হৃদস্পন্দনে এক মহাজাগতিক প্রেমগাথা ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড

ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডের প্রছদছবি: সংগৃহীত

ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড কেবল ধাতব চাকতিতে খোদাই করা কিছু তথ্য বা শব্দের সমষ্টি নয়; এটি মানবসভ্যতার অসাধারণ এক আবেগ, ভালোবাসার এক মহাজাগতিক দলিল। ১৯৭৭ সালে যখন ভয়েজার মহাকাশযান পৃথিবী ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়, তখন সে সঙ্গে করে নিয়ে যায় বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের স্বপ্ন ও অ্যান ড্রুয়ানের হৃদস্পন্দন। এটি এমন এক গল্প, যেখানে বিজ্ঞান ও রোমান্টিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল এয়ার ফোর্স স্টেশন থেকে শুরু হয় এই ঐতিহাসিক যাত্রা। ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট লঞ্চ কমপ্লেক্স ৪১ থেকে ভয়েজার ২ প্রথম উৎক্ষেপণ করা হয়। যদিও এটি আগে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এর যাত্রাপথ ছিল ভয়েজার ১-এর তুলনায় দীর্ঘতর। এর ঠিক কিছুদিন পর, ৫ সেপ্টেম্বর একই স্থান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার ১।

দুটি মহাকাশযানই টাইটান ৩ই-সেন্টর রকেটের পিঠে চড়ে মহাশূন্যের অসীম শূন্যতার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল।

ভয়েজার ১
ছবি: নাসা

এই রেকর্ডটি তৈরির পেছনে ছিল একদল গুণী মানুষের নিরলস পরিশ্রম। প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ কার্ল সেগানের নেতৃত্বে গঠিত এই দলে ছিলেন বিখ্যাত ড্রেক সমীকরণের স্রষ্টা ফ্রাঙ্ক ডি. ড্রেক, ডকুমেন্টারি প্রযোজক ও বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার বিশেষজ্ঞ অ্যান ড্রুয়ান। তিনি পরে কার্ল সেগানের জীবনসঙ্গী হন। আরও ছিলেন বিজ্ঞান লেখক এবং রেকর্ডটির অন্যতম প্রযোজক টিমথি ফেরিস, মহাজাগতিক শিল্পী ও বিজ্ঞান সাংবাদিক জন লোমবার্গ; শিল্পী, লেখক এবং নভোযানের বার্তা ফলকটির নির্মাতা লিন্ডা সলজম্যান সেগান। এই স্বাপ্নিকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় প্রস্তুত হয়েছিল ৫ ঘণ্টার এক অমূল্য আর্কাইভ, গোল্ডেন রেকর্ড।

আরও পড়ুন
১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট লঞ্চ কমপ্লেক্স ৪১ থেকে ভয়েজার ২ প্রথম উৎক্ষেপণ করা হয়। যদিও এটি আগে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এর যাত্রাপথ ছিল ভয়েজার ১-এর তুলনায় দীর্ঘতর।

দিনটি ছিল ১৯৭৭ সালের ১ জুন। ভয়েজার নভোযান উৎক্ষেপণের তখন মাত্র কয়েক মাস বাকি। রেকর্ডটির জন্য উপযুক্ত শব্দ ও সংগীত নির্বাচনের গুরুদায়িত্ব ছিল অ্যান ড্রুয়ানের ওপর। একটি প্রাচীন চীনা সুর খুঁজে পাওয়ার পর বেশ উত্তেজিত হয়ে তিনি কার্ল সেগানকে ফোন করেন। সেই কলটি আর দশটা সাধারণ কাজের আলোচনার মতো ছিল না। ফোনের দুই প্রান্তের নীরবতা ও সুরের আলাপ যেন এক অদৃশ্য টানে তাঁদের বেঁধে ফেলেছিল।

অ্যান ড্রুয়ান পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সেই একটি ফোন কলেই আমরা একে অপরকে পাওয়ার অভাবনীয় আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলাম, যা কোনো পার্থিব ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা যখন ফোন রাখলাম, জানতাম আমরা প্রেমে পড়েছি।’

কার্ল সেগান ও তাঁর স্ত্রী অ্যান ড্রুয়ান
ছবি: পিটার মোরেনাস / কর্নেল ইউনিভার্সিটি

এই প্রেমের গল্পের সবচেয়ে শিহরণ জাগানো অংশটি হলো অ্যান ড্রুয়ানের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বা ইইজি রেকর্ডিং। গোল্ডেন রেকর্ডে মানুষের জীবনের লক্ষণ হিসেবে অ্যানের মস্তিষ্ক ও হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেত রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রেকর্ডিং রুমে একা বসে অ্যান যখন ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর মনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল পৃথিবীর ইতিহাস, দর্শন এবং মানুষের পরিবর্তনের গল্প। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর অবচেতনে ছিল কার্ল সেগানের প্রতি সদ্য অঙ্কুরিত তীব্র ভালোবাসা। বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, এটি ছিল প্রেমে পড়ার স্নায়বিক স্বাক্ষর, যা এখন কোটি কোটি মাইল দূরে আন্তনাক্ষত্রিক মহাকাশে অমর হয়ে আছে।

আরও পড়ুন
অ্যান ড্রুয়ান পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সেই একটি ফোন কলেই আমরা একে অপরকে পাওয়ার অভাবনীয় আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলাম, যা কোনো পার্থিব ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।'

পৃথিবী থেকে মানুষ বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ভয়েজারের সেই রেকর্ডে থেকে যাবে এক মানবীর প্রেমে পড়ার সেই অমোঘ মুহূর্তটি। উল্লেখ্য, ইইজি রেকর্ডিংয়ের সময় সেখানে কেবল তাঁর প্রেমই ছিল না, ছিল একটি প্রশ্নও। রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, আমরা কি এই সংঘাতময় পৃথিবী থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারব? আমরা কি টিকে থাকতে পারব?

আজ যখন ভয়েজার আন্তনাক্ষত্রিক মহাকাশে একা ভ্রমণ করছে, তখন সে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে একধারে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার শঙ্কা এবং প্রেমে পড়ার গভীর আনন্দ।

চীনা সংগীতের ক্ষেত্রে তাঁদের নির্বাচন ছিল লিও শুই বা প্রবহমান জল। সাত তারের প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র চিনের (Guqin) মাধ্যমে বাজানো এই সুরটি মহাকাশযানে পাঠানোর পেছনে ছিল গভীর দর্শন। সুরটি কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রখ্যাত শিল্পী কুয়ান পিং-হুর জাদুকরী আঙুলের ছোঁয়ায় এই রেকর্ডটি প্রাণ পেয়েছিল। এটি গোল্ডেন রেকর্ডের অন্যতম দীর্ঘতম ট্র্যাক (৭ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড), যা এর বিশেষ গুরুত্ব প্রমাণ করে।

চিন বা গুচিনকে চীনের সবচেয়ে অভিজাত ও দার্শনিক বাদ্যযন্ত্র মনে করা হয়। এটি বাজানো হতো মূলত ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে। এর গম্ভীর ও নিগূঢ় শব্দ ভিনগ্রহের কোনো উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিকে মানুষের ধৈর্য ও গভীরতা সম্পর্কে ধারণা দেবে। প্রবহমান জলের সুরটি এমনভাবে বাজানো হয়, যা পাহাড়ি ঝরনা, নদী বা সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দকে বিমূর্তভাবে ফুটিয়ে তোলে। এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে আদি ও অকৃত্রিম সংযোগ, তারই এক মহাজাগতিক প্রতিধ্বনি।

আরও পড়ুন
চিন বা গুচিনকে চীনের সবচেয়ে অভিজাত ও দার্শনিক বাদ্যযন্ত্র মনে করা হয়। এটি বাজানো হতো মূলত ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে।

তবে কেবল চীনা সুরই নয়, এই রেকর্ডে স্থান পেয়েছে মানুষের বৈচিত্র্যময় সব সৃষ্টি। একদিকে যেমন বিঠোভেনের ফিফথ সিম্ফনি মানুষের অদম্য জেদকে তুলে ধরে, অন্যদিকে ভারতের কেশরবাই কেরকরের কণ্ঠে জাত কাঁহা হো (ভৈরবী রাগ) মানুষের আধ্যাত্মিক আর্তি প্রকাশ করে। এমনকি চাক বেরির ‘জনি বি. গুড’ গানটির মাধ্যমে মানুষের জীবনের আনন্দ ও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকেও মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।

এই প্রেমের গল্পটি পূর্ণতা পায় ১৯৯০ সালে, যখন কার্ল সেগানের অনুরোধে ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে একটি ছবি তোলে। সেই ছবিতে পৃথিবীকে মনে হচ্ছিল মহাজাগতিক অন্ধকারের মাঝে ভেসে থাকা একটি সামান্য ধূলিকণা। এই ছবি দেখেই সেগান তাঁর বিখ্যাত পেল ব্লু ডট বা বিবর্ণ নীল বিন্দুর দর্শন ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এই বিন্দুটিই আমাদের ঘর। এখানে যাদের আমরা ভালোবাসি, তারা সবাই এক ক্ষুদ্র আশ্রয়ে বাস করছি।

সেগানের এই দর্শন অ্যানের সেই হৃদস্পন্দনের রেকর্ডিংকে এক নতুন মাত্রা দেয়। মহাবিশ্বের এই অসীম শূন্যতায় আমাদের অস্তিত্ব কতটা ভঙ্গুর, তা যেমন এই ছবি বলে দেয়, তেমনি অ্যানের হৃদস্পন্দন বলে দেয় যে সেই ভঙ্গুরতার মাঝেই ভালোবাসা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আরও পড়ুন
১৯৯০ সালে কার্ল সেগানের অনুরোধে ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে একটি ছবি তোলে। এই ছবি দেখেই সেগান তাঁর বিখ্যাত বিবর্ণ নীল বিন্দুর দর্শন ব্যক্ত করেন।

ভয়েজার যখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে নক্ষত্ররাজির দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন কার্ল এবং অ্যান একে অপরের জীবনসঙ্গী হওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে কার্ল সেগান না ফেরার দেশে চলে গেলেও অ্যান ড্রুয়ান আজও সেই মহাজাগতিক মশাল বহন করে চলেছেন। ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডটি এখন এক নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক, যার বুকে সযত্নে রাখা আছে কার্লের দূরদর্শী স্বপ্ন এবং অ্যানের সেই দিনের স্পন্দিত হৃদয়। এটি দূর মহাকাশের কোনো অচেনা সভ্যতাকে উদ্দেশ্য করে বলা আমাদের বিনীত বার্তা:

‘তোমরা যে-ই হও, জেনে রেখো—আমরা একসময় ছিলাম, আমরা গান গাইতাম এবং আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছিলাম।’

আরও পড়ুন