ধারাবাহিক
মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ৩
প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল অতিকায় ডাইনোসরদের রাজত্ব। সৌরজগতে এখনো ওঁত পেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন হাজারো প্রাণঘাতী গ্রহাণু। যেকোনো মুহূর্তে সামান্য কক্ষচ্যুত হয়ে এর কোনোটি যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তবে আবারও নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী! কিন্তু এদের আঘাতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা কতটা? শুধুই কি গ্রহাণু, নাকি মহাকাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর আরও কোনো গুপ্তঘাতক?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ‘ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কিছু অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞানচিন্তায়। প্রথম অধ্যায় অনুবাদ করছেন ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী। আজ পড়ুন প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয় পর্ব।
৬৫ মিলিয়ন বছর আগে অতিকায় ডাইনোসরদের জীবনে আচমকা নেমে এসেছিল দুঃস্বপ্নের মতো এক দিন১। শুধু ডাইনোসর বললে ভুল হবে, আদিম পৃথিবীর পথপ্রান্তর দাপিয়ে বেড়ানো বা আনাচকানাচে লুকিয়ে থাকা প্রতিটি প্রাণীই সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল অকল্পনীয় এক মহাজাগতিক বিপর্যয়ের। এর আঘাতে রাতারাতি ধরিত্রীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বহু প্রজাতির সবশেষ সদস্যটিও। বিজ্ঞানীরা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছেন, এমন প্রলয়ংকরী ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল এক অনাহূত গ্রহাণুর আগমনে। প্রতিনিয়ত যেসব মিটিওরয়েড আমাদের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, সেগুলোর সঙ্গে একে একই কাতারে রাখলে বড্ড ভুল হবে। কারণ সেই গ্রহাণুটির ব্যাস ছিল প্রায় ৬ মাইল। অর্থাৎ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চেয়েও বেশি!
কার্বোনেসিয়াস কনড্রাইট শ্রেণির বা কার্বনসমৃদ্ধ এই গ্রহাণুটির নামকরণ করা হয়েছে চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টর। প্রচণ্ড বেগে (সেকেন্ডে ১০ মাইল) এটি আছড়ে পড়েছিল ভূপৃষ্ঠে। যখন এর অগ্রভাগ মাটি স্পর্শ করে, তখনো এর শেষ প্রান্তের অবস্থান ছিল বায়ুমণ্ডলের অনেকটা গভীরে। এর আঘাতে ঠিক কতটুকু শক্তি বেরিয়ে এসেছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে জোরালো অনুমান, সংখ্যাটা শত মিলিয়ন মেগাটনের কম নয়। বর্তমান পৃথিবীতে মজুত থাকা সব পারমাণবিক বোমা যদি একযোগে বিস্ফোরিত হয়, তাহলেও এর ধারেকাছের শক্তি উৎপন্ন হবে না। বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, ডাইনোসরদের যমদূত এই গ্রহাণু এগিয়ে থাকবে মিলিয়ন গুণ ব্যবধানে২! বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময়েই এটি সম্ভবত পরিবেশকে ভয়ংকর উত্তপ্ত করে তুলেছিল। ফলে সংঘর্ষের অনেক আগেই এর গতিপথের নিচের এলাকাগুলোতে আগুন ধরে যায়। সেখানে অবস্থান করা কোনো প্রাণী ভাগ্যগুণে যদি নিজেকে সেই অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা করতেও পারে, তাহলেও সম্ভবত শেষ রক্ষা হয়নি। কারণ, খানিক বাদেই তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল সুপারসনিক গতিতে ছুটে চলা গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী শকওয়েভের ধাক্কা। সেটি যে তাকে নিমিষেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না…
কার্বোনেসিয়াস কনড্রাইট শ্রেণির বা কার্বনসমৃদ্ধ এই গ্রহাণুটির নামকরণ করা হয়েছে চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টর। প্রচণ্ড বেগে এটি আছড়ে পড়েছিল ভূপৃষ্ঠে।
আকারে যথেষ্ট বড় ছিল বলে বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণে অতিকায় চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের প্রারম্ভিক গতিবেগের খুব সামান্যই হ্রাস পেয়েছিল। ফলে মোটামুটি পূর্ণ শক্তিতেই আমাদের দোরগোড়ায় হাজির হয় সেটি। নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, এর ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার স্থান বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী জলভাগ। এতে অবশ্য খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পানিতে ঢাকা। তাই জলভাগেই মহাজাগতিক বস্তুদের অবতরণ বা আঘাত হানার সম্ভাবনা বেশি। মেক্সিকো উপসাগরের সেই অংশটিতে তুলনামূলক অগভীর জলরাশি থাকায় এবারেও তেমন একটা বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি গ্রহাণুটিকে। পর্যাপ্ত শক্তি সঙ্গী করেই সেটি পৌঁছে যায় তলদেশের মহীসোপানে৩। সেখানকার পাথুরে পৃষ্ঠের সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে অবশেষে পরিসমাপ্তি ঘটে এর অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার। গতিশক্তির পুরোটাই রূপান্তরিত হয়ে উৎপন্ন তাপের প্রভাবে তখন মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল উপসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার পানি।
যা-ই হোক, সংঘর্ষের ঠিক পরে যুগপৎ ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পুরো বিষয়টিকে রূপ দেয় ভয়াবহ অ্যাপোক্যালিপটিক ইভেন্টে। বাংলায় একে বলে মহাপ্রলয়। প্রথম ধাক্কা আসে ভূমিকম্প থেকে। গ্রাউন্ড জিরো থেকে শত শত মাইল দূরের প্রাণীও মারা যায় এর আঘাতে। ভূমিকম্পের দেখানো পথ ধরে আগমন ঘটে শকওয়েভের। যেসব প্রাণী কপালজোরে এর আঘাতে মারা যায়নি, তারা প্রত্যেকে চিরতরে হারিয়েছিল শ্রবণশক্তি। অবশ্য খুব বেশি সময় তাদের শব্দহীন পৃথিবীর যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি। কারণ, গ্রহাণুর ধাক্কায় সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকার জলরাশি স্থানচ্যুত হয়ে অনেকটা নিভৃতে সৃষ্টি হয়েছিল এক অকল্পনীয় শক্তিশালী সুনামি।
নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার স্থান বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী জলভাগ।
২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল এখন পর্যন্ত মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক সুনামি। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের পশ্চিম উপকূল থেকে দেড় শ মাইল দূরে, ভারত মহাসাগরে সংঘটিত ৯ মাত্রার এক ভূমিকম্পে উৎপত্তি হয় সেটির। প্রায় ১৬৭ ফুট সর্বোচ্চ উচ্চতার সুনামিটি নিকটবর্তী উপকূল এলাকায় আঘাত হানার সময়কার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় মাত্র ২০ থেকে ৩০ মাইল। অথচ এর ধাক্কাতেই সেদিন প্রাণ হারায় এক ডজনেরও বেশি দেশের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ! মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের প্রভাবে যে সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল, খুব সম্ভবত সেটির সর্বোচ্চ উচ্চতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল কমপক্ষে বেশ কয়েক হাজার ফুট। সেটির সামনে অগ্রসর হওয়ার গতিবেগও ছিল অবিশ্বাস্য, ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ মাইল!
এর বিলিয়ন টন লোনা পানির পাহাড়ে চাপা পড়ে মিনিটের ব্যবধানে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সাজানো-গোছানো মেক্সিকো উপকূলের প্রতিটি প্রান্ত। মাইলের পর মাইল এলাকায় সব প্রাণের স্পন্দন মুছে দিয়ে সুনামিটি তড়িৎগতিতে হাজির হয় মূল ভূখণ্ডে। অতঃপর সূচিত হয় এমন এক ধ্বংসযজ্ঞের, যার সিকিভাগও পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড় করতে পারে না।
অদ্ভুত মনে হলেও সত্য, গ্রহাণুর আঘাতকে বৈশ্বিক মহাপ্রলয়ে রূপ দেওয়ার পেছনে ভূমিকম্প, শকওয়েভ বা সুনামি নয়, মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল সম্পূর্ণ অভাবনীয় এক ঘটনা। সেটি হলো আকাশ থেকে নেমে আসা উত্তপ্ত গলিত পাথরের তাণ্ডবলীলা। এগুলো কিন্তু মূল গ্রহাণুর ভাঙা অংশবিশেষ নয়। বরং এদের আদি নিবাস আমাদের পৃথিবী, সুনির্দিষ্ট করে বললে ভূত্বক।
অদ্ভুত মনে হলেও সত্য, গ্রহাণুর আঘাতকে বৈশ্বিক মহাপ্রলয়ে রূপ দেওয়ার পেছনে ভূমিকম্প, শকওয়েভ বা সুনামি নয়, মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল সম্পূর্ণ অভাবনীয় এক ঘটনা।
গ্রহাণুটি যখন সাগরের তলদেশের পাথুরে পৃষ্ঠ অর্থাৎ ভূত্বকে সজোরে আঘাত করে, তখন যেন আক্ষরিক অর্থেই ফুটো হয়ে গিয়েছিল গ্রহটি। এর আঘাতস্থলে সৃষ্টি হয়েছিল এক অতিকায় গর্ত—চিক্সুলুব ক্রেটার। এর আনুমানিক ব্যাস ও গভীরতা যথাক্রমে ১২৫ ও ১৮ মাইল৪। এই বিশাল এলাকা জুড়ে থাকা চুনাপাথর, জিপসাম বা গ্রানাইটের মতো শিলাগুলো সংঘর্ষের দরুন তাৎক্ষণিক গলে যায় এবং বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে, প্রায় মহাকাশের কাছাকাছি প্রচণ্ড বেগে নিক্ষিপ্ত হয়। এগুলোর গতিবেগ ছিল সেকেন্ডে কয়েক মাইল। বিজ্ঞানীরা এই নিক্ষিপ্ত বস্তুগুলোর নাম দিয়েছেন টেকটাইটস৫।
প্রাথমিক গতিবেগ মুক্তিবেগের চেয়ে কম হওয়ায় এই গলিত পাথরগুলো খানিক বাদেই পুনরায় মাটিতে ফিরে আসতে শুরু করে। আর তাতেই বাধে বিপত্তি। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে সৃষ্ট উত্তাপে এরা দপ করে জ্বলে উঠে পরিণত হয় একেকটি অগ্নিগোলকে। গ্রাউন্ড জিরোর চারপাশে হাজার হাজার মাইল এলাকা জুড়ে বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে এগুলো। ঘটনাটিকে তুলনা করা যেতে পারে অগণিত আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের মুহুর্মুহু আঘাত বা মূল গ্রহাণুর সংঘর্ষের ক্ষুদ্রতর সংস্করণের বিলিয়ন বিলিয়ন পুনরাবৃত্তির সঙ্গে। ঠিক এভাবেই মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে পুরো পৃথিবীতে একযোগে শুরু হয়েছিল দাবানল। বায়ুমণ্ডল ঢেকে গিয়েছিল ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে!
চিক্সুলুব ক্রেটার এলাকা জুড়ে থাকা চুনাপাথর, জিপসাম বা গ্রানাইটের মতো শিলাগুলো সংঘর্ষের দরুন তাৎক্ষণিক গলে যায় এবং বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে, প্রায় মহাকাশের কাছাকাছি প্রচণ্ড বেগে নিক্ষিপ্ত হয়।
চিক্সুলুব ক্রেটার থেকে সৃষ্ট দাবানলের লেলিহান শিখা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্পর্শ করেছিল আদিম পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্ত। কালো ধোঁয়ার বাধার দেয়াল ডিঙিয়ে তখন খুব সামান্য সূর্যালোকই ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। ফলাফলস্বরূপ, কালের পরিক্রমায় আগুনের ধ্বংসযজ্ঞ থামলেও নাটকীয়ভাবে স্বল্প সময়ের জন্য (৩ থেকে ১০ বছর) পৃথিবীর বুকে নেমে আসে এক তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। একে সীমিত পরিসরের বরফযুগ বললেও ভুল হবে না। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই সময়ে স্থলভাগের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৫ ডিগ্রি থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছিল। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা পৌঁছায় প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এই ঘটনায় ভালোর চেয়ে খারাপটাই হয়েছিল বেশি। মহাপ্রলয়ের তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলে যেসব অতিমাত্রায় সহনশীল প্রাণী ও উদ্ভিদ টিকে যায়, তাদের একটা বড় অংশ দিনের পর দিন এহেন প্রতিকূল পরিবেশ সইতে না পেরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। অবশ্য ক্রমাগত অ্যাসিড বৃষ্টি ও ওজোন স্তর ধ্বংসের মতো ঘটনাগুলোও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে যথেষ্ট রসদ জুগিয়েছিল।
একটু আগেই বলেছিলাম, গ্রহাণু আছড়ে পড়ার জায়গাটি নানা খনিজ পদার্থ, বিশেষ করে চুনাপাথরে ভরপুর। সংঘর্ষের পর সৃষ্ট শকওয়েভ এবং ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ গলিত পাথরগুলোর পুনরায় নিচে নেমে আসার মাধ্যমে এগুলো থেকেই বায়ুমণ্ডলে তৈরি হয় নাইট্রেট। পরে এরা রূপ নেয় শক্তিশালী নাইট্রিক অ্যাসিডে, আর সূচনা করে অ্যাসিড বৃষ্টির। অন্যদিকে ওজোন স্তর ধ্বংসের পেছনে মূল কলকাঠি নাড়ে স্বয়ং গ্রহাণু থেকে আসা হরেকরকম রাসায়নিক উপাদান। যেমন ক্লোরিন। এর প্রভাবে শুধু স্থলভাগের উদ্ভিদেরই নয়, বরং মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায় জলজ প্রাণিবৈচিত্র্যেরও। ফলে একদম গোড়া থেকে ভেঙে পড়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক মৌলিক খাদ্যশৃঙ্খল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, চূড়ান্তভাবে চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টরের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধ্বংসযজ্ঞ থামার আগে তৎকালীন পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছিল!
কালের পরিক্রমায় আগুনের ধ্বংসযজ্ঞ থামলেও নাটকীয়ভাবে স্বল্প সময়ের জন্য পৃথিবীর বুকে নেমে আসে এক তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। একে সীমিত পরিসরের বরফযুগ বললেও ভুল হবে না।
১. চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টররের ব্যাস ছিল প্রায় ৬ মাইল (প্রায় ৯.৭ কিলোমিটার) এবং এর উৎপত্তিস্থল বৃহস্পতি ও মঙ্গলের মধ্যবর্তী অ্যাস্টেরয়েড বেল্টে। ২ হাজার ১০০ কোটিরও বেশি পারমাণবিক বোমার সমান শক্তি নিয়ে সেটি আছড়ে পড়েছিল পৃথিবীর বুকে। ২. গ্রহাণুটির সঙ্গে এই সংঘর্ষে পৃথিবীর ভূত্বক থেকে ২৫ ট্রিলিয়ন টনেরও বেশি গলিত পাথর এবং গ্যাস বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল। এই উপাদানগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং বছরের পর বছর জলবায়ুকে প্রভাবিত করতে থাকে। ৩. চিক্সুলুব ক্রেটার থেকে পাওয়া নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই আঘাতের ফলে প্রথমে প্রায় ১৮ মাইল গভীর একটি গর্ত তৈরি হয়। পরবর্তী কয়েক মিনিটের জন্য ভূগর্ভস্থ অংশের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয় প্রায় ১০ মাইল উঁচু একটি গলিত পাথরের পাহাড়। ৪. গ্রহাণুটি মেক্সিকো উপসাগরে আছড়ে পড়ার ফলে প্রায় ৫ হাজার ফুট উঁচু একটি সুনামির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে সেই ঢেউ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিটি মহাদেশের উপকূল প্লাবিত করে।
