আলোর গতিতে ছুটলেও কি মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব
রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় আমরা যেন এক অশেষ অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ যত দূর যায়, তারার আলো তত দূরে মিলিয়ে যায়। সেই আলোর পেছনে আছে গ্যালাক্সি, নীহারিকা, ধ্বংসপ্রাপ্ত নক্ষত্রের ধুলো। তারও পেছনে আরও অজানা শূন্যতা। প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ স্বভাবতই জানতে চায়, এই বিস্তারের কি কোনো শেষ আছে? কোথাও কি মহাবিশ্বের প্রান্ত বা কিনারা আছে? আর মহাবিশ্বের যদি কোনো প্রান্ত থাকে, তাহলে আমরা কি কখনো সেখানে পৌঁছাতে পারব? যদি আলোর গতিতে ছুটি?
প্রশ্নটা শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো লাগলেও, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ঠিক এই প্রশ্নটিকেই গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করেছে। উত্তরটি একই সঙ্গে বিস্ময়কর, হতাশাজনক এবং গভীরভাবে দার্শনিক।
মানুষ বহু শতাব্দী ধরে আকাশের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করেছে। প্রথমে ছিল খালি চোখে। তারপর এল দূরবীক্ষণ। গ্যালিলিওর ছোট টেলিস্কোপ থেকে শুরু করে হালের হাবল বা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ—প্রতিটি যন্ত্র আমাদের দৃষ্টিকে নিয়ে গেছে আরও দূরে। দৃশ্যমাণ আলো ছাড়াও এখন আমরা অদৃশ্য আলোতে মহাবিশ্বের বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পাই। আজ আমরা এমন আলো দেখতে পাচ্ছি, যা আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন বছর আগে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ শ কোটি বছর আগে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখন আকাশের গভীরতম প্রান্তের দিকে তাকাই, তখন আসলে আমরা সময়ের পেছনের দিকে তাকাই, মানে মহাবিশ্বের শৈশবের দিকে। আমাদের চোখে ধরা পড়ে মহাবিশ্বের আদিম সময়ের আলো।
আজ আমরা এমন আলো দেখতে পাচ্ছি, যা আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন বছর আগে। অর্থাৎ প্রায় ১৪ শ কোটি বছর আগে।
এই পর্যবেক্ষণ থেকেই বিজ্ঞানীরা চুলচেরা হিসেব করে দেখেছেন, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ নয়। আলো ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে আসছে মানেই বস্তুগুলো আজও তত দূরেই আছে, তা কিন্তু নয়। কারণ মহাবিশ্ব স্থির বা স্থিতিশীল নয়। ক্রমান্বয়ে তা প্রসারিত হচ্ছে। আয়তনে বড় হচ্ছে। এই প্রসারণই পুরো প্রশ্নটিকে জটিল করে তোলে।
আজ যে আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছাল, সেটি যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন উৎসবিন্দুটি আমাদের অনেক কাছাকাছি ছিল। কিন্তু আলোকযাত্রার পুরো সময়জুড়ে মহাবিশ্ব নিজেই ফুলে উঠেছে। স্থান প্রসারিত হয়েছে। ফলে সেই উৎসবিন্দু আজ আমাদের থেকে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। এই কারণেই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বলে ধরা হয়।
এখন প্রশ্ন আসে, এই দৃশ্যমান সীমাই কি মহাবিশ্বের শেষ? মানে আমরা মহাবিশ্বের যতটুকু দেখতে পাই সেটাই কি সব? নাকি আরও কিছু আছে?
আধুনিক বিজ্ঞান বলে, না। এটি মহাবিশ্বের প্রকৃত আয়তন বা শেষ কিনারা নয়। এটা স্রেফ আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমা। মহাবিশ্বের এই কিনারার বাইরে কী আছে, আমরা এখনও কিছু জানি না। কারণ মহাবিশ্ব এতই বড় যে সেখানকার আলো এখনো আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। আলোকে বলা হয় মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতিসীমা। এর গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার। রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, এই গতিতে ছুটেও মহাবিশ্বের ওই এলাকার আলো আমাদের কাছে এখনও পৌঁছাতে পারেনি। মহাবিশ্বের হয়তো ভবিষ্যতে কোনো দিনই পৌঁছাবে না কিংবা পৌঁছাবে, তাও আমরা সঠিক জানি না।
আলোকযাত্রার পুরো সময়জুড়ে মহাবিশ্ব নিজেই ফুলে উঠেছে। স্থান প্রসারিত হয়েছে। ফলে সেই উৎসবিন্দু আজ আমাদের থেকে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে।
তাহলে আমরা যদি একটি কাল্পনিক মহাকাশযানে চড়ে আলোর গতিতে রওনা দিই, কী হবে?
প্রথমে শুনতে বিষয়টি সহজ মনে হয়। কিন্তু চলুন, হিসেব করে দেখা যাক। আগেই বলেছি, আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এক বছরে সে চলে প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। এটাই এক আলোকবর্ষ। সেই হিসাবে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪৬ বিলিয়ন বছর। সংখ্যাটা ভয়াবহ বড় হলেও, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী যাত্রীদের জন্য সময় ধীর হয়ে যাবে। আলোর গতির খুব কাছাকাছি গেলে সময় প্রায় থমকে যায়। ভ্রমণকারীর চোখে হয়তো কয়েক দশক বা এক শতকেই যাত্রা শেষ হয়ে যাবে।
বাস্তবতা হলো, মানুষের তৈরি দ্রুততম মহাকাশযানগুলো এখনও আলোর গতির ভগ্নাংশের সমানও পৌঁছাতে পারেনি। আর সরাসরি আলোর বেগে ভ্রমণ করাটাও মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে তুচ্ছ মনে হবে।
কথাটা শুনলে বেশ আশা জাগে। কিন্তু সমস্যাটা সময় নয়। সমস্যাটা হলো, মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিত হচ্ছে না, সে প্রসারণের গতি ক্রমেই বাড়ছে। এর জন্য দায়ী এক রহস্যময় শক্তি, ডার্ক এনার্জি। বাংলায় একে বলা হয় গুপ্তশক্তি। এই রহস্যময় শক্তিটা আসলে কী, তা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, এই শক্তি স্থানকে এমনভাবে প্রসারিত করছে যে বহুদূরের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে খুবই দ্রুত বেগে সরে যাচ্ছে। সেই গতি আলোর চেয়েও বেশি।
আলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এক বছরে সে চলে প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। এটাই এক আলোকবর্ষ।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। কোনো বস্তু আলোর চেয়ে দ্রুত চলছে না। আইনস্টাইনের নিয়ম ভাঙছে না কিছুই। কিন্তু বস্তুগুলোর মাঝের স্থান নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। আর সেই প্রসারণের ওপর আলোর গতির কোনো সীমা নেই। ফলে দূরের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে কার্যত আলোর চেয়েও দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে।
এখন কল্পনা করুন, আপনি আলোর গতিতে ছুটছেন (যদিও সেটা প্রায় অসম্ভব), আর আপনার গন্তব্য আপনার থেকে আরও দ্রুত সরে যাচ্ছে। তাই আপনি যত জোরেই ছুটে যান না কেন, সেই দূরত্ব কখনো কমছে না—বরং বাড়ছে। এটাই মহাবিশ্বের নিষ্ঠুর বাস্তবতা।
আমরা যাকে মহাবিশ্বের প্রান্ত বলি, সেটি কোনো স্থির দেয়াল নয়। সেটি আসলে একটি চলমান দিগন্ত। প্রতি সেকেন্ডে তা আমাদের থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। এমনকি আলোর গতিতেও সেই দিগন্তকে ধরা সম্ভব নয়।
আজ এমন অঞ্চল আছে, যেখানকার আলো কখনোই আমাদের কাছে পৌঁছাবে না। কারণ তাদের মাঝের স্থান এত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে যে আলো এগোতেই পারছে না। এই অঞ্চলগুলো বাস্তবে থাকলেও, সেগুলো আমাদের জন্য কার্যত অস্তিত্বহীন। বিজ্ঞানীরা একে বলেন কসমিক ইভেন্ট হরাইজন বা মহাজাগতিক ঘটনা দিগন্ত। কৃষ্ণগহ্বরের যেমন ইভেন্ট হরাইজনের ওপার থেকে কোনো খবর আমরা জানতে পারি না, তেমনি এই মহাজাগতিক দিগন্তের ওপার থেকেও কোনো তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না।
আজ এমন অঞ্চল আছে, যেখানকার আলো কখনোই আমাদের কাছে পৌঁছাবে না—চিরকাল নয়। কারণ তাদের মাঝের স্থান এত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে যে আলো এগোতেই পারছে না।
তাহলে কি মহাবিশ্বের শেষ সীমানায় পৌঁছানো অসম্ভব?
বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, উত্তরটি হ্যাঁ। মানুষের তৈরি সবচেয়ে দ্রুত মহাকাশযান ভয়েজার–১ আজ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটছে। এই গতিতে আমাদের নিকটতম নক্ষত্রের কাছে পৌঁছাতেই লাগবে প্রায় ৭০ হাজার বছর। আলোর গতির তুলনায় এটি কচ্ছপের হাঁটা। প্রযুক্তি যদি একদিন আলোর গতির কাছাকাছি পৌঁছায়ও, তবু এই মৌলিক সত্য বদলাবে না—মহাবিশ্বের প্রসারণ আমাদের চেয়ে দ্রুত।
আমরা যদি আলোর গতিতেও চলি, তবে মহাবিশ্বের প্রসারিত হওয়ার গতির সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা কোনোদিনই সেই অদৃশ্য দেয়ালে পৌঁছাতে পারব না। পৃথিবী থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র বা গ্যালাক্সিতে পৌঁছাতেও আমাদের হাজার হাজার বছর লেগে যাবে, আর মহাবিশ্বের প্রান্ত তো অকল্পনীয় এক গন্তব্য। এই বিশাল শূন্যতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষ কতটা ক্ষুদ্র এবং এর রহস্যগুলো কতখানি গভীর। আমরা কেবল আমাদের সীমাবদ্ধ দিগন্তের ভেতরে বসেই অসীমকে জানার চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু সেই অসীমের শেষ সীমানা ছোঁয়া হয়তো চিরকালই আমাদের কাছে এক অপূর্ণ স্বপ্ন হয়ে থাকবে।
