গোল্ডেন রেকর্ড: মহাজাগতিক সত্তাদের উদ্দেশে মানবজাতির অভূতপূর্ব বার্তা
পাঠকের লেখা
১৯৭৭ সালে একদল বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো সচেতনভাবে মহাবিশ্বের উদ্দেশে একটি বার্তা পাঠান। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা তাদের ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২ মহাকাশযানের সঙ্গে সোনায় মোড়ানো একটি ফোনোগ্রাফ রেকর্ড সংযুক্ত করে। পৃথিবীতে বসবাসরত মানবজাতির অস্তিত্বের নানা উপাদান মহাবিশ্বের সম্ভাব্য বহির্জাগতিক সত্তাদের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এই চেষ্টা করা হয়। আজ সেটি ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড নামেই পরিচিত।
এটি ১২ ইঞ্চি আকৃতির সোনালি প্রলেপযুক্ত তামার একটি চাকতি, যা প্রথমে নিকেল দিয়ে আবৃত করা হয় এবং পরে ইলেকট্রোপ্লেটেড অ্যালুমিনিয়াম কভারে সুরক্ষিত করা হয়। কভারটির ওপর ইউরেনিয়াম-২৩৮-এর প্রলেপ রয়েছে, যার অর্ধায়ু ৪.৪৬৮ বিলিয়ন বছর।
ফলে ধারণা করা হয়, রেকর্ডটি মহাশূন্যে বিলিয়ন বিলিয়ন বছর টিকে থাকতে সক্ষম। জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি এই রেকর্ডের বিষয়বস্তু নির্বাচন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল, সম্ভাব্য ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের কাছে পৃথিবী ও মানবজাতির একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ পরিচয় তুলে ধরা।
গোল্ডেন রেকর্ডটি ১২ ইঞ্চি আকৃতির সোনালি প্রলেপযুক্ত তামার একটি চাকতি, যা প্রথমে নিকেল দিয়ে আবৃত করা হয় এবং পরে ইলেকট্রোপ্লেটেড অ্যালুমিনিয়াম কভারে সুরক্ষিত করা হয়।
গোল্ডেন রেকর্ডে মূলত অডিও, ছবি এবং একটি নির্দেশনা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে সম্ভাব্য ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা এটি বুঝতে ও ব্যবহার করতে পারে। রেকর্ডটির অডিও অংশ শুরু হয় ৫৫টি ভাষায় দেওয়া শুভেচ্ছা বার্তার মাধ্যমে, যা বিশ্বের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষার প্রতিনিধিত্ব করে। এতে সুমেরীয়, আক্কাদীয়, প্রাচীন গ্রিক ও লাতিনের মতো প্রাচীন ভাষা যেমন রয়েছে, তেমনি ম্যান্ডারিন, বাংলা, হিন্দি, আরবি, ইংরেজি, স্প্যানিশসহ বহু আধুনিক ভাষাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই শুভেচ্ছা পর্বের সমাপ্তি ঘটে কার্ল সেগানের ছেলে নিক সেগানের কণ্ঠে বলা ‘পৃথিবীর শিশুদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা’ বার্তার মাধ্যমে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এবং জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইমের আনুষ্ঠানিক বার্তাও এতে সংযোজন করা হয়।
প্রায় ১২ মিনিটব্যাপী ‘পৃথিবীর শব্দ’ অংশে ধরা পড়েছে প্রকৃতি ও জীবনের বৈচিত্র্য। আগ্নেয়গিরির গর্জন, বজ্রপাত, সমুদ্রের ঢেউ, পাখি ও তিমির ডাকের পাশাপাশি মানুষের হৃৎস্পন্দন, হাসি, পদচারণ, এমনকি প্রযুক্তির শব্দও এতে রয়েছে। একটি বিশেষ সংযোজন হিসেবে মোর্স কোডে ‘Per aspera ad astra’ (লাতিন প্রবাদ: কষ্টের পথ পেরিয়ে নক্ষত্রের পানে) বাক্যাংশ এবং অ্যান ড্রুইয়ানের মস্তিষ্কের তরঙ্গও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গোল্ডেন রেকর্ডে ১১৫টি ছবি অ্যানালগ সংকেতে সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে বৈজ্ঞানিক ধারণা, মানবদেহ, ডিএনএ, প্রকৃতি, প্রাণীজগৎ এবং মানবসমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রায় ৯০ মিনিটব্যাপী সংগীতে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করে। বাখ, মোজার্ট ও বিথোভেনের ধ্রুপদি সুরের পাশাপাশি লুই আর্মস্ট্রং, ব্লাইন্ড উইলি জনসন ও চাক বেরির কাজও এতে স্থান পেয়েছে। ভারত, চীন, বুলগেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার সংগীত ঐতিহ্যও এই বাছাইয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ ছাড়া ১১৫টি ছবি অ্যানালগ সংকেতে সংরক্ষিত হয়েছে, যেখানে বৈজ্ঞানিক ধারণা, মানবদেহ, ডিএনএ (DNA), প্রকৃতি, প্রাণীজগৎ এবং মানবসমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এর সঙ্গে একটি বিশেষ নির্দেশনা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল, যা রেকর্ডটি কীভাবে চালাতে হবে এবং এর তথ্য কীভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, তা বোঝাতে সাহায্য করে।
বর্তমানে ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন মাইলেরও বেশি দূরে হেলিওস্ফিয়ারের বাইরে আন্তনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে অবস্থান করছে, যেখান থেকে এটি প্লাজমা ঘনত্ব, চৌম্বকক্ষেত্র এবং মহাজাগতিক রশ্মি সম্পর্কিত তথ্য পাঠাচ্ছে। ভয়েজার-২ বহু বিলিয়ন মাইল অতিক্রম করে সৌরজগতের সীমানার বাইরে প্রবেশ করেছে এবং অনুরূপ বৈজ্ঞানিক তথ্য সরবরাহ করছে। এভাবেই গোল্ডেন রেকর্ডটি এখন পৃথিবী থেকে অসীম দূরত্বে গভীর মহাশূন্যে নীরবে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছে।