গ্রহাণু খুড়ে মূল্যবান সম্পদ পাওয়া কল্পগল্প নাকি বাস্তব

অ্যাস্টেরয়েড বা গ্রহাণুছবি: গেটি ইমেজ

আকাশের ওই মিটমিটে তারাগুলোর ভিড়ে এমন কিছু পাথর ভেসে বেড়াচ্ছে, যা হয়তো সোনার চেয়েও দামি! এগুলোকে আমরা অ্যাস্টেরয়েড বা গ্রহাণু বলি। এই গ্রহাণু কি শুধুই মহাকাশের আবর্জনা, নাকি ভবিষ্যতের কোনো গুপ্তধন?

বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই ভাবছেন মহাকাশে এসব গ্রহাণু থেকে মূল্যবান সম্পদ সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পাথরগুলো আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না। তবে স্পেনের ইনস্টিটিউট অব স্পেস সায়েন্সেসের একদল গবেষক সম্প্রতি এই রহস্যের জট খোলার অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তাদের এই নতুন গবেষণা বলছে, মহাকাশ থেকে অমূল্য সম্পদ পৃথিবীতে নিয়ে আসার সময় এসে গেছে!

কার্বনেশাস কনড্রাইট
ছবি: ব্রিটানিকা

মহাকাশ থেকে মাঝেমধ্যে পৃথিবীতে উল্কপিণ্ড পড়ে, এটা আমরা জানি। এর মধ্যে এক বিশেষ ধরনের উল্কা আছে, যাদের বলা হয় কার্বনেশাস কনড্রাইট। এগুলো আসে সি-টাইপ অ্যাস্টেরয়েড থেকে। এই উল্কাপিন্ডগুলো খুবই বিরল। পৃথিবীতে যত উল্কা পড়ে, তার মাত্র ৫ শতাংশ হলো এই জাতের।

কেন এগুলো এত বিরল? কারণ এগুলো খুব ভঙ্গুর। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় এগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। সাহারা মরুভূমি বা অ্যান্টার্কটিকার মতো জায়গায় এদের কিছু অংশ মাঝেমধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। গবেষক দলনেতা জোসেপ এম. ট্রিগো-রদ্রিগেজ বলছেন, ‘এই পাথরগুলো আমাদের সৌরজগতের একদম শুরুর দিকের সাক্ষী। এগুলো পরীক্ষা করলেই বোঝা যাবে, এদের মূল গ্রহাণুটি আসলে কী দিয়ে তৈরি।’

আরও পড়ুন
মহাকাশ থেকে মাঝেমধ্যে পৃথিবীতে উল্কপিণ্ড পড়ে, এর মধ্যে এক বিশেষ ধরনের উল্কা আছে, যাদের বলা হয় কার্বনেশাস কনড্রাইট। এগুলো আসে সি-টাইপ অ্যাস্টেরয়েড থেকে। এগুলো খুবই বিরল।

স্পেনের গবেষক দলটি ল্যাবরেটরিতে এই বিরল উল্কাপিন্ডগুলোর রাসায়নিক ব্যবচ্ছেদ করেছেন। মাস স্পেকট্রোমেট্রি ব্যবহার করে তাঁরা দেখেছেন, এগুলোর ভেতরে ঠিক কী কী উপাদান লুকিয়ে আছে। উদ্দেশ্য একটাই, ভবিষ্যতে যদি আমরা মহাকাশযান পাঠিয়ে খনি খুঁড়তে চাই, তবে সেটা কি লাভজনক হবে; নাকি সব পরিশ্রম পণ্ডশ্রম হবে?

টানা এক দশকের বেশি সময় ধরে তাঁরা এই পাথরগুলোর ওপর নানা পরীক্ষা চালিয়েছেন। নাসার অ্যান্টার্কটিক কালেকশন থেকে আনা নমুনাগুলো নিয়ে তাঁরা দেখেছেন মহাকাশের চরম পরিবেশে এদের খনিজ উপাদানের কী পরিবর্তন হয়।

বেশিরভাগ গ্রহাণুতে মূল্যবান ধাতুর পরিমাণ খুব সামান্য
ছবি: নাসা

সবাই ভাবছে, মহাকাশে গেলেই বুঝি মুঠো মুঠো সোনা পাওয়া যাবে! কিন্তু গবেষক পাউ গ্রেবোল টমাস একটু ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁর মতে, ‘বেশিরভাগ অ্যাস্টেরয়েডে মূল্যবান ধাতুর পরিমাণ খুব সামান্য। তাই আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল, এত খরচ করে সেখানে মাইনিং করাটা আদৌ লাভজনক হবে নাকি লস হবে, তা বোঝা।’

আরেক গবেষক জর্দি ইবানেজ-ইনসা একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন, ‘অনেক গ্রহাণুর ওপর আলগা মাটি থাকে। রোবট পাঠিয়ে সামান্য নমুনা নিয়ে আসা আর বাণিজ্যিকভাবে খনি খোঁড়ার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। তবে হ্যাঁ, মহাকাশে খনি খুঁড়লে পৃথিবীর পরিবেশের ওপর চাপ কমবে, এটা একটা বড় ইতিবাচক দিক।’

আরও পড়ুন
গবেষক জর্দি ইবানেজ-ইনসা বলছেন, ‘অনেক গ্রহাণুর ওপর আলগা মাটি থাকে। রোবট পাঠিয়ে সামান্য নমুনা নিয়ে আসা আর বাণিজ্যিকভাবে খনি খোঁড়ার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল।'

সব অ্যাস্টেরয়েড কিন্তু এক নয়। গত সাড়ে ৪ বিলিয়ন বছরে সূর্যের তাপে মহাজাগতিক সংঘর্ষে একেকটা গ্রহাণু একেকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, আমরা যদি পানি খুঁজি, তবে এক ধরনের অ্যাস্টেরয়েডে যেতে হবে। আর যদি ধাতু খুঁজি, তবে যেতে হবে অন্য ধরনের গ্রহাণুতে।

গবেষণার একটা বড় সিদ্ধান্ত হলো, যেসব গ্রহাণু আদিম, সেগুলোতে এখনই খনি খোঁড়া খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ সেখানে ধাতুগুলো খুব ঘনীভূত অবস্থায় নেই।

তার চেয়ে বরং যেসব গ্রহাণুতে অলিভিন বা স্পিনেলের মতো খনিজ আছে, সেগুলো অনেক বেশি লাভজনক টার্গেট হতে পারে। এই দুটি উপাদান পৃথিবীর ম্যান্টলে পাওয়া যায়। এদের সংকেত যথাক্রমে (Mg,Fe)­2SiO­4 এবং MgAl2O4

ভবিষ্যতে আমরা যখন চাঁদ বা মঙ্গলে বসতি গড়ব, তখন পৃথিবী থেকে সব রসদ বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তখন এই অ্যাস্টেরয়েডগুলোই হবে আমাদের পানির ট্যাংক ও তেলের পাম্প। বিশেষ করে পানি আছে এমন গ্রহাণুগুলো হবে মহাকাশ অভিযানের গ্যাস স্টেশন। সেই পানিকে ভেঙে জ্বালানি বানানো হবে।

আরও পড়ুন
যেসব গ্রহাণুতে অলিভিন বা স্পিনেলের মতো খনিজ আছে, সেগুলো অনেক বেশি লাভজনক টার্গেট হতে পারে। এই দুটি উপাদান পৃথিবীর ম্যান্টলে পাওয়া যায়।

তবে লো-গ্র্যাভিটি পরিবেশে খনি খোঁড়ার প্রযুক্তি আমাদের এখনো নেই। এটা তৈরি করতে হবে। এখন হয়তো এটা সায়েন্স ফিকশন মনে হচ্ছে, কিন্তু ত্রিশ বছর আগের কথা ভাবুন। তখন স্যাম্পল রিটার্ন মিশন বা চাঁদ থেকে পাথর আনাকেও সায়েন্স ফিকশন মনে হতো।

শিল্পীর কল্পনায় স্পেস মাইনিং শুধু আমাদের ধনীই করবে না, পৃথিবীকে বাঁচাবেও
ছবি: স্টকট্রেক ইমেজ / গেটি ইমেজ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই স্পেস মাইনিং শুধু আমাদের ধনীই করবে না, বাঁচাবেও। গবেষক ট্রিগো-রদ্রিগেজের মতে, যেসব গ্রহাণু পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, আমরা সেগুলোতে গিয়ে মাইনিং করতে পারি। খনি খুঁড়ে খুঁড়ে সেগুলোকে ছোট করে ফেলতে পারি। তখন সেগুলো আর পৃথিবীর জন্য হুমকি হবে না। এক ঢিলে দুই পাখি পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, সম্পদও হলো আবার পৃথিবীও বাঁচল!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সাইটেক ডেইলি ডটকম

আরও পড়ুন