চাঁদের উদ্দেশ্যে আর্টেমিস ২ পৃথিবী ছাড়বে ৬ মার্চ

আর্টেমিস ২ নভোযানছবি: নাসা

সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ৬ মার্চ চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি জমাচ্ছে নাসার আর্টেমিস ২ মিশন। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর এই প্রথম মানুষ আবারও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে যাচ্ছে। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের এই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে যাচ্ছেন চার নভোচারী।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি নাসা এক দারুণ খুশির খবর দিয়েছে। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের প্যাড ৩৯বি-তে ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল বা রকেটে জ্বালানি ভরার চূড়ান্ত মহড়া একদম সফলভাবে শেষ হয়েছে। এর আগে, গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম মহড়ার সময় রকেটের জ্বালানি সরবরাহের পাইপে তরল হাইড্রোজেন লিক করায় পরীক্ষাটি মাঝপথেই থামিয়ে দিতে হয়। মনে থাকার কথা, আগের আর্টেমিস ১ মিশনের সময়ও ঠিক এই একই জায়গায় লিক হওয়ার কারণে উৎক্ষেপণ কয়েক মাস পিছিয়ে গিয়েছিল।

নাসার আর্টেমিস ২ নভোযান আগামী ৬ মার্চ চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করবে
ছবি: নাসা

তবে এবার আর সেই ভুল হয়নি। প্রকৌশলীরা পাইপের দুটি সিল বদলে দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি ছোট একটা পরীক্ষা করেন। এরপর চূড়ান্ত মহড়ায় রকেটের কোর এবং আপার স্টেজে ঢালা হয় প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার লিটার অতি-শীতল তরল হাইড্রোজেন এবং তরল অক্সিজেন। লঞ্চ ডিরেক্টর চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে জানিয়েছেন, ‘কোথাও এক ফোঁটাও লিক হয়নি। রকেটটি দারুণ পারফর্ম করেছে।’

আরও পড়ুন
চূড়ান্ত মহড়ায় রকেটের কোর এবং আপার স্টেজে ঢালা হয় প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার লিটার অতি-শীতল তরল হাইড্রোজেন এবং তরল অক্সিজেন।

তবে ৬ মার্চ ওড়ার আগে আরও কিছু কাজ বাকি আছে। এসএলএস রকেটের লঞ্চ টাওয়ারে এখন দুটি বিশেষ ট্রাস বসাতে হবে, যাতে লঞ্চ প্যাডেই ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেম পরীক্ষা করা যায়। আর্টেমিস ১-এর সময় এই পরীক্ষার জন্য পুরো রকেটকে আবার অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ে ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। এবার সেই প্রযুক্তিগত উন্নতি হওয়ায় প্যাডেই কাজ সারা যাবে।

এই ঐতিহাসিক মিশনে নাসার তিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন প্রায় ১০ দিনের জন্য চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। মহাকাশযাত্রার সাধারণ নিয়ম মেনে তাঁরা সবাই হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারে কোয়ারেন্টিনে সময় কাটাচ্ছেন। উৎক্ষেপণের ঠিক ৫ দিন আগে তাঁরা কেনেডি স্পেস সেন্টারে ফিরবেন।

আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী হলেন রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন
ছবি: নাসা

আর্টেমিস ২-এর উৎক্ষেপণ করা হবে ৬ মার্চ। কিন্তু কোনো কারণে সেদিন উৎক্ষেপণ সম্ভব না হলে ১০ মার্চ পর্যন্ত চেষ্টা চালানো হবে। আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে এই সময়ে রকেট উড়তে না পারলে অপেক্ষা করতে হবে এপ্রিল পর্যন্ত। সম্ভাব্য ডেটগুলো হলো ১ এপ্রিল, ৩ থেকে ৬ এপ্রিল এবং ৩০ এপ্রিল।

তবে নাসা এবার আত্মবিশ্বাসী। আগেরবার আর্টেমিস ১-এর বারবার তারিখ পেছানোর কারণে অনেকেই হয়তো এবারও সন্দেহ করছেন। কিন্তু লোরি গ্লেজের ভাষায়, ‘সবকিছু এবার সত্যিই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এখন আর জল্পনাকল্পনা নয়, আমাদের সিরিয়াস হওয়ার এবং রোমাঞ্চিত হওয়ার সময় এসে গেছে!’

আরও পড়ুন
এই মিশনে নাসার তিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন প্রায় ১০ দিনের জন্য চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

আশা করা যায়, আগামী ৬ মার্চ চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হবে আর্টেমিস ২ মিশন। এই মিশনে কেউ চাঁদের মাটিতে নামবে না। চার  নভোচারী ওরিয়ন ক্যাপসুলে চড়ে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবেন। তাঁরা চাঁদের ওপাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। ১০ দিনের এই ভ্রমণে তাঁরা নভোযানের সব সিস্টেম পরীক্ষা করবেন, যাতে ভবিষ্যতের ল্যান্ডিং মিশনগুলো নিরাপদ হয়।

এর আগে, ২০২২ সালে নাসা সফলভাবে আর্টেমিস ১ মিশন শেষ করে। সেটা ছিল মানুষবিহীন মিশন। ওরিয়ন ক্যাপসুল চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে। সেই মিশনের মাধ্যমেই বোঝা গেছে, মানুষ আবার চাঁদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তবে সেই মিশনেও এই হাইড্রোজেন লিক বেশ ভুগিয়েছিল।

আর্টেমিস ১ নভোযান
ছবি: নাসা

আর্টেমিস ১ মিশনের সাফল্যের পর এখন সবার চোখ আর্টেমিস ২ মিশনের দিকে। এটি সফল হলেই আসবে সেই আর্টেমিস ৩। এই মিশনেই মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে। নাসা পরিকল্পনা করছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ল্যান্ড করার। আর এবারই প্রথম কোনো নারী এবং অশ্বেতাঙ্গ নভোচারী চাঁদের বুকে হাঁটবেন। তবে সেই স্বপ্নের চাবিকাঠি এখন আর্টেমিস ২-এর হাতে!

সূত্র: স্পেস ডটকম ও বিজ্ঞানচিন্তা ডটকম

আরও পড়ুন