ঘরে বসেই ব্ল্যাকহোল খুঁজে ইতিহাসের অংশ হওয়ার সুযোগ
আপনার ল্যাপটপের স্ক্রিনেই হয়তো লুকিয়ে আছে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এমন এক দানবীয় কৃষ্ণগহ্বর, যাকে আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী খুঁজে পাননি! নাসার টেলিস্কোপের ডেটা ঘেঁটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে ১০ লাখ সম্ভাব্য কৃষ্ণগহ্বরের তালিকা করেছে, তার আসল রহস্য ভেদ করতে এখন ডাক পড়েছে আপনার মতো সাধারণ মানুষের।
মহাকাশ নিয়ে যাঁদের প্রবল আগ্রহ, তাঁরা হয়তো কখনো ভেবেছেন, যদি কোনো কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাকহোল খুঁজে পেতাম! কিন্তু কৃষ্ণগহ্বর খোঁজার জন্য তো আপনাকে নাসার বিজ্ঞানী হতে হবে! তবে নাসা সুযোগ দিয়েছে, বিজ্ঞানী না হয়েও খুঁজতে পারবেন কৃষ্ণগহ্বর। সে জন্য আপনার বাড়ির ছাদে বিশাল কোনো টেলিস্কোপ বসানোরও প্রয়োজন নেই। চাইলে আপনার ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনটি হাতে নিয়েই নিজের সোফায় বসে হয়ে যেতে পারেন মহাকাশের একজন আস্ত গোয়েন্দা।
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছের ব্ল্যাকহোলটির দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ। আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০টি নক্ষত্রের ভরের সমান ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছে বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কড়া হিসাব বলছে, আমাদের এই বিশাল গ্যালাক্সিতেই অন্তত ১০ কোটি কৃষ্ণগহ্বর লুকিয়ে আছে! তাহলে বাকিগুলো গেল কোথায়? সেগুলো খুঁজতেই জুনাইভার্স প্ল্যাটফর্মে শুরু হয়েছে এক দারুণ সিটিজেন সায়েন্স প্রজেক্ট, যেখানে আপনিও অংশ নিয়ে খুঁজে বের করতে পারেন লুকিয়ে থাকা এসব কৃষ্ণগহ্বর।
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছের ব্ল্যাকহোলটির দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ। আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০টি নক্ষত্রের ভরের সমান ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছে বিজ্ঞানীরা।
লুকিয়ে থাকা ব্ল্যাক হোলগুলো আসলে কোথায়
মহাকাশে বেশিরভাগ ব্ল্যাক হোল একা থাকে না, থাকে জোড়ায় জোড়ায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় বাইনারি সিস্টেম। এখানে একটি সাধারণ নক্ষত্র এবং একটি কৃষ্ণগহ্বর একে অপরের চারপাশে ঘুরতে থাকে। সাধারণত বিজ্ঞানীরা দুইভাবে এদের খুঁজে বের করেন। প্রথমত, কৃষ্ণগহ্বর যখন তার সঙ্গী নক্ষত্র থেকে গ্যাস বা পদার্থ চুরি করে নিজের দিকে টেনে নেয়, তখন প্রচণ্ড মহাকর্ষের কারণে সেই পদার্থগুলো জ্বলে ওঠে এবং এক্স-রে রশ্মি ছড়াতে থাকে। দ্বিতীয়ত, সঙ্গী নক্ষত্রটির চলার পথে অদ্ভুত কোনো কাঁপুনি দেখলে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, সেখানে কোনো অদৃশ্য দানব বসে আছে।
কিন্তু যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির অ্যাডাম ম্যাকমাস্টার জানান, তাঁরা এমন কৃষ্ণগহ্বর খুঁজছেন না। তাঁরা খুঁজছেন এমন বাইনারি সিস্টেম, যেখানে নক্ষত্র ও ব্ল্যাকহোলের মাঝখানের দূরত্ব অনেক বেশি। দূরত্ব বেশি হওয়ার কারণে ব্ল্যাকহোলটি নক্ষত্র থেকে কোনো গ্যাস চুরি করতে পারে না। আর গ্যাস চুরি না করলে সেটি কোনো আলো ছড়ায় না। ফলে সেটি মহাকাশের বুকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে থাকে। অ্যাডাম ম্যাকমাস্টার এই নতুন প্রজেক্টেরও নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির অ্যাডাম ম্যাকমাস্টার জানান, তাঁরা এমন কৃষ্ণগহ্বর খুঁজছেন না। তাঁরা খুঁজছেন এমন বাইনারি সিস্টেম, যেখানে নক্ষত্র ও ব্ল্যাকহোলের মাঝখানের দূরত্ব অনেক বেশি।
মহাকর্ষীয় লেন্সিং: অদৃশ্য দানব দেখার জাদুকরী চশমা
এখন প্রশ্ন হলো, যদি ব্ল্যাকহোলগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্যই থাকে, তবে সেগুলো খুঁজবেন কীভাবে? এখানেই চলে আসে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত তত্ত্ব মহাকর্ষীয় লেন্সিং।
ব্ল্যাকহোলের ভর ও ঘনত্ব এতই বেশি যে, এটি তার চারপাশের স্থান-কাল রীতিমতো বাঁকিয়ে দেয়। এখন ভাবুন, একটি কৃষ্ণগহ্বর আর একটি নক্ষত্র একে অপরের চারপাশে ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে ব্ল্যাকহোলটি যখন ঠিক আমাদের এবং ওই নক্ষত্রটির মাঝখানে চলে আসে, তখন তার পেছনের নক্ষত্রের আলো ওই বাঁকানো স্থান-কালের কারণে অনেকটা ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মতো বিশাল ও উজ্জ্বল হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। একে বলা হয় সেলফ-লেন্সিং। এই আলো হঠাৎ বেড়ে যাওয়া আবার কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট প্যাটার্ন দেখেই বোঝা যায় যে সেখানে একটি কৃষ্ণগহ্বর আছে।
মহাকাশে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি এমন সেলফ-লেন্সিং সিস্টেম পাওয়া গেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এর কোনোটিতেই কোনো কৃষ্ণগহ্বর বা নিউট্রন স্টার নেই! সেগুলোতে আছে শ্বেত বামন, যা ব্ল্যাকহোলের মতো এতটা ঘন নয়। ড. ম্যাকমাস্টারের দল এবারই প্রথম একটি সত্যিকারের ব্ল্যাকহোলের সেলফ-লেন্সিং খোঁজার মিশনে নেমেছেন।
মহাকাশে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি এমন সেলফ-লেন্সিং সিস্টেম পাওয়া গেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এর কোনোটিতেই কোনো কৃষ্ণগহ্বর বা নিউট্রন স্টার নেই!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম মানুষের চোখ
এই খোঁজাখুঁজির জন্য বিজ্ঞানীরা নাসার টেস নামে প্ল্যানেট-হান্টিং টেলিস্কোপের ডেটা ব্যবহার করছেন। তাঁরা প্রায় দেড় কোটি নক্ষত্রের ডেটা দিয়ে একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এই দুর্দান্ত এআই মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দেড় কোটি ডেটা ঘেঁটে ১০ লাখ সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা তৈরি করে ফেলেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, মহাকাশে আরও অনেক কারণেই নক্ষত্রের আলো বাড়ে বা কমে। তাই এআইয়ের বের করা এই ১০ লাখ ডেটার মধ্যে কোনটি সত্যিকারের কৃষ্ণগহ্বর, তা যন্ত্রের পক্ষে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলা সম্ভব নয়। এখানেই দরকার আপনার মতো সাধারণ মানুষের চোখ আর বিচারবুদ্ধি!
জুনাইভার্স প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে গিয়ে যে কেউ কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই মিশনে যুক্ত হতে পারেন। সেখানে আপনাকে কিছু উদাহরণের ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হবে ঠিক কী ধরনের প্যাটার্ন আপনাকে খুঁজতে হবে। আপনার একটি ক্লিকেই হয়তো মানবজাতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নতুন কোনো ব্ল্যাক হোলের সন্ধান মিলে যেতে পারে! আগামী দিনে এই ডেটার সঙ্গে যুক্ত হবে এনজিটিএস, ইউক্লিড এবং ন্যান্সি গ্রেস রোমানের মতো আরও অত্যাধুনিক টেলিস্কোপের তথ্য।
ইতিমধ্যে ৩০ লাখের বেশি মানুষ এই কাজের জন্য নিবন্ধন করেছে। আপনিও নিবন্ধন করতে পারেন বিনামূল্যে। লিংক: জুনাইভার্স