সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হওয়ার আগে একটি নক্ষত্রের ভেতরে কী ঘটে

সুপারনোভার কাল্পনিক ছবিছবি: ইএসও / এল. কালস্যাডা

মহাকাশে যখন বিশাল কোনো নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তখন কী হয় জানেন? নক্ষত্রটি তার নিজের বিশাল ভরের চাপ আর ধরে রাখতে পারে না। ভেতরের কেন্দ্র বা কোরটি মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। এরপরই ঘটে মহাবিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ও সুন্দর এক ঘটনা—সুপারনোভা বিস্ফোরণ! একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় টাইপ টু কোর-কল্যাপ্স সুপারনোভা। এই বিস্ফোরণ এতই উজ্জ্বল হয় যে, এটি কয়েক মাস ধরে পুরো একটি গ্যালাক্সির আলোকেও হার মানাতে পারে!

আকাশে হঠাৎ এত উজ্জ্বল কিছু জ্বলে উঠলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নজর তো সেদিকে যাবেই। হাজার বছর আগের প্রাচীন চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই সুপারনোভাগুলোকে বলতেন অতিথি নক্ষত্র। কারণ এগুলো হঠাৎ আকাশে উদয় হতো, কিছুদিন অতিথি হয়ে থাকত, তারপর চিরতরে মিলিয়ে যেত। ১০৫৪ সালে তারা এমন একটি সুপারনোভা খুব নিখুঁতভাবে নথিবদ্ধ করেছিলেন, যা আজ আমাদের কাছে ক্র্যাব নেবুলা নামে পরিচিত।

বিজ্ঞানের এত উন্নতির পরও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মনে সুপারনোভা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিস্ফোরণের আগে নক্ষত্রের বাইরের বিশাল আবরণ এবং বিস্ফোরণের আলোর তীব্রতা নিয়ে কিছু রহস্য এখনো কাটেনি। সম্প্রতি দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত দুটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র এই রহস্যের অনেকটাই সমাধান করেছে। চলুন, সুপারনোভা হওয়ার ঠিক আগে একটি নক্ষত্রের ভেতরে কী কী ঘটে, তা জেনে নিই!

আরও পড়ুন
১০৫৪ সালে প্রাচীন চীনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন একটি সুপারনোভা খুব নিখুঁতভাবে নথিবদ্ধ করেছিলেন, যা আজ আমাদের কাছে ক্র্যাব নেবুলা নামে পরিচিত।

রেড সুপারজায়ান্ট হওয়ার রহস্য

সব নক্ষত্র কিন্তু সুপারনোভা হয়ে ফাটে না। এর জন্য নক্ষত্রটিকে অনেক বিশাল ভরের হতে হয়। আর সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হওয়া নক্ষত্রগুলোর বেশির ভাগই রেড সুপারজায়ান্ট। যেমন আমাদের কালপুরুষ মণ্ডলের বেটেলজিউস নক্ষত্রটি। এটি গত ৪০ হাজার বছর ধরে একটি রেড সুপারজায়ান্ট হিসেবে আছে এবং ধারণা করা হয় আগামী এক লাখ বছরের মধ্যে এটি সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হবে।

কিন্তু একটি নক্ষত্র কেন রেড সুপারজায়ান্ট হয়, আর কেনই বা ব্লু সুপারজায়ান্ট হিসেবে থেকে যায়? গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নক্ষত্র রেড সুপারজায়ান্ট হবে কি না, তার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা বা থ্রেশহোল্ড আছে। এই সীমারেখাটি হলো আমাদের সূর্যের ভারী মৌলের মাত্রার অন্তত এক-দশমাংশ। যেসব নক্ষত্রের ভারী মৌলের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি, তাদের ব্যাসার্ধ অনেক বড় হয়। ব্যাসার্ধ বড় হওয়ার কারণে নক্ষত্রের বাইরের স্তরে মহাকর্ষের টান আলগা হয়ে যায়। ফলে নক্ষত্রের নিজস্ব ঝড় খুব সহজেই বাইরের দিকের ভরকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে। এতে নক্ষত্রটি ফুলেফেঁপে একটি রেড সুপারজায়ান্ট হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, যেসব নক্ষত্রের ধাতবতা এই সীমার নিচে থাকে, তাদের ব্যাসার্ধ ছোট ও আঁটসাঁট হয়। ফলে তারা ফুলেফেঁপে ওঠার সুযোগ না পেয়ে ব্লু সুপারজায়ান্ট হিসেবেই থেকে যায়।

আরও পড়ুন
গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নক্ষত্র রেড সুপারজায়ান্ট হবে কি না, তার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা বা থ্রেশহোল্ড আছে। এই সীমারেখাটি হলো আমাদের সূর্যের ভারী মৌলের মাত্রার অন্তত এক-দশমাংশ।

বিস্ফোরণের ঠিক আগের মুহূর্ত

সুপারনোভা বলতেই আমরা যে ঝলমলে বিস্ফোরণের ছবি কল্পনা করি, তাকে বলা হয় শক ব্রেকআউট। এটি হলো বিস্ফোরণের প্রথম দৃশ্যমান আলো! কিন্তু বাইরে আলো দেখার অনেক আগেই নক্ষত্রের অনেক গভীরে এই শকওয়েভ বা ধাক্কা শুরু হয়ে যায়। সেই ধাক্কা নক্ষত্রের বুক চিরে একেবারে বাইরের পৃষ্ঠে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

দ্বিতীয় গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক উন-ই চেন প্রথমবারের মতো টু-ডাইমেনশনাল মাল্টিগ্রুপ রেডিয়েশন-হাইড্রোডাইনামিক সিমুলেশন ব্যবহার করে এই শক ব্রেকআউটটি পরীক্ষা করেছেন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সুপারনোভাগুলোর আলোর বক্ররেখা মিলিয়ে দেখেছেন, কিছু কিছু সুপারনোভার শক ব্রেকআউট দেখা দিতে অনেক বেশি সময় লাগে এবং তাদের আলো তুলনামূলক ম্লান হয়। আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, নক্ষত্রটি হয়তো তার প্রচুর ভর হারিয়ে ফেলার কারণেই এমনটা ঘটে। কিন্তু উন-ই চেনের গবেষণা বলছে অন্য কথা!

তিনি দেখিয়েছেন, এর মূল কারণ অতিরিক্ত ভর হারানো নয়, বরং রেডিয়েশন প্রিকার্সর এবং নক্ষত্রের চারপাশের ঘন পরিবেশ। শক ওয়েভ বা মূল ধাক্কাটি নক্ষত্রের পৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই কিছু বিকিরণ সামনের দিকে লিক হয়ে বেরিয়ে যায়। এই বিকিরণগুলো নক্ষত্রের দৃশ্যমান পৃষ্ঠকে ধাক্কা দিয়ে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। একই সঙ্গে নক্ষত্রের চারপাশের ঘন গ্যাসে ফোটন কণাগুলো আটকে গিয়ে আলোর গতি ধীর করে দেয়। আর ঠিক এ কারণেই কিছু কিছু সুপারনোভার শক ব্রেকআউট দেরিতে এবং একটু ম্লান হয়ে আমাদের চোখে ধরা পড়ে।

আরও পড়ুন
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সুপারনোভাগুলোর আলোর বক্ররেখা মিলিয়ে দেখেছেন, কিছু কিছু সুপারনোভার শক ব্রেকআউট দেখা দিতে অনেক বেশি সময় লাগে এবং তাদের আলো তুলনামূলক ম্লান হয়।

এই দুটি গবেষণা শুধু দূরের সুপারনোভাগুলোর পেছনের রহস্যই ভেদ করেনি, বরং আমাদের ভবিষ্যতের জন্য দারুণ ভিত্তি তৈরি করেছে। খুব শিগগিরই আমরা লাখ লাখ নতুন সুপারনোভার সন্ধান পেতে যাচ্ছি! এ বছরের শেষের দিকেই বিখ্যাত ভেরা রুবিন অবজারভেটরি মহাকাশ জরিপের কাজ শুরু করবে। মানমন্দিরটির নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, এটি তার জীবদ্দশায় প্রায় এক কোটি সুপারনোভা আবিষ্কার করবে বলে আশা করা হচ্ছে! এটি বিজ্ঞানীদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক বিশাল গুপ্তধনের বাক্স।

মহাকাশের গভীরে যখন কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো নক্ষত্র প্রচণ্ড শক্তিতে বিস্ফোরিত হবে, তখন এই নতুন গবেষণাগুলোই আমাদের বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করবে, সেই বিশাল আতশবাজির আড়ালে আসলে কোন গল্পটি লুকিয়ে আছে!

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: ইউনিভার্স টুডে

আরও পড়ুন