চন্দ্রহীন হবে মঙ্গল! লাভক্র্যাফটের ভবিষ্যদ্বাণী কি সত্যিই মিলতে যাচ্ছে
এইচ পি লাভক্র্যাফটকে আমরা বেশির ভাগ পাঠকই হরর লেখক হিসেবে চিনি। তাঁর নামে তৈরি হয়েছে নতুন একটি জনরা—লাভক্র্যাফটিয়ান হরর। তবে হররের পাশাপাশি লাভক্র্যাফট বেশ কিছু সায়েন্স ফিকশন লিখেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে তিনি চন্দ্রহীন মঙ্গল গ্রহের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। শুনে অবাক হবেন, সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যিই মিলে যেতে পারে! তবে সবকিছু বুঝতে হলে আগে আমাদের মঙ্গলের দুটি চাঁদের ব্যাপারে জানতে হবে।
রাতের আকাশে মঙ্গল গ্রহকে আমরা লালচে একটি বিন্দু হিসেবে দেখি। এই গ্রহের দুটি চাঁদ রয়েছে—ফোবোস ও ডিমোস। আমাদের চাঁদের তুলনায় এরা নিতান্তই ছোট। কাছ থেকে দেখলে এদের চাঁদ না বলে মহাকাশে ভেসে বেড়ানো একজোড়া আলুর মতো বেখাপ্পা পাথরই মনে হবে। কিন্তু এই ছোট্ট দুটি চাঁদকে ঘিরেই উঠেছে অনেক প্রশ্ন!
১৮৭৭ সালে মঙ্গল পৃথিবীর বেশ কাছে চলে এসেছিল। সেই সুযোগে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আসাফ হল ওয়াশিংটনের নৌ-মানমন্দিরের বিশাল টেলিস্কোপ দিয়ে মঙ্গলের আশপাশ তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকেন। অনেক রাত কেটে গেল, কিছুই মিলল না। শোনা যায়, হল প্রায় হাল ছেড়েই দিচ্ছিলেন। তখন তাঁর স্ত্রী অ্যাঞ্জেলিনা স্টিকনি তাঁকে বলেন, ‘আরেকটু চেষ্টা করে দেখো।’ স্ত্রীর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে করা সেই চেষ্টাতেই প্রথমে ধরা পড়ে ডিমোস এবং তার কয়েক দিন পর ফেবোস।
১৮৭৭ সালে মঙ্গল পৃথিবীর বেশ কাছে চলে এসেছিল। সেই সুযোগে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আসাফ হল ওয়াশিংটনের নৌ-মানমন্দিরের বিশাল টেলিস্কোপ দিয়ে মঙ্গলের আশপাশ তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকেন।
নাম দুটি এসেছে গ্রিক পুরাণ থেকে। যুদ্ধদেবতা অ্যারিসের (রোমানরা যাকে বলত মার্স) দুই সঙ্গীর নাম ছিল ফোবোস এবং ডিমোস। এর মানে যথাক্রমে ভয় ও আতঙ্ক। যুদ্ধের দেবতার সঙ্গে তো ভয় আর আতঙ্ক থাকবেই, এ তো বেশ মানানসই!
দুটি চাঁদের মধ্যে ফোবোস আকারে কিছুটা বড়। তবে বড় বলতে গড়ে মাত্র ২২ কিলোমিটারের মতো চওড়া। এটি মঙ্গলের এত কাছ দিয়ে ঘোরে যে গ্রহপৃষ্ঠ থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটারের মতো। মঙ্গলকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এর লাগে সাড়ে সাত ঘণ্টার একটু বেশি। মজার ব্যাপার হলো, এটি মঙ্গলের আহ্নিক গতির চেয়েও দ্রুত ঘোরে। তাই মঙ্গলে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ফোবোস উঠছে পশ্চিমে আর ডুবছে পূবে! এক মঙ্গলীয় দিনে এই ঘটনা ঘটে প্রায় তিনবার।
ফোবোসের শরীরে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জিনিস স্টিকনি নামের এক বিরাট গর্ত বা ক্রেটার। এটি প্রায় ৯ কিলোমিটার চওড়া। সম্ভবত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগার কারণে গর্তটি সৃষ্টি হয়েছিল। এত বড় ধাক্কা খেয়েও চাঁদটি যে আস্ত টিকে আছে, সেটাই আশ্চর্য! এ ছাড়া এর গায়ে সারি সারি লম্বা খাঁজ রয়েছে। এগুলো কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও একমত হতে পারেননি।
ফোবোস মঙ্গলের আহ্নিক গতির চেয়েও দ্রুত ঘোরে। তাই মঙ্গলে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ফোবোস উঠছে পশ্চিমে আর ডুবছে পূবে! এক মঙ্গলীয় দিনে এই ঘটনা ঘটে প্রায় তিনবার।
ডিমোস আকারে বেশ ছোট। এর গড় ব্যাস মাত্র ১২ কিলোমিটারের মতো। এটি মঙ্গলের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরে ঘোরে, আর একবার ঘুরে আসতে এর সময় লাগে প্রায় ৩০ ঘণ্টা। ফেবোসের তুলনায় এই চাঁদটি অনেক মসৃণ। কারণ, গর্তগুলোর অনেকটাই মিহি ধুলোর চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে। মঙ্গল থেকে একে দেখায় একটি উজ্জ্বল তারার মতো। আমাদের চাঁদের মতো বড় বৃত্তাকার চাঁদ মঙ্গলের মাটি থেকে দেখা যায় না।
এই দুটি চাঁদ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান মত প্রচলিত রয়েছে। প্রথমটি হলো, এরা মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানের গ্রহাণুবেষ্টনী থেকে ভেসে আসা পাথর। ঘুরতে ঘুরতে মঙ্গলের কাছে এসে পড়েছিল। তারপর গ্রহের মহাকর্ষের টানে আটকা পড়ে গেছে।
এদের শরীরের গাঢ় রং আর উপাদান কার্বনসমৃদ্ধ গ্রহাণুর সঙ্গে মেলে। তাই এই মতের পক্ষে জোরালো সমর্থন রয়েছে। কিন্তু একটি খটকাও আছে। এদের কক্ষপথ প্রায় নিখুঁত গোল এবং মঙ্গলের বিষুবরেখার সমতলে অবস্থিত। বাইরে থেকে আসা বস্তু সাধারণত এমন গোছানো পথে ঘোরে না।
আরেকটি মত হলো, বহু আগে কোনো বিশাল মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আছড়ে পড়েছিল। সেই ধাক্কায় ছিটকে ওঠা পাথর ও ধুলো মঙ্গলের চারপাশে জমে চাঁদে পরিণত হয়েছে। আমাদের চাঁদও নাকি এভাবেই সৃষ্টি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এই মতে কক্ষপথের ব্যাখ্যা সহজেই মেলে, তবে এদের শরীরের উপাদান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কেউ কেউ আবার এই দুটি ব্যাখ্যার মিশেলে নতুন কিছু মত দিয়েছেন, তবে সেগুলো তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি।
ডিমোস আকারে বেশ ছোট। এর গড় ব্যাস মাত্র ১২ কিলোমিটারের মতো। এটি মঙ্গলের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরে ঘোরে, আর একবার ঘুরে আসতে এর সময় লাগে প্রায় ৩০ ঘণ্টা।
এবার অন্য একটি ব্যাপারে আসি। ফোবোস মঙ্গলের এত কাছে ঘোরে যে জোয়ার-ভাটার টানে এটি ধীরে ধীরে গ্রহের দিকে নেমে আসছে। হিসাব বলছে, প্রতি এক শ বছরে প্রায় ১.৮ মিটার কাছে আসে। শুনতে সামান্য মনে হলেও কোটি কোটি বছরে এই টুকটাক নামাই শেষ পর্যন্ত বিরাট ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আগামী ৩ থেকে ৫ কোটি বছরের মধ্যে ফেবোসের ভাগ্যের ফয়সালা হয়ে যাবে। সামনে দুটি সম্ভাবনা। ফোবোস যদি যথেষ্ট শক্ত হয়, তাহলে সোজা মঙ্গলের গায়ে আছড়ে পড়বে। আর যদি ভেতরটা ঢিলেঢালা হয়, পাথরের স্তূপের মতো, তাহলে মঙ্গলের মহাকর্ষ টান তাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
দ্বিতীয়টি ঘটলে টুকরোগুলো মঙ্গলের চারদিকে ছড়িয়ে একটি রিং তৈরি করবে। অনেকটা শনির বলয়ের ছোট সংস্করণ! ভাবতেই কেমন লাগে! তবে এই বলয়ও চিরকাল থাকবে না। কয়েক কোটি বছর ধরে টুকরোগুলো একটু একটু করে মঙ্গলের বুকে ঝরে পড়বে। আরেকটি মজার ধারণা আছে। ফোবোসের গায়ের ওই খাঁজগুলো হয়তো মঙ্গলের টানে তৈরি হওয়া ফাটলের শুরু। অর্থাৎ ভাঙনের আগাম ইঙ্গিত। সব বিজ্ঞানী অবশ্য এতে একমত নন।
ফোবোস যদি যথেষ্ট শক্ত হয়, তাহলে সোজা মঙ্গলের গায়ে আছড়ে পড়বে। আর যদি ভেতরটা ঢিলেঢালা হয়, পাথরের স্তূপের মতো, তাহলে মঙ্গলের মহাকর্ষ টান তাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
ডেমোসের গল্প ফেবোসের ঠিক উল্টো। এটি ঘুরছে মঙ্গলের সমলয় কক্ষপথের বাইরে। সমলয় কক্ষপথ মানে কেন্দ্রের গ্রহ বা নক্ষত্রটি নিজের অক্ষের চারপাশে একবার ঘুরে আসতে ঠিক যতটুকু সময় নেয়, সেই কক্ষপথে থাকা উপগ্রহটিরও কেন্দ্রের বস্তুকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ঠিক ততটুকুই সময় লাগে। এই কক্ষপথে থাকলে কোনো বস্তু গ্রহের ঘূর্ণনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশে এক জায়গায় স্থির দেখায়। ডিমোস এর বাইরে থাকায় জোয়ার-ভাটার প্রভাবে ধীরে ধীরে মঙ্গল গ্রহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরলে আকাশে তাকে আরও ম্লান দেখাবে। যথেষ্ট সময় পেলে এক দিন সে মঙ্গলের টান কাটিয়ে বেরিয়েও যেতে পারে। তারপর চলে যাবে সূর্যের কাছাকাছি। তবে প্রক্রিয়াটি এত ধীর যে শেষমেশ তা ঘটবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। মোট কথা, ভবিষ্যতে মঙ্গলের আকাশে একটি চাঁদ ভেঙে বলয় হয়ে যাবে আর অন্যটি চুপচাপ দূরে সরতে থাকবে।
এই ছোট চাঁদ দুটি মানুষের মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনায় জায়গা করে নিচ্ছে। মঙ্গলের অভিকর্ষ পৃথিবীর প্রায় ৩৮ শতাংশ হলেও ফোবোস আর ডেমোসে অভিকর্ষ প্রায় নেই বললেই চলে। তাই সেখানে নামা আর ওঠা অনেক সহজ। ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের ঘাঁটি বা জ্বালানি ভরার কেন্দ্র হিসেবে এদের কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে। চাঁদ দুটি থেকে মঙ্গলের ওপর নজর রাখাও বেশ সহজ হবে।
কক্ষপথে থাকলে কোনো বস্তু গ্রহের ঘূর্ণনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশে এক জায়গায় স্থির দেখায়। ডিমোস এর বাইরে থাকায় জোয়ার-ভাটার প্রভাবে ধীরে ধীরে মঙ্গল গ্রহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
জাপানের মহাকাশ সংস্থা জাক্সা একটি প্রজেক্টের পরিকল্পনা করেছে। নাম দেওয়া হয়েছে মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন বা সংক্ষেপে MMX। এর লক্ষ্য ফোবোস থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা তুলে পৃথিবীতে আনা। সেই নমুনা পরীক্ষা করলেই হয়তো ধরা পড়বে, চাঁদ দুটি আসলে আটকা পড়া গ্রহাণু নাকি সংঘর্ষের ফসল। এমন অভিযানের তারিখ প্রায়ই পিছিয়ে যায়, তাই সর্বশেষ সময়সূচি জানতে জাক্সার ঘোষণা দেখে নেওয়াই ভালো।
ফোবোস ও ডিমোস আকারে ছোট হলেও এগুলো থেকে হয়তো ভবিষ্যতে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। যেমন, চাঁদগুলো কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং কীভাবে ধ্বংস হয়? একটি চাঁদ লাখো বছর পর মঙ্গলকে রিং পরিয়ে বিদায় নেবে, অন্যটি নিঃশব্দে দূরে সরে যাবে। মহাবিশ্বের সময়ের হিসাবে এ যেন এক ধীরলয়ের নাটক। এখন প্রশ্ন হলো, লাভক্র্যাফট কীভাবে আজ থেকে এক শ বছর আগে চন্দ্রহীন মঙ্গল গ্রহের কথা বলেছিলেন তাঁর গল্পে? তিনি তো কোনো বিজ্ঞানীও ছিলেন না! এ এক অদ্ভুত রহস্যই বটে!