সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করতে প্রতিটি ফ্রেমের ৫১২টি করে লাইন প্রয়োজন।

৬. সফলভাবে ছবি তৈরির নমুনা: বৃত্তটি দেখাচ্ছে, সফলভাবে একটি ছবি তৈরি করতে পারলে সেটাকে এ রকম দেখাবে।

৭. হাইড্রোজেন পরমাণু: দুটি বৃত্ত দিয়ে হাইড্রোজেন পরমাণু সর্বনিম্ন যে দুটি এনার্জি স্টেট বা শক্তিদশায় থাকতে পারে, তা দেখানো হয়েছে। বৃত্ত দুটির সংযোগরেখা দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, এক দশা থেকে অন্য দশায় আসতে কত সময় লাগে। এর মাধ্যমে রেকর্ডটির ছবিগুলোর বয়স নির্ধারণ করা যাবে।

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তার নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন