নভোচারীদের একটি স্পেসস্যুটের ওজন কত

একটি স্পেসস্যুটের ওজন আসলে কত হতে পারে?ছবি: ব্লু প্ল্যানেট স্টুডিও/শাটারস্টক

মহাকাশের ছবি বা ভিডিওতে একটি সাধারণ জিনিস দেখা যায়—সাদা রঙের বিশাল এক পোশাক পরে নভোচারীরা শূন্যে ভাসছেন বা চাঁদের বুকে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছেন। এই বিশেষ পোশাকটিকে বলা হয় স্পেসস্যুট। মহাকাশের চরম প্রতিকূল পরিবেশে একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই পোশাকের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একটি স্পেসস্যুটের ওজন আসলে কত হতে পারে? এত বিশাল ও ফোলাফাঁপা একটি পোশাক পরে নভোচারীরা কীভাবে হাঁটাচলা করেন?

এই প্রশ্নের কোনো একক বা নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কারণ, একটি স্পেসস্যুটের ওজন কত হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে এর নকশা এবং এটি কোথায় ব্যবহার করা হবে, তার ওপর। মহাকাশযাত্রার ধরন ও গন্তব্য অনুযায়ী স্পেসস্যুটের কাজ ও গঠন বদলে যায়, সঙ্গে বদলে যায় এর ওজনও।

এত বিশাল ও ফোলাফাঁপা একটি পোশাক পরে নভোচারীরা কীভাবে হাঁটাচলা করেন?
ছবি: নাসা

মহাকাশ অভিযানের শুরুর দিকের কথা ধরা যাক। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিককার নভোচারীদের মহাকাশযান থেকে বাইরে বেরোনোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল নভোযানের ভেতরে থেকেই মিশন শেষ করে পৃথিবীতে ফিরে আসা। তাই তাঁদের স্পেসস্যুটগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে বেশ হালকা। সেগুলো মূলত বিমানের পাইলটদের পরা ফ্লাইট প্রেসার স্যুটেরই একটি পরিমার্জিত রূপ ছিল। এই ধরনের একেকটি স্যুটের ওজন ছিল মাত্র ১০ কেজির কাছাকাছি। নভোযানের ভেতরে হঠাৎ করে বায়ু চাপ কমে গেলে বা কোনো জরুরি অবস্থা তৈরি হলে এই পোশাকগুলো নভোচারীদের সুরক্ষা দিত। এর বেশি কিছু করার জন্য এগুলো তৈরি করা হয়নি।

আরও পড়ুন
একবার চিন্তা করে দেখুন, ৮২ কেজি মানে প্রায় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওজনের সমান! এত বিশাল ওজন পিঠে নিয়ে পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করাই প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন নভোচারীরা নভোযানের সুরক্ষিত ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে শূন্য মহাকাশে ভাসার বা চাঁদের বুকে হাঁটার পরিকল্পনা করেন। মহাকাশের বাইরে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, আছে চরম তাপমাত্রা, নিখাদ বায়ুশূন্যতা এবং মারাত্মক সব মহাজাগতিক বিকিরণ। এই সবকিছু থেকে বাঁচতে মহাকাশচারীদের এমন এক পোশাকের দরকার ছিল, যাতে অনেকগুলো সুরক্ষামূলক স্তর বা লেয়ার থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই পোশাকগুলো আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যে স্পেসস্যুট পরে চাঁদের বুকে হেঁটেছিলেন, পৃথিবীতে তার ওজন ছিল প্রায় ৮২ কেজি!
ছবি: স্মিথসোনিয়ানস ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম/স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন

চাঁদে মানুষের প্রথম পা রাখার সেই ঐতিহাসিক অ্যাপোলো মিশনগুলোর কথাই ধরুন। অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যে স্পেসস্যুট পরে চাঁদের বুকে হেঁটেছিলেন, পৃথিবীতে তার ওজন ছিল প্রায় ৮২ কেজি! এর মধ্যে শুধু পোশাকটিই নয়, বরং পিঠে বাঁধা লাইফ-সাপোর্ট ব্যাকপ্যাক এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্যাকপ্যাকটি মূলত একটি ছোট্ট মহাকাশযানের মতো কাজ করত, যা মহাকাশচারীকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিত, কার্বন ডাই-অক্সাইড ফিল্টার করত এবং শরীর ঠান্ডা রাখত। একবার চিন্তা করে দেখুন, ৮২ কেজি মানে প্রায় একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ওজনের সমান! এত বিশাল ওজন পিঠে নিয়ে পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করাই প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন
চাঁদে মানুষের প্রথম পা রাখার ঐতিহাসিক অ্যাপোলো মিশনগুলোর কথাই ধরুন। অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যে স্পেসস্যুট পরে চাঁদের বুকে হেঁটেছিলেন, পৃথিবীতে তার ওজন ছিল প্রায় ৮২ কেজি!

তাহলে নভোচারীরা চাঁদে এত সহজে লাফিয়ে লাফিয়ে কীভাবে হাঁটলেন? এখানে পদার্থবিজ্ঞান তাঁদের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে কাজ করেছে। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যে স্পেসস্যুটের ওজন ৮২ কেজি, চাঁদের বুকে তার ওজন দাঁড়ায় মাত্র ১৩.৬ কেজির মতো। মহাকর্ষের এই সুবিধার কারণেই এত ভারী ও বিশাল পোশাক পরা সত্ত্বেও অ্যাপোলো নভোচারীরা খুব সহজেই চাঁদের পৃষ্ঠে ঘুরে বেড়াতে পেরেছিলেন। তাদের হাঁটাচলায় খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

পৃথিবীতে যে স্পেসস্যুটের ওজন ৮২ কেজি, চাঁদের বুকে তার ওজন দাঁড়ায় মাত্র ১৩.৬ কেজির মতো
ছবি: ব্রিটানিকা

বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্পেসস্যুট তৈরির উপকরণেরও অনেক উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যে আধুনিক স্পেসস্যুটগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো অ্যাপোলো আমলের মতো অতটা বিশাল বা ভারী নয়। উন্নত উপাদানের কারণে এগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়। তা ছাড়া মহাকাশ স্টেশন পৃথিবীর কক্ষপথে ভাসমান অবস্থায় থাকায় সেখানে সবকিছুই ওজনহীন অবস্থায় থাকে। তাই স্পেসস্যুটের ভর যা-ই থাকুক না কেন, শূন্য মাধ্যাকর্ষণে নভোচারীদের কোনো ওজন অনুভব করতে হয় না।

আরও পড়ুন
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ, পৃথিবীতে যে স্পেসস্যুটের ওজন ৮২ কেজি, চাঁদের বুকে তার ওজন দাঁড়ায় মাত্র ১৩.৬ কেজির মতো।

তবে মহাকাশ প্রকৌশলীদের আসল চ্যালেঞ্জ এখন মঙ্গল গ্রহকে ঘিরে। মঙ্গল গ্রহে মানুষের পা ফেলার স্বপ্ন এখন আর সায়েন্স ফিকশন নয়। কিন্তু মঙ্গলে নভোচারীরা কী পরবেন? মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ বল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কিছুটা কম, প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ, মঙ্গলে মাধ্যাকর্ষণ চাঁদের অর্ধেকেরও বেশি শক্তিশালী। চাঁদের মতো সেখানে স্পেসস্যুটের ওজন একদম কমে যাবে না। একটি ৮২ কেজির স্যুট মঙ্গলে প্রায় ৩১ কেজির মতো ভারী মনে হবে, যা নিয়ে টানা কয়েক ঘণ্টা ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বা হাঁটাচলা করা অত্যন্ত কষ্টকর।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৌশলীরা এখন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের, ওজনে অনেক হালকা স্পেসস্যুট তৈরি করার কাজ করছেন। এই নতুন প্রজন্মের স্পেসস্যুটগুলোতে এমন সব উন্নত উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নভোচারীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নড়াচড়াকে আরও সহজ করবে। ভবিষ্যতে যখন মানুষ মঙ্গলের লাল মাটিতে পা রাখবে, তখন এই হালকা ও অত্যাধুনিক স্পেসস্যুটগুলোই হবে তাদের বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার।

সূত্র: হাউ ইট ওয়ার্কস

আরও পড়ুন