সবচেয়ে কম বয়সী এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা, নাম ইলিয়াস
নক্ষত্রের চারপাশের বিশাল গ্যাস ও ধুলার মেঘের ভেতরে লুকিয়ে ছিল বৃহস্পতির সমান এক মহাজাগতিক দানব! বয়স মাত্র ১০ লাখ বছর। কিন্তু বিজ্ঞানীদের আগের সব হিসাব-নিকাশ ও তত্ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এত দ্রুত কীভাবে জন্ম নিল এই বিশাল গ্রহ? আকাশে নতুন করে টেলিস্কোপ না বসিয়ে, পুরোনো দিনের বাতিল ডেটা ঘেঁটেই বিজ্ঞানীরা কীভাবে ধরে ফেললেন এই লুকিয়ে থাকা গ্রহটিকে?
পরিবারে নতুন কোনো শিশুর জন্ম হলে আমরা আনন্দে মিষ্টি বিলাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড করে সবাইকে জানিয়ে দিই। কিন্তু মহাকাশবিজ্ঞানীদের আনন্দ উদ্যাপনের ধরনটা একটু আলাদা। তাঁরা যখন মহাকাশের বিশাল শূন্যতায় নতুন কোনো গ্রহের জন্মের খবর পান, তখন তাঁদের চোখেমুখে যে উত্তেজনা দেখা যায়, তা লটারিতে কোটি টাকা জেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়! সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা মহাকাশের ঠিক এমনই এক আঁতুড়ঘর থেকে সদ্যোজাত এক গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, গ্রহটি এতই ছোট—বয়সের দিক থেকে—যে সে এখনো তার জন্মের সময়কার গ্যাস ও ধুলার মেঘের বিছানাতেই শুয়ে আছে!
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গ্রহের সন্ধান পাওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা নতুন করে কোনো টেলিস্কোপ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেননি। বরং তাঁরা পুরোনো ডেটার বিশাল এক স্তূপ ঘেঁটেই বের করে এনেছেন মহাকাশবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই আবিষ্কার।
মহাকাশবিজ্ঞানীরা যখন মহাকাশের বিশাল শূন্যতায় নতুন কোনো গ্রহের জন্মের খবর পান, তখন তাঁদের চোখেমুখে যে উত্তেজনা দেখা যায়, তা লটারিতে কোটি টাকা জেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়!
আকারে দানব, বয়সে শিশু!
পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৫০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই সদ্যোজাত গ্রহটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইলিয়াস ২-২৪ বি’। বয়সের দিক থেকে এটি একটি নিখাদ শিশু হলেও, আকারের দিক থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির সমান! বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, এই গ্রহটির বয়স ১০ লাখ বছরেরও কম। একটু তুলনা করলেই বুঝবেন এটি কতটা কনিষ্ঠ। পৃথিবীর বয়স যেখানে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর, সেখানে ১০ লাখ বছর মহাকাশের ক্যালেন্ডারে কয়েক মুহূর্তের সমান!
এর আগে মহাকাশে আবিষ্কৃত সবচেয়ে কমবয়সী গ্রহের রেকর্ডটি ছিল চারটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রহের দখলে, যাদের প্রত্যেকের বয়স ছিল ৫০ লাখ বছরের বেশি। চিলির ইনস্টিটিউটো ডি এস্টুডিওস অ্যাস্ট্রোফিসিকোসের অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সহ-লেখক লুকাস সিজা জানিয়েছেন, গ্রহ কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের যে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব বা মডেলগুলো রয়েছে, সেগুলো এমনিতেই আগের ওই ৫০ লাখ বছর বয়সী গ্রহগুলোর জন্মপ্রক্রিয়া মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। আর এখন ইলিয়াসের মতো এত কম সময়ে এত বিশাল এক গ্রহের জন্ম নেওয়াটা প্রমাণ করে দিল, গ্রহ সৃষ্টির অনেক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য এখনো আমাদের অজানা রয়ে গেছে।
বয়সের দিক থেকে ইলিয়াস ২-২৪ বি শিশু হলেও, আকারের দিক থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির সমান! বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছে, এই গ্রহটির বয়স ১০ লাখ বছরেরও কম।
কীভাবে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেলেন এই গ্রহ
বিশাল এই গ্রহের জন্মের খবরটি কিন্তু হুট করে পাওয়া যায়নি। চিলির ইউনিভার্সিডাড দিয়েগো পোর্টালেসের ডক্টরাল ক্যান্ডিডেট আন্দ্রেয়া বার্নার্ডির নেতৃত্বাধীন একদল গবেষক হাওয়াইয়ের ডব্লিউ এম কেক অবজারভেটরির পুরোনো দিনের আর্কাইভ করা ডেটা ঘাঁটতে শুরু করেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল ‘ইলিয়াস ২-২৪’ নামে একটি নক্ষত্র, যার চারপাশে ধুলা ও গ্যাসের বিশাল এক চাকতি ঘুরপাক খাচ্ছে। এর আগে আলমা এবং ভেরি লার্জ টেলিস্কোপের মতো যন্ত্রগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা ইঙ্গিত পেয়েছিলেন, ওই নক্ষত্রের চারপাশের ধুলার চাকতির মাঝে একটি অদ্ভুত ফাঁকা জায়গা রয়েছে।
এই ফাঁকা জায়গার আসল রহস্য ভেদ করতে বার্নার্ডির দল কেক অবজারভেটরির করোনাগ্রাফ যন্ত্রের পুরোনো ডেটা ব্যবহার করেন। করোনাগ্রাফ জিনিসটা আসলে কী? প্রচণ্ড রোদের মধ্যে আকাশের কোনো পাখি দেখতে গেলে আমরা যেমন চোখের ওপর হাত দিয়ে সূর্যের আলো আড়াল করি, করোনাগ্রাফ ঠিক সেই কাজটাই করে। এটি নক্ষত্রের প্রচণ্ড উজ্জ্বল আলো আটকে দেয়, যাতে তার চারপাশে থাকা গ্রহগুলো থেকে প্রতিফলিত হওয়া মৃদু আলো টেলিস্কোপের চোখে ধরা পড়ে।
গবেষকরা ঠিকই ধরেছিলেন! বার্নার্ডি অত্যন্ত রোমাঞ্চিত হয়ে জানান, নক্ষত্রের চারপাশের ধুলাবালির ওই ফাঁকা জায়গায় লুকিয়ে ছিল গ্রহটি। কারণ, একটি গ্রহ যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন সে নিজের কক্ষপথের সমস্ত ধুলা ও গ্যাস নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে সেখানে একটি পরিষ্কার বা ফাঁকা রাস্তা সৃষ্টি হয়। আর ঠিক সেই ফাঁকা রাস্তাতেই দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে সদ্যোজাত ইলিয়াস!
কেক অবজারভেটরির করোনাগ্রাফ যন্ত্রটি নক্ষত্রের প্রচণ্ড উজ্জ্বল আলো আটকে দেয়, যাতে তার চারপাশে থাকা গ্রহগুলো থেকে প্রতিফলিত হওয়া মৃদু আলো টেলিস্কোপের চোখে ধরা পড়ে।
নতুন টেলিস্কোপ ও আগামীর স্বপ্ন
এত অল্প বয়সী একটি গ্রহকে তার জন্মের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে দেখতে পাওয়াটা বিজ্ঞানীদের জন্য হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। গ্যালাক্সিতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্রহ-নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের বর্তমান টেলিস্কোপগুলোর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এই শিশু গ্রহগুলো বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।
তবে আশার কথা হলো, গ্রহ খোঁজার এই প্রযুক্তি এখন আরও আধুনিক হচ্ছে। গত ৩০ আগস্ট নাসা মহাকাশে পাঠিয়েছে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। এতে যুক্ত থাকা করোনাগ্রাফটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির। বার্নার্ডি মনে করেন, ইলিয়াসের মতো গ্রহ খুঁজে বের করাটা বর্তমান টেলিস্কোপগুলোর ক্ষমতার একদম শেষ সীমায় ছিল, কিন্তু রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মতো নতুন যন্ত্রের সাহায্যে এমন লুকানো গ্রহ খুঁজে পাওয়া ভবিষ্যতে ডালভাত হয়ে যাবে। ১৬ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি প্রমাণ করে দিল, মহাকাশের রহস্য সমাধানে শুধু একটি টেলিস্কোপ নয়, বরং একাধিক মানমন্দিরের ডেটা একসঙ্গে মেলালেই আসল ম্যাজিকটা ধরা পড়ে!