ব্ল্যাকহোল কি হোয়াইট হোলে পরিণত হতে পারে
নিশ্চয়ই জানেন, ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রাক্ষস। এর আকর্ষণ শক্তি এত বেশি যে আলো পর্যন্ত এর হাত থেকে পালাতে পারে না। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো, এই রাক্ষসটি যদি হঠাৎ তার স্বভাব পুরোপুরি পাল্টে ফেলে? মানে, সবকিছু গিলে খাওয়ার বদলে যদি সে তার পেটের ভেতরের সবকিছু বাইরে ছুড়ে দিতে শুরু করে?
হ্যাঁ, এই অবাস্তব বিষয়টি নিয়েই এখন ভাবছেন বিজ্ঞানীরা! সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, মহাবিশ্বের শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া কিছু আদিম ব্ল্যাকহোল হয়তো এক পর্যায়ে গিয়ে হোয়াইট হোলে পরিণত হতে পারে। চলুন, বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখা যাক।
কৃষ্ণগহ্বর বলতেই আমাদের চোখে ভাসে বিশাল আকারের মৃত নক্ষত্রের কথা। কোনো বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি নিজের মহাকর্ষের টানে চুপসে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। এগুলোকে বলা হয় স্টেলার-মাস বা নক্ষত্র-ভরের ব্ল্যাকহোল।
কিন্তু এর বাইরেও আরেক ধরনের ব্ল্যাকহোল থাকার কথা বিজ্ঞানীরা কল্পনা করেন। আজ থেকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিস্ফোরণের ঠিক পরপরই মহাবিশ্ব প্রচণ্ড উত্তপ্ত এবং ঘন ছিল। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সেই চরম উত্তপ্ত অবস্থার মধ্যেই পদার্থের ঘনত্বের তারতম্যের কারণে বেশ কিছু ক্ষুদ্র আকারের কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়েছিল। এদের বলা হয় প্রাইমোরডিয়াল ব্ল্যাকহোল বা আদিম কৃষ্ণগহ্বর। তবে এদের অস্তিত্ব এখনো তাত্ত্বিক, বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত সরাসরি এমন কোনো ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করতে পারেননি।
কোনো বিশাল নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি নিজের মহাকর্ষের টানে চুপসে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। এগুলোকে বলা হয় স্টেলার-মাস বা নক্ষত্র-ভরের ব্ল্যাকহোল।
ব্ল্যাকহোলের মৃত্যু ও হকিং রেডিয়েশন
অনেকেই ভাবতে পারেন, কৃষ্ণগহ্বর কি চিরকাল বেঁচে থাকে? ১৯৭০-এর দশকে কিংবদন্তি পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং প্রমাণ করেছিলেন, কৃষ্ণগহ্বর চিরস্থায়ী নয়। এরা একধরনের তাপীয় বিকিরণ নির্গত করে ধীরে ধীরে ভর হারাতে থাকে। এই বিকিরণের নামই হকিং রেডিয়েশন।
মজার ব্যাপার হলো, একটি কৃষ্ণগহ্বরের ভর যত কম হবে, সেটি তত বেশি উত্তপ্ত হবে এবং তত দ্রুত বিকিরণ করে উবে যাবে। বিশাল ভরের নক্ষত্র থেকে তৈরি কৃষ্ণগহ্বরগুলো এতই ধীরে বিকিরণ করে যে, মহাবিশ্বের বর্তমান বয়সের চেয়েও বহুগুণ বেশি সময় ধরে তারা বেঁচে থাকতে পারে।
কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের সময় তৈরি হওয়া ওই খুদে আদিম ব্ল্যাকহোলগুলো তো এত বড় নয়। তাহলে তাদের পরিণতি কী হয়? এত দিনে কি তারা সব উবে গিয়ে ভয়ংকর বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে?
বিজ্ঞানীরা এতদিন এমনটাই ভাবতেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এবেরলি কলেজ অব সায়েন্সের গবেষক ড্যানিয়েল পারাইজো এবং তাঁর দল এই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছেন।
বিশাল ভরের নক্ষত্র থেকে তৈরি কৃষ্ণগহ্বরগুলো এতই ধীরে বিকিরণ করে যে, মহাবিশ্বের বর্তমান বয়সের চেয়েও বহুগুণ বেশি সময় ধরে তারা বেঁচে থাকতে পারে।
পারাইজোর গবেষণা বলছে, আদিম কৃষ্ণগহ্বরগুলো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারে। তারা বিকিরণ করতে করতে যখন একদম ছোট হয়ে যায়, তখন এক অদ্ভুত জাদুকরী রূপান্তর ঘটে!
ঠিক কতটা ছোট? বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃষ্ণগহ্বরটি ভর হারাতে হারাতে যখন প্ল্যাঙ্ক ভরে পৌঁছায়, তখনই আসল ঘটনাটি ঘটে। পদার্থবিজ্ঞানে প্ল্যাঙ্ক ভর হলো ভরের একটি মৌলিক একক। এর পরিমাণ মাত্র ০.০০০০০০০২২ কিলোগ্রাম বা প্রায় ২০ মাইক্রোগ্রাম। আপনার চোখের ভ্রুর একটি ছোট চুল কিংবা একটি মাছির ডিমের ওজন ঠিক এ রকমই হয়!
প্ল্যাঙ্ক ভর পদার্থবিজ্ঞানের জন্য দারুণ রোমাঞ্চকর একটি জায়গা। কারণ, এখানে পৌঁছালে আমাদের পরিচিত মহাকর্ষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের নিয়মগুলো এবং অতিপারমাণবিক কণার কোয়ান্টাম ফিজিকসের নিয়মগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃষ্ণগহ্বরটি ভর হারাতে হারাতে যখন প্ল্যাঙ্ক ভরে পৌঁছায়, তখনই আসল ঘটনাটি ঘটে। পদার্থবিজ্ঞানে প্ল্যাঙ্ক ভর হলো ভরের একটি মৌলিক একক। এর পরিমাণ মাত্র ২০ মাইক্রোগ্রাম।
ব্ল্যাকহোল থেকে হোয়াইট হোল!
ড্যানিয়েল পারাইজো এবং তাঁর দল গাণিতিক হিসাব কষে দেখেছেন, মাঝারি আকারের কোনো গ্রহাণুর ভরের সমান একটি আদিম ব্ল্যাকহোল প্রায় ১০০ কোটি বছর ধরে হকিং রেডিয়েশন নির্গত করার পর ওই ২০ মাইক্রোগ্রামের প্ল্যাঙ্ক ভরে পৌঁছায়।
আগের গবেষণায় বলা হতো, এই ২০ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছানোর পর কৃষ্ণগহ্বরটি মাত্র ১ সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে পুরোপুরি বিকিরিত হয়ে বিস্ফোরিত হবে। কিন্তু পারাইজোর দলের নতুন হিসাব বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা!
তাঁদের মতে, এই ২০ মাইক্রোগ্রাম ভরের কৃষ্ণগহ্বরটি বিস্ফোরিত হয়ে হারিয়ে যায় না, বরং এটি স্থিতিশীল হয়ে যায়। তখন এটি কৃষ্ণগহ্বরের মতো বিকিরণ ধরে রাখার ইভেন্ট হরাইজন হারিয়ে ফেলে এবং এক নতুন ধরনের বিকিরণ শুরু করে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন পিউরিফাইং রেডিয়েশন। দূর থেকে দেখলে এই বস্তুটির আচরণ অবিকল একটি হোয়াইট হোলের মতো মনে হবে!
হোয়াইট হোল হলো ব্ল্যাকহোলের ঠিক উল্টো একটি তাত্ত্বিক অবস্থা। এটিকে আপনি সময়ে পিছিয়ে যাওয়া ব্ল্যাকহোল বলতে পারেন। ব্ল্যাকহোল যেমন সবকিছু গিলে খায়, হোয়াইট হোল তেমনি অবিরত তার ভেতর থেকে পদার্থ ও বিকিরণ বাইরের দিকে ছুড়ে মারতে থাকে। এর ভেতরে কোনো কিছু প্রবেশ করা একেবারেই অসম্ভব।
পারাইজো বলেন, ব্ল্যাকহোলের অনেক দূরের সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ব্যবহার করেই আমরা এই ক্ষুদ্র হোয়াইট হোলের বৈশিষ্ট্যগুলো অনুমান করতে পেরেছি, যা সত্যিই অসাধারণ।
রহস্যের শেষ কোথায়
২০ মাইক্রোগ্রামের এই ক্ষুদ্র হোয়াইট হোলগুলোই মহাবিশ্বের সেই রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারের উৎস কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের চরম কৌতূহল রয়েছে। পারাইজো বলেন, ব্ল্যাকহোলের অনেক দূরের সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ব্যবহার করেই আমরা এই ক্ষুদ্র হোয়াইট হোলের বৈশিষ্ট্যগুলো অনুমান করতে পেরেছি, যা সত্যিই অসাধারণ।
তবে এই আদিম ব্ল্যাকহোলগুলো সত্যিই হোয়াইট হোল হিসেবে টিকে থাকে কি না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে গেলে আমাদের এমন একটি তত্ত্ব লাগবে, যা সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম মেকানিকসকে এক সুতোয় গাঁথতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বটি দাঁড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যেদিন সেই রহস্যের জট খুলবে, সেদিন হয়তো আমরা মহাবিশ্বের এই খুদে রাক্ষসগুলোর আসল রূপ দেখতে পাব!