মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু - ১

প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল অতিকায় ডাইনোসরদের রাজত্ব। সৌরজগতে এখনো ওঁত পেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন হাজারো প্রাণঘাতী গ্রহাণু। যেকোনো মুহূর্তে সামান্য কক্ষচ্যুত হয়ে এর কোনোটি যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তবে আবারও নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী! কিন্তু এদের আঘাতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা কতটা? শুধুই কি গ্রহাণু, নাকি মহাকাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর আরও কোনো গুপ্তঘাতক?

এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বইতে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কিছু অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞানচিন্তায়। প্রথম অধ্যায় অনুবাদ করছেন ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী। আজ পড়ুন প্রথম অধ্যায়ের প্রথম পর্ব।

গ্রহাণুর কাল্পনিক ছবিছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ঘড়ির কাঁটা ৬টা স্পর্শ করতেই অন্যান্য সকালের মতো তারস্বরে বেজে উঠল টেবিলে রাখা বেরসিক অ্যালার্ম। বহু কষ্টে একরাশ বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলল অর্ক। প্রিয় দলের ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে গতকালও ঘুমাতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঘুমিয়েই আজ সারাটা দিন সন্তুষ্ট থাকতে হবে ভেবে তার বিরক্তির মাত্রা বেড়ে গেল বহুগুণ। কিন্তু কী আর করা! যানজট এড়িয়ে সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে হলে আগেভাগে বিছানার মায়া ত্যাগ করা ছাড়া উপায় নেই। সামান্য বাড়তি আরাম-আয়েশের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে গরমে সেদ্ধ হওয়া বা খুঁতখুঁতে বসের চক্ষুশূল হতে মোটেই রাজি নয় অর্ক। অগত্যা মনের সবটুকু জোর একসঙ্গে করে কোনোমতে বিছানায় উঠে বসল সে। একরকম টলতে টলতে রওনা দিল ওয়াশরুমের দিকে।

চোখমুখে পানির ঝাপটা দিতেই নিজের ওপর খানিকটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেল অর্ক। দাঁত ব্রাশ করে ঘরে ঢুকতেই কুয়াশা ভেদ করে বারান্দা দিয়ে আসা শীতের সকালের এক ফালি মিষ্টি রোদ ও কনকনে ঠান্ডা বাতাস অভ্যর্থনা জানাল ওকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আচমকা ছাদে যাওয়ার ইচ্ছাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। নানা কাজের ব্যস্ততায় আজকাল এমনিতেই ছাদে যাওয়ার ফুরসত মেলে না। আজও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ঘুম ঘুম ভাব কাটাতে আপাতত এর চেয়ে কোনো ভালো বুদ্ধি ওর মাথায় এল না। কড়া এক কাপ লাল চা বানিয়ে বিরস মুখে লিফটের দিকে পা বাড়াল অর্ক।

আরও পড়ুন
আলস্যভরে নিচের দিকে তাকাতেই অদ্ভুত এক দৃশ্য নজরে পড়ল অর্কের। দৃষ্টিসীমার সবগুলো ছোট-বড় গাছকে ঘিরে একটি নয়, বরং দুটি ছায়া দেখা যাচ্ছে!

অর্কদের অ্যাপার্টমেন্ট শহরের এক কোণায়। আশপাশে বহুতল ভবনের সংখ্যা খুব কম। সত্যি বলতে শহরের এদিকটায় বাড়িঘরের চেয়ে গাছপালার সংখ্যাই বেশি। তবে প্রকৃতির রাজত্ব সম্ভবত আর বেশি দিন চলবে না। ইতিমধ্যে কয়েকজন হোমড়াচোমড়া ডেভেলপার কোম্পানির নজর পড়েছে এখানে। কয়েক কিলোমিটার দূরের এক লেক কেন্দ্র করে বড় পরিসরে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলার জোগাড়যন্ত্র চলছে।

যা-ই হোক, ছাদে পা রাখতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো তার। কী যেন একটা ঠিক নেই! চারদিকে আশ্চর্য সুনসান নীরবতা। ভ্রু কুঁচকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল সে। চায়ের কাপে দুবার চুমুক দেওয়ার পর ধরতে পারল সমস্যাটা। একটা পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না! প্রকৃতির কোলঘেঁষা হওয়ায় এখানে শত শত পাখির আনাগোনা। এদের কিচিরমিচির শব্দে সকাল-সন্ধ্যা মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। আজ পাখিগুলো সব একসঙ্গে কোথায় হারাল?

পাখিদের অন্তর্ধান নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করল না অর্কের। ‘ওদের তো আর সাতসকালে অফিস ধরার তাড়া নেই। আগেভাগে ঘুম থেকে উঠে ডাকাডাকির দরকারই-বা কী’, আনমনে চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিতে দিতে ছাদের রেলিংয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ভাবল সে। আলস্যভরে নিচের দিকে তাকাতেই অদ্ভুত এক দৃশ্য নজরে পড়ল তার। দৃষ্টিসীমার সবগুলো ছোট-বড় গাছকে ঘিরে একটি নয়, বরং দুটি ছায়া দেখা যাচ্ছে! এর মধ্যে একটি আবার গাছের কাণ্ডকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন করছে! নিশ্চল ছায়াটির উৎস নিঃসন্দেহে উদীয়মান সূর্য। তাহলে বাড়তি ছায়াটা এল কোথা থেকে?

আরও পড়ুন
যা-ই হোক, ছাদে পা রাখতেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো অর্কের। কী যেন একটা ঠিক নেই! চারদিকে আশ্চর্য সুনসান নীরবতা। ভ্রু কুঁচকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল সে।

দ্বিতীয় আলোর উৎস খুঁজতে অর্ক আকাশের দিকে তাকাল। প্রথমে নতুন কিছু চোখে পড়ল না। তবে উজ্জ্বল আলোয় চোখ সয়ে যেতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে। গতানুগতিক উড়োজাহাজের চেয়েও দ্রুতগতিতে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে এক অগ্নিগোলক! অতিকায় উল্কাপিণ্ডটি (নাকি গ্রহাণু?) দিগন্তের দিকে অগ্রসর হতে হতে ক্রমশ নিচে নেমে আসছে।

নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না অর্ক। খানিক বাদে বস্তুটি দিগন্ত ছুঁয়ে মাটিতে আছড়ে পড়তেই সম্বিত ফিরে পেল সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক শব্দহীন বিস্ফোরণের আলোর ঝলকানিতে তার পুরো দুনিয়াটাই মুহূর্তের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল। দুচোখ ভরে উঠল পানিতে। নিজেকে সামলে দিগন্তের দিকে তাকাতেই তীব্র আতঙ্কে জমে গেল সে। বিস্ফোরণস্থলে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গম্বুজ আকৃতির ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী। পারমাণবিক বোমার আঘাতে যেমন মাশরুম ক্লাউড সৃষ্টি হয়, অনেকটা সে রকম। নিজের জীবদ্দশায় এমন দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে হবে, তা সে কোনো দিন দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।

বহুদূর থেকেও সেই অগ্নিকুণ্ডলীর উত্তাপের আঁচ অনুভব করতে পারছিল অর্ক। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন দাঁড়িয়ে আছে তপ্ত কোনো চুলার পাশে। কুণ্ডলীটি বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল পরিবেশের তাপমাত্রা। অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের আশপাশের গাছপালাগুলোর ডাল থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে অর্ক এই প্রথমবারের মতো অনুভব করল, সে আর নিছক দর্শকের কাতারে নেই। নিজেও রয়েছে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে। সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্রবল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল গোটা পৃথিবী। ছাদের এক কোণে ছিটকে পড়ে গেল সে। চিলেকোঠার জানালার ভাঙা কাচের টুকরোর আঘাতে হাত কেটে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন
পারমাণবিক বোমার আঘাতে যেমন মাশরুম ক্লাউড সৃষ্টি হয়, অনেকটা সে রকম। নিজের জীবদ্দশায় এমন দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে হবে, তা সে কোনো দিন দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।

বেশ কয়েকবার জোরে ঝাঁকুনির পর ভূমিকম্প থামলে বহু কষ্টে উঠে দাঁড়াল অর্ক। মনে ক্ষীণ আশা, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিটুকু হয়তো পার হয়ে গেছে। কিন্তু না। বাস্তবতা বড্ড নিষ্ঠুর। সে তো তখন জানত না, অগণিত মানুষের মৃত্যুপরোয়ানা সঙ্গী করে ঘণ্টায় ৭০০ মাইলেরও বেশি গতিবেগ নিয়ে ছুটে আসছে এক অকল্পনীয় শক্তিশালী শকওয়েভ। এর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার শেষ সুযোগ বহু আগেই পেরিয়ে গেছে।

ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: অ্যামাজন ডটইন

১০ মাইল উঁচু সুনামির সমান শক্তি নিয়ে শকওয়েভের অগ্রভাগ আছড়ে পড়ল অর্কদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের ওপর। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সব বাসিন্দা সমেত আক্ষরিক অর্থেই মাটির সঙ্গে মিশে গেল স্থাপনাটি। এর গতিপথে থাকা জীব-জড় নির্বিশেষে সব বস্তু কমবেশি একই পরিণতি বরণ করল। ধ্বংসলীলা থামানোর আগে সেদিন দুবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল শকওয়েভটি। সব সিসমোগ্রাফ যন্ত্রই ঘটনাটিকে ভয়ংকর শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করেছিল। তবে সেসব বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করার অবকাশ ছিল না কারও। সবাই তখন ব্যস্ত তীব্র ঝোড়ো বাতাস, অগ্নিকাণ্ড, সুনামিসহ শকওয়েভের আঘাত থেকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে...

চলবে…

লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড

ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে

টীকা ১: এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে উঁচু সুনামির উচ্চতা মাত্র ১ হাজার ৭২০ ফুট (০.৩২ মাইল)। ১৯৫৮ সালের ৯ জুলাই আলাস্কার লিটুয়া উপসাগরে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে এই ঘটনা ঘটেছিল।

আরও পড়ুন