ডার্ক এনার্জি কি সত্যিই আছে
আমার এখনো মনে পড়ে, ১৯৯৮ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গবেষক দল পৃথিবী থেকে দেখা বেশ কয়েকটি সুপারনোভা টাইপ 1A-এর আপাত-উজ্জ্বলতার মান বিশ্লেষণ করে দেখাল, মহাবিশ্বের প্রসারণ তো শ্লথ হচ্ছেই না, বরং ত্বরান্বিত হচ্ছে, তখন কী রকম উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। এ ত্বরণের মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয় আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি রাশিকে, যাকে ল্যামডা বা মহাজাগতিক ধ্রুবক বলা হয়, সেটির বিকর্ষণ চাপকে (চিত্র ১)। ল্যামডাকে আমরা ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি বলি। অন্যতম বিজ্ঞান পত্রিকা সায়েন্স ম্যাগাজিন এ গবেষণাকে ওই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ২০১১ সালের পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কারও ওই দুই দলের তিনজনকে দেওয়া হয়। বর্তমানে জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যার পাঠ্যপুস্তকে ল্যামডার কারণে মহাজাগতিক ত্বরণ হচ্ছে, এটি মোটামুটি একটি প্রতিষ্ঠিত অধ্যায়।
সুপারনোভার ঔজ্জ্বল্যের ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের ত্বরণের যে মডেল আমরা পাই, তাতে দেখা গেল, মহাবিশ্বের ৭০ শতাংশ উপাদান হলো অদৃশ্য ডার্ক এনার্জি, ২৫ শতাংশ হলো ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু (তমোবস্তুও বলা হয়), যাকে এখনো আমরা সরাসরি অবলোকন করতে পারিনি। আর মাত্র ৫ শতাংশ হলো সাধারণ বস্তু, যা আমরা চোখে বা ডিটেকটর দিয়ে দেখতে পাই। এই মডেলের নাম হলো ল্যামডা-সিডিএম, যেখানে ল্যামডা হলো ডার্ক এনার্জি এবং সিডিএম হলো কোল্ড (শীতল) ডার্ক ম্যাটার। মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি বা সিএমবির পর্যবেক্ষণকেও এই ল্যামডা-সিডিএম মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
সুপারনোভার ঔজ্জ্বল্যের ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের ত্বরণের যে মডেল আমরা পাই, তাতে দেখা গেল, মহাবিশ্বের ৭০ শতাংশ উপাদান হলো অদৃশ্য ডার্ক এনার্জি, ২৫ শতাংশ হলো ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু।
এখানে মনে হয় আইনস্টাইনের ক্ষেত্র সমীকরণটির উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না (চিত্র ১)। এই সমীকরণের ডান দিকের স্ট্রেস-এনার্জি টেনসরটি হলো শক্তি ও বস্তুর ভর, যা কিনা স্থানকালের বক্রতার জন্য দায়ী। সমীকরণের বাঁ দিকের রাশিগুলো—রিচি টেনসর, রিচি স্কেলার ও মেট্রিক টেনসর এই বক্রতার পরিমাণ নির্দেশ করে।
আইনস্টাইন তাঁর সমীকরণটি প্রণয়ন করে দেখলেন, সেটি একটি অস্থিতিশীল মহাবিশ্বের ভাবীকথন করছে। কিন্তু তাঁর ধারণা ছিল, মহাবিশ্বের খ-গোল বস্তুরা মোটামুটি স্থিত। তাই মহাবিশ্বকে স্থিতিশীল করতে গিয়ে তিনি সমীকরণে একটি ধ্রুবক বসালেন, সেটা হলো ল্যামডা, যাকে আমরা মহাজাগতিক ধ্রুবক বলেও জানি। পরবর্তীকালে যখন প্রমাণিত হলো মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, তখন আইনস্টাইন বলেছিলেন, এটা তাঁর জীবনের এক মস্ত ভুল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, ল্যামডার একটা আলাদা জীবন আছে এবং ১৯৯৮ সালের পর থেকে সেটির স্থান মহাজাগতিক বিজ্ঞানে একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে গেল।
কিন্তু ল্যামডাটা আসলে কী? আইনস্টাইনের মডেলে সেটি নিতান্তই একটি জ্যামিতিক রাশি, যা কিনা একটি ঋণাত্মক চাপ দিয়ে স্থানকালকে প্রসারিত করে। এই প্রসারণ কিন্তু ল্যামডার স্থানীয় ঘনত্ব কমিয়ে দেয় না; বরং সেটির পরিবর্তন হয় না, সে জন্য ল্যামডার শক্তির ঘনত্ব ধ্রুব। অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্বের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ল্যামডার শক্তির পরিমাণ বাড়তেই থাকে এবং আপাতদৃষ্টে এটা মনে হতে পারে যে এখানে শক্তির সংরক্ষণ তত্ত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে। আসলে সাধারণ আপেক্ষিকতায় শক্তির সংরক্ষণ ধ্রুপদি পদার্থবিদ্যা থেকে ভিন্নভাবে কাজ করে। এই তত্ত্বে স্থানীয়ভাবে শক্তি সংরক্ষিত হলেও মহাবিশ্বের পর্যায়ে সেটি হয় না, কারণ সেখানে স্থানকাল গতিশীল বা ডায়নামিক।
আইনস্টাইনের মডেলে ল্যামডা নিতান্তই একটি জ্যামিতিক রাশি, যা কিনা একটি ঋণাত্মক চাপ দিয়ে স্থানকালকে প্রসারিত করে।
আমরা ধারণা করছি, ল্যামডা কোনো মৌলিক বল বা মিথস্ক্রিয়ার সাহায্যে স্থানকালকে প্রসারিত করছে না, বরং এটি স্থানকালে প্রোথিত—এর প্রভাব নিতান্তই জ্যামিতিক। সাধারণ আপেক্ষিকতায় এটা নতুন কোনো কথা নয়, কারণ ক্ষেত্র সমীকরণের ডান দিকে যে স্ট্রেস-এনার্জি টেনসর আছে, সেটি বাঁ দিকের বক্রতার সঙ্গে জ্যামিতিকভাবেই যুক্ত।
আমরা পর্যবেক্ষণ থেকে ল্যামডার শক্তির ঘনত্ব বের করতে পারি। এর পরিমাণ হলো প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৫×১০-১০ জুল। এ মানকে আমাদের দৈনন্দিন পরিচিত কিছু ঘনত্বের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। পৃথিবীপৃষ্ঠে সূর্যের আলোর শক্তি-ঘনত্ব মোটামুটি প্রতি ঘনমিটারে ৫×১০-৬ জুল, অর্থাৎ মাত্র ১০ হাজার গুণ বেশি। তাহলে কি এটা বলা যায় না যে সূর্যের উত্তাপ যেমন আমরা সহজেই বুঝতে পারি, সে রকমভাবে ঘরে বসেই, আকাশ পর্যবেক্ষণ না করেই ল্যামডার শক্তির মানটি আমরা নির্ধারণ করতে পারি। এর উত্তর হচ্ছে ‘না’, কারণ ল্যামডা যদি থেকেও থাকে, সেটি স্থানকালের চাদরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া সেটির মানকে আলাদা করে পরিমাপ করার কোনো পদ্ধতি আমাদের হাতে নেই।
ল্যামডার শক্তি নিয়ে আরেকটি ধাঁধা বিজ্ঞানীদের খুব ভাবায়। ল্যামডাকে আমরা বলছি শূন্যস্থানের (ভ্যাকুয়াম) শক্তি। কিন্তু আমরা জানি শূন্যস্থান শূন্য নয়, সেখানে ক্রমাগত কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের ওঠানামা হচ্ছে, অলীক কণা সৃষ্টি হচ্ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। এই যে ক্ষেত্র (বা কণা), সেটি কোয়ান্টাম, অর্থাৎ অবিছিন্ন নয়, বরং পৃথক কোয়ান্টার সমষ্টি। এ সমষ্টির শক্তির পরিমাণকে যদি আমরা গণনা করি, তবে যে সংখ্যাটা আমরা পাই, সেটা প্রতি ঘনমিটারে ১০১১৩ জুল। খুব বড় একটি সংখ্যা। এ হিসাব আমরা পাই, যদি অলীক কোয়ান্টার ইন্টিগ্রেশনের ওপরের সীমাটি প্ল্যাঙ্ক স্কেল (১০১৯ গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট) পর্যন্ত ধরি। কিন্তু যদি আমরা ইন্টিগ্রেশনের ওপরের সীমা একীভূত ক্ষেত্র তত্ত্বের (GUT) স্কেল ধরি (অর্থাৎ ১০১৬ গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট), তাহলে শক্তির ঘনত্ব হবে প্রতি ঘনমিটারে ১০১১০ জুল। এটি একটি অভাবনীয় সংখ্যা, যা পর্যবেক্ষিত ল্যামডার শক্তির তুলনায় ১০১২০ গুণ (অথবা ওপরের সীমা প্ল্যাঙ্ক স্কেল ধরলে ১০১২৩ গুণ বেশি)।
ল্যামডাকে আমরা বলছি শূন্যস্থানের শক্তি। কিন্তু আমরা জানি শূন্যস্থান শূন্য নয়, সেখানে ক্রমাগত কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের ওঠানামা হচ্ছে, অলীক কণা সৃষ্টি হচ্ছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
ভ্যাকুয়াম শক্তি এত বিশাল হলে আমরা কি সেটা দেখতে পেতাম না? এটা হতে পারে যে যেহেতু সেটি সমসত্ত্বভাবে সবখানে বিরাজমান, সেহেতু এটাকে আমরা একটা ভূমিরেখা হিসেবে ভেবে নিতে পারি। অর্থাৎ এই বিশাল শক্তি ঘনত্ব হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের তল, আর আমরা শুধু ঢেউয়ের উচ্চতা নির্ধারণ করতে পারি, যেমন পৃথিবীপৃষ্ঠে সৌর আলোর শক্তি-ঘনত্ব। এ অনুকল্প আমাদের উদ্ধার করতে পারত, কিন্তু এখানে বাদ সাধবে আইনস্টাইনের ক্ষেত্রতত্ত্ব, কারণ সেখানে ল্যামডা ঋণাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ আমরা কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্বের গণনায় যে বিশাল মানটি পাচ্ছি, তা মহাবিশ্বকে এত দ্রুত প্রসারিত করবে যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আর গঠিতই হবে না, মহাবিশ্বের সব কণা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়বে। অন্যদিকে এই শক্তিকে যদি আমরা ক্ষেত্র সমীকরণের স্ট্রেস-এনার্জি টেনসরের অন্তর্ভুক্ত করি, তবে সেটি সমীকরণের বাঁ দিকের স্থানকালকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দেবে যে মহাবিশ্ব প্রসারিত তো হবেই না; বরং একটি বিন্দুতে আপতিত হবে।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মহাবিশ্ব ওপরের দুটি পরিণতির কোনোটাই অনুসরণ করেনি, বরং মোটামুটি একটি সাম্যাবস্থা বজায় রেখে প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ ল্যামডার মান সাংঘাতিক বড়ও নয়, আবার ছোটও নয়। এ সমস্যাকে ‘সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যতা সমস্যা’ (ফাইন টিউনিং প্রবলেম) বলা হয়। অর্থাৎ কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব থেকে পাওয়া শূন্যতার বিশাল শক্তি-ঘনত্ব কীভাবে কমে ল্যামডার অল্প শক্তি-ঘনত্ব বা চাপে পরিণত হয়েছে, যে ঋণাত্মক চাপ গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি তৈরিতে বাধা দেয় না। এ সমস্যা সমাধানে তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের কিছু প্রস্তাবনা আছে। কিন্তু সেই আলোচনা আমাদের আজকের মূল বিষয়ে আলোকপাত করতে সাহায্য করবে না।
কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব থেকে পাওয়া শূন্যতার বিশাল শক্তি-ঘনত্ব কীভাবে কমে ল্যামডার অল্প শক্তি-ঘনত্ব বা চাপে পরিণত হয়েছে, যে ঋণাত্মক চাপ গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি তৈরিতে বাধা দেয় না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, যদিও ল্যামডা-সিডিএম মডেলটি পর্যবেক্ষণমূলক ডেটা মেলানোর ক্ষেত্রে বেশ সফল, এটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তাদের মধ্যে একটি হলো সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যতা সমস্যা, যা নিয়ে ওপরে আলোচনা করলাম। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে হাবল ধ্রুবকের মান নিয়ে একটা সমস্যা আছে, যাকে ‘হাবল টেনশন’ বা ‘হাবল দ্বন্দ্ব’ বলা হয়; সেটা নিয়ে আমরা এ প্রবন্ধের একদম শেষে কথা বলব। এখন প্রশ্ন হলো, এসব সমস্যার সমাধানে ল্যামডাকে বাদ দিয়ে আমরা বিকল্প কোনো মডেলের কথা ভাবতে পারি কি না। এ রকমই একটি মডেল নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড উইল্টশায়ারের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল উত্থাপন করেছেন। তাঁরা এটির নাম দিয়েছেন ‘টাইমস্কেপ মডেল’।
টাইমস্কেপ মডেলের মূল বক্তব্য হলো ডার্ক এনার্জির কারণে মহাবিশ্বের আপাত–ত্বরণ একটি পর্যবেক্ষণ-বিভ্রম এবং এই ত্বরণকে মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্প্রসারণের গড় গতিবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। মডেলটি আমাদের চিরাচরিত কোপার্নিকাসের নীতি—অর্থাৎ বড় স্কেলে মহাবিশ্ব দেখতে একই রকম বা এটির বস্তুর বিন্যাস রৈখিক এবং কৌণিকভাবে সমসত্ত্ব—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সুপারিশ করছে। এটি বলছে, মহাবিশ্ব সমসত্ত্ব নয়, বরং বড় স্কেলে বিশাল ‘শূন্যস্থান’ (যেখানে বলতে গেলে কোনো গ্যালাক্সিই নেই) এবং ‘প্রাচীরে’ (গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সি দলের অঞ্চল) বিভক্ত।
এ মডেল অনুসারে, শূন্যস্থানগুলো দেয়াল বা প্রাচীরের চেয়ে দ্রুত প্রসারিত হয়, কারণ তাদের মধ্যে কোনো গ্যালাক্সি না থাকায় সেখানে মহাকর্ষীয় টান কম থাকে। আবার যেহেতু বর্তমানে এই ফাঁকা জায়গাগুলো মহাবিশ্বের আয়তনের বেশির ভাগ অংশ দখল করে আছে, তাই সামগ্রিক সম্প্রসারণের হারে তাদের অবদান বেশি। সেখানে আবার প্রাচীরগুলোর তুলনায়, সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী সময় আস্তে চলে। গুপ্তশক্তি মহাবিশ্বকে ত্বরান্বিত করছে বলে অনুমান করার পরিবর্তে টাইমস্কেপ মডেলটি শূন্যস্থান ও প্রাচীরগুলোর প্রসারণের পার্থক্যজনিত সময় ও গতিকে আপাত–ত্বরণের পর্যবেক্ষণের জন্য দায়ী করছে।
টাইমস্কেপ মডেলের মূল বক্তব্য হলো ডার্ক এনার্জির কারণে মহাবিশ্বের আপাত–ত্বরণ একটি পর্যবেক্ষণ-বিভ্রম এবং এই ত্বরণকে মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্প্রসারণের গড় গতিবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
মডেলটি যে একেবারে নতুন, এমন নয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সুবীর সরকার ২০০৭ সালেই বলেছিলেন, বড় স্কেলেও মহাবিশ্ব সমসত্ত্ব হবে—এ রকম মনে করার কোনো কারণ নেই এবং সুপারনোভার ঔজ্জ্বল্য আমাদের আশপাশের শূন্যস্থান দিয়ে হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
টাইমস্কেপ মডেল যদি সত্যিই দেখাতে পারে যে মহাবিশ্বের ত্বরণ একটি স্থানীয় বিভ্রম এবং ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব নেই, তাহলে সেটি ‘হাবল টেনশন’ বা ‘হাবল দ্বন্দ্ব’ সমাধান করলেও করতে পারে। হাবলের ধ্রুবক, H0, মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, সেটার পরিমাপক। একটি গ্যালাক্সি যদি আমাদের থেকে ১ মেগাপারসেক (১ মিলিয়ন পারসেক বা ৩.২৬ মিলিয়ন আলোকবর্ষ) দূরে থাকে, তবে সে আমাদের থেকে প্রতি সেকেন্ডে H0 কিলোমিটার বেগে সরে যাচ্ছে। এই ধ্রুবক মাপার দুটি প্রধান পদ্ধতি আছে—একটি হলো স্থানীয়ভাবে সেফিড বিষম তারা ও টাইপ 1A সুপারনোভার পর্যবেক্ষণ, আরেকটি হলো প্রারম্ভিক মহাবিশ্বের সিএমবি বিকিরণের বিশ্লেষণ। প্রথম পদ্ধতিতে (স্থানীয়ভাবে) আহৃত মানটি হলো ৭৩ এবং সিএমবির (দূরবর্তী ডেটা) ব্যবহার করে পাওয়া, ফলাফলটি হলো ৬৭। এ দুটির মানের পার্থক্য মাত্র ৬ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক হলেও সেটি মহাবিশ্বের প্রসারণের প্রক্রিয়াকে আমরা যে ঠিক বুঝতে পারছি না, সেটাকে নির্দেশ করে।
একটি গ্যালাক্সি যদি আমাদের থেকে ১ মেগাপারসেক দূরে থাকে, তবে সে আমাদের থেকে প্রতি সেকেন্ডে H0 কিলোমিটার বেগে সরে যাচ্ছে।
এবার দেখা যাক টাইমস্কেপ মডেল কীভাবে এটার সমাধান করতে পারে। এই মডেল বলছে, মহাবিশ্বের আদিতে শূন্যস্থানের পরিমাণ বেশি ছিল না, বস্তুর ঘনত্ব বেশি ছিল, অর্থাৎ সবকিছু প্রাচীরই ছিল। আর বর্তমানে, আমাদের সময়ে, মহাবিশ্বে প্রচুর ফাঁকা জায়গার আবির্ভাব হয়েছে। তাই স্থানীয়ভাবে যখন আমরা হাবল পরিমাপ নির্ধারণ করতে চাই, তখন শূন্যস্থানগুলোর প্রভাব চলে আসে, যেখানে মহাবিশ্ব তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, তাই হাবল মানটিও একটু বেশি (৭৩)। অন্যদিকে আমরা যখন সিএমবি ব্যবহার করি, তখন প্রারম্ভিক মহাবিশ্বকেও বিশ্লেষণে ধরতে হয়। সেই সময়কার মহাবিশ্বে প্রাচীরের পরিমাণ বেশি ছিল, যেখানে সময়ের বহমানতা শ্লথ ছিল। সেটিকে আমাদের স্থানীয় মহাবিশ্বের সঙ্গে গড় করলে মানটির পরিমাণ কমে আসে (৬৭)। এভাবে হয়তো টাইমস্কেপ মডেলটি পর্যবেক্ষণের বিভ্রমের ভিত্তিতে হাবল দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারে।
এ সময়ে টাইমস্কেপ মডেলটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্পের পথ দেখাচ্ছে, যা কিনা মহাবিশ্বকে ডার্ক এনার্জি ছাড়াই ব্যাখ্যা করবার একটা সুযোগ দিচ্ছে। এটি সত্যি হলে আমরা সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যতা (ফাইন টিউনিং) এবং হাবল দ্বন্দ্বেরও সমাধান পাব। কিন্তু বৃহত্তর বিজ্ঞানসমাজে এটির গ্রহণযোগ্যতা এ মডেল দিয়ে মহাবিশ্বের সামগ্রিক বিশাল কাঠামো ও সুপারনোভা ডেটার আরও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল। ডার্ক এনার্জি একটি সত্যিকারের ভৌত অস্তিত্ব, নাকি মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণজনিত বিভ্রম—এটি আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য একটি উন্মুক্ত ও কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। সে প্রশ্নের সমাধান জানতে আমরা সবাই উন্মুখ হয়ে আছি।
