মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৭

প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল অতিকায় ডাইনোসরদের রাজত্ব। সৌরজগতে এখনো ওঁত পেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন হাজারো প্রাণঘাতী গ্রহাণু। যেকোনো মুহূর্তে সামান্য কক্ষচ্যুত হয়ে এর কোনোটি যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তবে আবারও নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী! কিন্তু এদের আঘাতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা কতটা? শুধুই কি গ্রহাণু, নাকি মহাকাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর আরও কোনো গুপ্তঘাতক?

এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কিছু অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞানচিন্তায়। প্রথম অধ্যায় অনুবাদ করছেন ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী। আজ পড়ুন প্রথম অধ্যায়ের সপ্তম পর্ব।

সরাসরি গায়ে আঘাত না করে যদি গ্রহাণুর খুব কাছে, কয়েক শ মিটার এলাকার মধ্যে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাহলে কেমন হবে? এ সময় যে ভয়ংকর তাপশক্তি উৎপন্ন হবে, তা বস্তুটির পৃষ্ঠের খানিকটা অংশকে গ্যাসে রূপান্তরিত করতে যথেষ্ট। অতঃপর এগুলোর প্রসারণের মাধ্যমে সৃষ্ট ধাক্কায় মূল গ্রহাণুর গতিপথ সামান্য হলেও পরিবর্তন আসতে পারে। পুরো ব্যাপারটি যেন অনেকটা ভরবেগের সংরক্ষণের সূত্র মেনে জ্বালানির ধাক্কায় রকেট উড্ডয়নের মতো।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, গতিপথে সামান্য বিচ্যুতি এলে কি আর আহামরি লাভ হবে! আসলে বিষয়টি এমন নয়। যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, মহাশূন্যে প্রতিটি ধাক্কা বা বিচ্যুতিই তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা যদি গ্রহাণুর কাছে একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত করতে পারি, তাহলে উৎপন্ন সম্মিলিত ধাক্কার প্রভাব সেটিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তখন বস্তুটির পৃথিবীকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এ কৌশলের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, পাথরের স্তূপসদৃশ গ্রহাণুদের বিরুদ্ধেও কার্যকারিতা। তবে সফলতার হার ঠিক কত হবে, তা আগাম বলা বড্ড মুশকিল।

অনুমিতভাবেই কৌশলটির কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার নাম সময়। সরাসরি পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা গ্রহাণুদের যদি আমরা আগেভাগে শনাক্ত করতে না পারি, তাহলে ব্যর্থতার সম্ভাবনা পাল্লা দিয়ে বাড়বে। কারণ, পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় এগুলো আমাদের যত কাছে থাকবে, গতিপথ পরিবর্তনে প্রয়োজনীয় ধাক্কার মাত্রা তত বেশি হবে। অর্থাৎ দূরত্ব যত বেশি, ঝামেলা তত কম।

আমরা যদি গ্রহাণুর কাছে একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত করতে পারি, তাহলে উৎপন্ন সম্মিলিত ধাক্কার প্রভাব সেটিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, ন্যূনতম ১০ বছর হাতে থাকলে ভালো হয়। তবে অতিরিক্ত সাবধানীদের চাওয়া এই সময়কালের দ্বিগুণ। তাত্ত্বিকভাবে কৌশলটি সবচেয়ে ভালো কাজ করার কথা ছোট আকারের গ্রহাণুদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সমস্যা হলো, তুলনামূলক অনুজ্জ্বল হওয়ায় আগেভাগে এগুলোকে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। অথচ হাতে কিছুটা বাড়তি সময় না থাকলে গতিপথ বদলানোর কর্মযজ্ঞে সামান্যতম ভুল করার অবকাশও থাকে না। তখন যেভাবেই হোক না কেন, পৃথিবীর সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘর্ষের আগেই একগাদা পারমাণবিক বোমাকে (আনুমানিক ২০টি) ঠিকঠাকভাবে পৌঁছাতে হবে গ্রহাণুর কক্ষপথে। নয়তো বসে বসে মানবসভ্যতার আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এ কৌশলের সবকটি ধাপ পরিকল্পনামাফিক ঘটলেও যে পৃথিবীমূখী কোনো গ্রহাণুর কবল থেকে চিরস্থায়ী পরিত্রাণ মিলবে, তার পূর্ণ নিশ্চয়তা নেই। কারণ, বিস্ফোরণের ধাক্কায় তার কক্ষপথে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা আগেভাগে হিসাব করে বলা প্রায় অসম্ভব। এমনও হতে পারে, এ যাত্রায় পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গ্রহাণুটি হয়তো নতুন এক কক্ষপথে পরিভ্রমণ শুরু করবে, যা আগের চেয়ে স্বল্প বা দীর্ঘ সময় ব্যবধানে এটিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনবে আমাদের দোরগোড়ায়!

বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছেন, মহাজাগতিক বস্তুটির গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় এক ইঞ্চিরও কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ তারতম্য করতে পারলেই সেই কী-হোলটিকে নির্বিঘ্নে এড়ানো সম্ভব।

এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ ‘৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস’ নামের গ্রহাণু। প্রায় ৩৪০ মিটার ব্যাস ও ২০ মিলিয়ন টন ভরের এ পাথুরে বস্তুকে রাখা হয়েছে সম্ভাব্য বিপজ্জনক বস্তুর তালিকায়। পৃথিবীর সঙ্গে সত্যি সত্যি এর সংঘর্ষ হলে প্রায় ৯০০ মেগাটন পর্যন্ত শক্তি অবমুক্ত হতে পারে। কোনো আকস্মিক পরিবর্তন না এলে ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল এটি আমাদের খুব কাছ দিয়ে (মাত্র ১৯ হাজার মাইল) উড়ে যাবে। তখন একে চলমান আলোক বিন্দুরূপে বিভিন্ন দেশ থেকে খালি চোখেই দেখা যাবে। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব কষে বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত হয়েছেন, বহু আবহাওয়া ও যোগাযোগ উপগ্রহের তুলনায় এই গ্রহাণুটি ভূপৃষ্ঠের নিকটবর্তী হলেও এ যাত্রায় সরাসরি সংঘর্ষের একদম সুযোগ নেই। তবে একসময়ে তাঁদের জোরালো আশঙ্কা ছিল, এটি যদি এবার মহাকাশের একটি বিশেষ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে পাড়ি দেয়, তাহলে এর গতিপথ এমনভাবে বদলে যাবে যেন পরের বার আগমনের সময়ে, অর্থাৎ ২০৩৬ সালে পৃথিবীর সঙ্গে নিশ্চিত সংঘর্ষ বাধে। প্রায় ৬০০-৮০০ মিটার প্রশস্ততার এই ক্ষুদ্র এলাকাগুলোর নামকরণ করা হয়েছে গ্র্যাভিটেশনাল কী-হোল।

৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস গ্রহাণুর কাল্পনিক ছবি
ছবি: ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি

‘৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস’ আবিষ্কৃত হয়েছিল ২০০৪ সালে। গতিপথ নিয়ে শুরুতে ধোঁয়াশা থাকায় কী-হোলের মধ্য দিয়ে এর অতিক্রম করার সম্ভাব্যতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহল দ্বিধাবিভক্ত ছিল। অবশ্য এমনিতেও যে সম্ভাবনা খুব বেশি ছিল, তা নয়। প্রতি ৪৫ হাজার চক্রে হয়তো সর্বোচ্চ ১ বার। তবুও সাবধানের মার নেই! কারণ, মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্নে কোনো ঝুঁকি নেওয়া চলে না। যা-ই হোক, দৈবক্রমে যদি গ্রহাণুটি সত্যিই কী-হোলের মধ্য দিয়ে পাড়ি দেয়, তাহলে এটির গতিপথ বদলাতে আমাদের হাতে সর্বোচ্চ সময় থাকবে ৭ বছর। যেকোনো বিচারে এ সময়কাল অপ্রতুল। তাই অনেকে প্রথম সুযোগেই, অর্থাৎ ২০২৯ সালে কিছু একটা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁরা হিসাব কষে দেখেছেন, মহাজাগতিক বস্তুটির গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় এক ইঞ্চিরও কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ তারতম্য করতে পারলেই সেই কী-হোলটিকে নির্বিঘ্নে এড়ানো সম্ভব।

৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস গ্রহাণুটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ২০০৪ সালে। গতিপথ নিয়ে শুরুতে ধোঁয়াশা থাকায় কী-হোলের মধ্য দিয়ে এর অতিক্রম করার সম্ভাব্যতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহল দ্বিধাবিভক্ত ছিল।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ আর এমন কী শক্ত কাজ! এর যাত্রাপথের কোনো এক কৌশলগত স্থানে একটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণই আমাদের নিরাপদে রাখার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা। হ্যাঁ, কথা সত্য। কিন্তু গুরুতর সমস্যা অন্যত্র। গ্রহাণুটির জন্য মহাকাশে এটিই একমাত্র কী-হোল নয়! তাত্ত্বিকভাবে এদের সংখ্যা হতে পারে হাজার হাজার। এগুলোর কোনোটা বস্তুটিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনবে ৫ বছর পরে, কোনোটা ১০, আবার কোনোটা কয়েক যুগেরও বেশি সময় পরে। অর্থাৎ ভয়ংকর পারমাণবিক শক্তির প্রয়োগও হয়তো আমাদের শুধু সাময়িক স্বস্তিই দিতে পারবে, চিরস্থায়ী সমাধান নয়!

কী-হোলের ধারণা

এতক্ষণের আলোচনায় আপনাদের মনে হতে পারে, গ্রহাণুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রই সম্ভবত আমাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। এটি মোটেও সত্য নয়। অন্য সবকিছুর মতোই এরও রয়েছে চমৎকার বিকল্প। ডাইনোসরদের যমদূত চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? সেটির আঘাতে অবমুক্ত শক্তি যোজন যোজন ব্যবধানে হার মানিয়েছিল তাত্ত্বিকভাবে বর্তমান পৃথিবীর সব পারমাণবিক বোমার একযোগে বিস্ফোরণকেও। এখন আমরা যদি এই মূলনীতিকে উল্টো গ্রহাণুদের ওপর প্রয়োগ করি, তাহলে কেমন হবে?

যথোপযুক্ত ভারী বস্তু দিয়ে ঠিকঠাক ধাক্কা দেওয়া গেলে ফলাফল যে বোমা বিস্ফোরণের চেয়ে কোনো অংশে কম হবে না, তা একরকম চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়। এ কৌশলের সবচেয়ে বড় উল্লেখযোগ্য দিক হলো, একে ইতিমধ্যে বাস্তব দুনিয়ায় একাধিকবার পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। শুরুটা হয়েছিল নাসার বিখ্যাত ডিপ ইমপ্যাক্ট মিশনের মাধ্যমে। এর আওতায় ২০০৫ সালের ৪ জুলাই একটি স্পেস প্রোবকে মূল মহাকাশযান থেকে বিচ্ছিন্ন করে সজ্ঞানে সজোরে সংঘর্ষ করানো হয় প্রায় সাড়ে তিন মাইল ব্যাসের একটি ধূমকেতুর সঙ্গে, যার নাম ‘টেম্পল ১’। মিশনটির সঙ্গে কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ধ্বংস বা গতিপথ পরিবর্তনের সামান্যতম যোগসূত্র ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ধূমকেতুর অভ্যন্তরীণ গঠন পর্যবেক্ষণ। মহাকাশযান পাশ দিয়ে উড়ে গেলে সব সময় এদের বাইরের পৃষ্ঠটাই আমাদের চোখে পড়ে। অধরা থেকে যায় গহিনের লুকানো রহস্য।

বিস্ফোরণের পরে টেম্পল ১-এর গহিন থেকে যে বিপুল পরিমাণ বরফ ও ধুলোবালি ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসে, সেগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে বহুদূর থেকেই করা সম্ভব হয়েছিল।

জ্যোতির্বিদদের দৃঢ়বিশ্বাস, সূর্যের তাপে ধূমকেতুদের উপরিভাগ কালের আবর্তে বারবার বদলে গেলেও ভেতরের অংশ সম্ভবত একদম জন্মলগ্নের মতোই অবিকৃত থাকতে পারে। যদি কোনোভাবে আমরা এগুলোর অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে সৌরজগতের জন্মরহস্য তো বটেই, পৃথিবী সৃষ্টির দিনগুলোতে পানি বা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য জৈব উপাদান বয়ে নিয়ে আসাতে ধূমকেতুরা কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, উত্তর মিলতে পারে এই শত বছরের পুরোনো প্রশ্নেরও।

এমন বাস্তবতা থেকেই মূলত পরিকল্পনা করা হয়েছিল স্বপ্রণোদিত সংঘর্ষের। বিস্ফোরণের পরে টেম্পল ১-এর গহিন থেকে যে বিপুল পরিমাণ বরফ ও ধুলোবালি ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসে, সেগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে বহুদূর থেকেই করা সম্ভব হয়েছিল। এ সময় স্পেস প্রোবের ধ্বংসাবশেষ যেন কোনো রকম বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, সে জন্য একে গোড়াতেই তৈরি করা হয়েছিল তামা দিয়ে। বলা বাহুল্য, ধূমকেতুতে সাধারণত এই মৌলটির উপস্থিতি নগণ্য। যা-ই হোক, ৩৫০ কেজিরও বেশি ভরের মনুষ্যনির্মিত নভোযানটি প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক ৬ মাইল বেগে ধূমকেতুর বুকে আছড়ে পড়ায় যে শক্তি অবমুক্ত হয়, তা প্রায় ৫ টন টিএনটি বিস্ফোরণের সমান।

টেম্পল ১ ধূমকেতু
ছবি: উইকিপিডিয়া

কোনো ধরনের প্রচলিত বিস্ফোরকের উপস্থিতি ছাড়াই শুধু গতিশক্তিকে পুঁজি করে এমন মাত্রায় ধ্বংসযজ্ঞ নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ ঘটনা। পাশাপাশি প্রায় ছয় মাসব্যাপী আড়াই শ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ঘটনাও মানবজাতির প্রকৌশলবিদ্যার সক্ষমতার অনবদ্য নিদর্শন।

ডিপ ইমপ্যাক্টের যেখানে সমাপ্তি, নাসার ডার্ট মিশনের কারিশমা যেন সেখান থেকেই শুরু। এটি ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসের প্রথম মহাকাশ মিশন, যা কোনো গ্রহাণুর কক্ষপথ পরিবর্তনের জন্য নকশা করা হয়েছিল। এর লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বাছাই করা হয় ডাইমরফোস নামে একটি ছোট গ্রহাণুকে। মজার ব্যাপার হলো, এটি সরাসরি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে না; বরং এর পথচলা আরেকটি তুলনামূলক বড় গ্রহাণু ডিডিমোসকে ঘিরে। সেটিকে একবার ঘুরে আসতে ডাইমরফোসের সময় লাগে মাত্র ১১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট।

৩৫০ কেজিরও বেশি ভরের মনুষ্যনির্মিত নভোযান স্পেস প্রোব প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক ৬ মাইল বেগে ধূমকেতুর বুকে আছড়ে পড়ায় যে শক্তি অবমুক্ত হয়, তা প্রায় ৫ টন টিএনটি বিস্ফোরণের সমান।

অন্যদিকে যুগল গ্রহাণুর বাইনারি সিস্টেমটি ৭৭০ দিনে সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসে। ডার্ট মিশনে ব্যবহৃত মহাকাশযানের ভর ছিল প্রায় ৬১০ কেজি। ছোটখাটো একটি গাড়ির সমান আকারের বস্তুটির নকশা ও নির্মাণযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস ল্যাবরেটরিতে। ২০২১ সালের নভেম্বরে স্পেসএক্স কোম্পানির বিখ্যাত ফ্যালকন ৯ রকেটে চাপিয়ে একে উৎক্ষেপণ করা হয়। দশ মাসে প্রায় ৭ মিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সেটি পৌঁছায় লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি এলাকায়। অতঃপর ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪ মাইল গতিতে আছড়ে পড়ে ডাইমরফোসের বুকে।

নিখুঁত লক্ষ্যভেদের মূল কৃতিত্ব নাসার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও স্মার্ট নেভিগেশন অ্যালগরিদমের। পৃথিবী থেকে গ্রহাণুটির দূরত্ব এতটাই বেশি ছিল যে রেডিও সংকেত ব্যবহারে তথ্য আদান-প্রদানে কয়েক মিনিট সময় লাগত। তাই মহাকাশযানটিকে সর্বদা দূর থেকে তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না। শেষ দিকে নিজস্ব ক্যামেরায় তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে এটি নিজেই নিজের গতিপথে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নিয়েছিল। অবশ্য নভোযানটিকে ঠিক কত ডিগ্রি কোণে ও কত গতিতে ধাক্কা দিতে হবে, তা আগে থেকেই এর মধ্যে প্রোগ্রাম করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা।

মূলত ডাইমরফোস গ্রহাণুটি টেম্পল ১-এর তুলনায় ১০ হাজার গুণ হালকা
ছবি: উইকিপিডিয়া

যা-ই হোক, ডাইমরফোস-ডার্ট সংঘর্ষে অবমুক্ত শক্তির পরিমাণ প্রায় ৩ টন টিএনটি বিস্ফোরণের সমতুল্য। অর্থাৎ ডিপ ইমপ্যাক্ট মিশনের স্পেস প্রোব ধূমকেতুর বুকে আছড়ে পড়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। তবুও এই আঘাতেই গ্রহাণুটির গতিপথে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। পর্যায়কাল ৩৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড কমে গিয়ে সেটি নতুন কক্ষপথে ডিডিমোসকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে। কম ধাক্কাতেই কাজ হাসিল হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ডাইমরফোসের ভর। মূলত এটি টেম্পল ১-এর তুলনায় ১০ হাজার গুণ হালকা। তা ছাড়া সংঘর্ষের সময় ছিটকে বাইরে আসা পাথরগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে সেগুলো প্রত্যেকেই একধরনের ক্ষুদ্র রকেট ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করতে শুরু করে! এদের ধাক্কাও গ্রহাণুটিকে বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দূরে সরিয়ে দিতে ভূমিকা রাখে।

ডাইমরফোস-ডার্ট সংঘর্ষে অবমুক্ত শক্তির পরিমাণ প্রায় ৩ টন টিএনটি বিস্ফোরণের সমতুল্য। অর্থাৎ ডিপ ইমপ্যাক্ট মিশনের স্পেস প্রোব ধূমকেতুর বুকে আছড়ে পড়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনায় ৪০ শতাংশ কম।

সফল ডার্ট মিশনের দরুন গ্রহাণু থেকে আনুমানিক হাজার টন পাথর ও ধূলিকণা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ধ্বংসাবশেষগুলো তৈরি করে প্রায় ৬ হাজার মাইল দীর্ঘ লেজসদৃশ এক কাঠামো। তখন একে দেখাচ্ছিল অনেকটা ধূমকেতুর মতো। পরবর্তী কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল এমন বিরল দৃশ্য। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সংঘর্ষের প্রভাবে সম্ভবত স্থায়ীভাবে বদলে গেছে ডাইমরফোসের গড়ন। গ্রহাণুটিকে নতুন রূপে খুব কাছ থেকে দেখতে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি হেরা নামে একটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এটির ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

নাসার ডার্ট মিশনের কলাকৌশল

ভালো কথা, পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাতে গ্রহাণুর আগ্রাসন রুখতে গেলে আমাদের যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, তার সবগুলোই বিস্ফোরকহীন ভারী বস্তু ব্যবহারের কৌশলেও উপস্থিত। তাই একেও চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে মেনে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার অবকাশ খুব কমই আছে। তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের যে একটি শক্তিশালী বিকল্প খুঁজে পাওয়া গেছে, সেটাও তো কম স্বস্তিদায়ক নয়, তাই না?

চলবে…

ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে

টীকা ১: অ্যাপোফিস হলো মিসরীয় পৌরাণিক দেবতা আপেপের গ্রিক সংস্করণ। মিথলজি অনুসারে, এটি এক বিশাল আকৃতির সাপ, যা প্রতিদিন সূর্যকে গিলে ফেলে পৃথিবীকে চিরস্থায়ী অন্ধকারে নিমজ্জিত করার অবিরাম চেষ্টায় লিপ্ত।

টীকা ২: ৯৯৯৪২ অ্যাপোফিসের ২০২৯ সালের পৃথিবীমূখী গতিপথ বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত ২০টিরও বেশি বিপজ্জনক কী-হোলের সন্ধান মিলেছে। তবে এতে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কারণ নাসা ও ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি বহু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাবনিকাশের পর সিদ্ধান্তে এসেছে, এগুলোর কোনোটায় মধ্য দিয়ে গ্রহাণুটির অতিক্রম করার সম্ভাবনা নেই। কমপক্ষে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে এটির সঙ্গে পৃথিবীর সংঘর্ষের ঝুঁকিও শূন্যের কোঠায়।

টীকা ৩: পৃথিবীর কোনো দেশই পরীক্ষামূলকভাবে বা সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে এখনো গ্রহাণু ধ্বংস বা গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেনি। এই কৌশল নিয়ে অগ্রগতির প্রায় পুরোটাই কম্পিউটার সিমুলেশনভিত্তিক।

টীকা ৪: রাসায়নিক বিশ্লেষণে টেম্পল ১-এর গহিনে প্রচুর জটিল জৈব অণুর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া গেছে। এগুলো পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের প্রাথমিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।