মৃত্যুদূতের নাম গ্রহাণু – ২

প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গিয়েছিল অতিকায় ডাইনোসরদের রাজত্ব। সৌরজগতে এখনো ওঁত পেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন হাজারো প্রাণঘাতী গ্রহাণু। যেকোনো মুহূর্তে সামান্য কক্ষচ্যুত হয়ে এর কোনোটি যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তবে আবারও নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবী! কিন্তু এদের আঘাতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা কতটা? শুধুই কি গ্রহাণু, নাকি মহাকাশে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর আরও কোনো গুপ্তঘাতক?

এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কিছু অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞানচিন্তায়। প্রথম অধ্যায় অনুবাদ করছেন ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী। আজ পড়ুন প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় পর্ব

বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, মহাজাগতিক শুটিং গ্যালারিতে আমাদের পৃথিবী এক লোভনীয় লক্ষ্যবস্তু। গ্রহটিতে প্রতিদিন চল্লিশ টন পর্যন্ত উল্কা আঘাত হানার ঘটনা এর সপক্ষে জোরালো প্রমাণ। এই পরিমাণ বস্তু দিয়ে বছরান্তে খুব সহজেই একটি ছয়তলা বিশালাকার ভবন কানায় কানায় ভরিয়ে ফেলা সম্ভব। এসবের প্রায় শতভাগই ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেকটা দূরে থাকতেই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়। কেউ যদি রাতের পরিষ্কার অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাহলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে খালি চোখেই কদাচিৎ সাক্ষী হতে পারেন এমন বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনার। এই সময়ে বস্তুগুলোকে উজ্জ্বল আলোকরেখারূপে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুতগতিতে ছুটে যেতে দেখা যায়।

একনজরে মিটিওরয়েড, মিটিওর এবং মিটিওরাইট

সম্পূর্ণ ঘটনার স্থায়িত্ব মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এদের রাসায়নিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় নির্গত আলোর রং। যেমন, সোডিয়াম বা আয়রনের উপস্থিতিতে বর্ণ হয় কমলা-হলুদ বা হলুদ। আবার ম্যাগনেসিয়াম থাকলে হয় নীলচে সবুজ। সাধারণভাবে এই বস্তুগুলো মানুষের কাছে শুটিং স্টার নামেই বেশি পরিচিত। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এদের ভিন্ন নামে ডাকেন। পৃথিবীতে প্রবেশের আগে, অর্থাৎ মহাকাশে ভেসে বেড়ানোর সময়ে বলা হয় মিটিওরয়েড বা উল্কা। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর ঘর্ষণের কারণে আলোর রেখা হিসেবে জ্বলে উঠলে বলা হয় মিটিওর বা উজ্জ্বল উল্কা। এগুলোর কোনো সদস্য যদি কোনোভাবে সব বাধা পেরিয়ে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তাহলে নতুন নামকরণ হয় মিটিওরাইট বা উল্কাপিণ্ড।

আরও পড়ুন
পৃথিবীতে প্রবেশের আগে, অর্থাৎ মহাকাশে ভেসে বেড়ানোর সময়ে বলা হয় মিটিওরয়েড বা উল্কা। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর ঘর্ষণের কারণে আলোর রেখা হিসেবে জ্বলে উঠলে বলা হয় মিটিওর।

উল্কার উজ্জ্বলতা দেখে ভাবতেই পারেন, এগুলোর আকার-আকৃতি বোধ হয় বেশ বড়। আসলে তা নয়। পৃথিবীতে অনাহূত অতিথি হয়ে আসা বেশিরভাগ উল্কাই খুব ছোট, মটরশুঁটির দানা, আঙুর বা বড়জোর তরমুজের সমান। এত ক্ষুদ্রাকার হওয়া সত্ত্বেও অতি উজ্জ্বল আলোকরেখা সৃষ্টির পেছনে কলকাঠি নাড়ে মূলত দুটি বিষয়। প্রথমটি ঘর্ষণ বল, দ্বিতীয়টি উচ্চ গতিবেগ। বায়ুমণ্ডলের ভেতরে প্রবেশের সময় উল্কাগুলোর গতিবেগ সাধারণত ৫ থেকে ৫৫ মাখ সীমার মধ্যে থাকে। এহেন উচ্চ গতিশক্তি গতিপথের সম্মুখে থাকা বাতাসের মাঝে সঞ্চারিত হয়। ফলে সামান্য সময়ের ব্যবধানে এর অণুগুলো প্রবল মাত্রায় সংকুচিত হয় এবং ঘর্ষণ বলের কারণে এদের তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

খুব দ্রুত এটি ছুঁয়ে ফেলে কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘর। তখন গরম বাতাসের অংশটুকু অনেকটা উত্তপ্ত চুলার মতো কাজ করতে শুরু করে। সেখান থেকে আসা তাপের আঘাতে জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হতে থাকে কয়েক ইঞ্চি ব্যবধান রেখে পেছন পেছন ছুটতে থাকা স্বয়ং উল্কা। আকারে যদি তেমন বড় না হয়, তাহলে প্রতিকূল পরিবেশে এগুলোর পক্ষে বেশি সময় টিকে থাকা সম্ভব হয় না।

অতি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা সৃষ্টি করে অচিরেই সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়, মিশে যায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে। ভূপৃষ্ঠ থেকে কেউ যখন রাতের আঁধারে উল্কাবৃষ্টি প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁর মনে হতে পারে, এগুলো জ্বলে উঠছে খুব কাছেই, সম্ভবত মাথার সামান্য ওপরে। প্রকৃতপক্ষে এমন ঘটনাগুলো ঘটার স্থান আমাদের থেকে বহু দূরে, মাটি থেকে ৫০ মাইলেরও বেশি উচ্চতায়। বায়ুমণ্ডলের এই অংশে বাতাসের ঘনত্ব অনেক কম থাকে। তবে ছোটখাটো আকারের উল্কাদের শতভাগ পোড়াতে সেটুকুই যথেষ্ট।

আরও পড়ুন
বায়ুমণ্ডলের ভেতরে প্রবেশের সময় উল্কাগুলোর গতিবেগ সাধারণত ৫ থেকে ৫৫ মাখ সীমার মধ্যে থাকে। এহেন উচ্চ গতিশক্তি গতিপথের সম্মুখে থাকা বাতাসের মাঝে সঞ্চারিত হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, উল্কা যদি মাঝারি আকারের অর্থাৎ গাড়ি বা বাসের সমান হয়, তাহলে কী ঘটবে? বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে এদের দ্বৈরথের গল্প অনেকটাই আলাদা। লম্বায় কয়েক মিটার ছাড়িয়ে গেলেই সরাসরি সম্পূর্ণ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, শুরুতে এরা মুখোমুখি হয় প্রবল বাতাসের চাপের। শব্দের চেয়েও অনেক দ্রুতবেগে গতিশীল থাকায় এগুলোর পৃষ্ঠের প্রতি ইঞ্চি এলাকায় চাপের মান ছাড়িয়ে যেতে পারে হাজার পাউন্ড! তখন এদের পৃষ্ঠ আক্ষরিক অর্থেই চ্যাপ্টা হয়ে সমতল পিঠার মতো আকৃতি ধারণ করে। সংগত কারণে বিজ্ঞানীরা প্রক্রিয়াটির নামকরণ করেছেন প্যানকেকিং।

এরকম উচ্চ চাপ বেশিক্ষণ সহ্য করা অসম্ভব বিধায় অচিরেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এরা। অর্থাৎ একক মাঝারি আকারের পাথরখণ্ডের পরিবর্তে আত্মপ্রকাশ ঘটে শত শত বা হাজারো ছোট উল্কার, যাদের প্রতিটিই সেকেন্ডে কয়েক মাইল গতিবেগে চলে। এতসবের মাঝেও ক্রমাগত শক্তি বিকিরণের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী বাতাসকে উত্তপ্ত করার প্রক্রিয়া থেমে থাকে না। ফলে ক্রমশ আরও বাড়তে থাকে চাপের পরিমাণ। অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছালে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে ক্ষুদ্র পাথরের খণ্ডগুলো একযোগে বিপুল পরিমাণ শক্তি ছেড়ে দেয়। আর তখনই ঘটে… বিস্ফোরণ!

এককথায় মাঝারি উল্কাগুলোর শেষ পরিণতি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বিস্ফোরিত হওয়া। ১ মিটার ব্যাসের এমন কোনো পাথরখণ্ডের বিস্ফোরণে যে পরিমাণ শক্তি অবমুক্ত হয়, তা প্রায় কয়েক শ টন টিএনটি যুগপৎ বিস্ফোরণের সমান। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পুরো ব্যাপারটাই সাধারণত ঘটে ভূপৃষ্ঠ থেকে বেশ ওপরে। এগুলো মাটির কতটা নিকটবর্তী হতে পারবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে এদের রাসায়নিক গড়নের ওপর। যদি ধাতব মৌল দিয়ে গঠিত হয়, তাহলে চাপ ও তাপ সহ্যক্ষমতা তুলনামূলক বেশি হয়। এরা পৌঁছে যেতে পারে ভূপৃষ্ঠের ৩ থেকে ২৫ মাইলের মধ্যে।

আরও পড়ুন
১ মিটার ব্যাসের এমন কোনো পাথরখণ্ডের বিস্ফোরণে যে পরিমাণ শক্তি অবমুক্ত হয়, তা প্রায় কয়েক শ টন টিএনটি যুগপৎ বিস্ফোরণের সমান।

অন্যদিকে অধাতব মৌলে গড়া উল্কাগুলোর দৌড় সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকে ৩১ থেকে ৫৯ মাইলের মাঝে। বিস্ফোরণস্থল থেকে অনেকখানি দূরত্ব বজায় থাকলেও আমরা যে সব সময় উল্কার আঘাত থেকে নিরাপদে থাকব, তা শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায় না। বিস্ফোরিত হওয়ার আগে গতিবেগ যথেষ্ট কমে গেলে প্যানকেকিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত ছোট ছোট টুকরোগুলোর কয়েকটি সব বাধা ডিঙিয়ে ঠিকই পৌঁছে যাবে ভূপৃষ্ঠে। আছড়ে পড়ার সময়ে এগুলো বেশ ধীরে গতিশীল থাকে, গতিবেগ হয় প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ কয়েক শ মাইল। একে তুলনা করা চলে উঁচু দালানের চূড়া থেকে ছোট আকারের সাধারণ পাথরখণ্ড মাটিতে ফেলে দেওয়ার সঙ্গে। যাত্রাপথে বাতাসের অণুর সঙ্গে ক্রমাগত ঘর্ষণের দরুন উল্কাপিণ্ডের প্রারম্ভিক তীব্র বেগের প্রায় পুরোটাই নাকচ হয়ে যায়। মাঝারি উল্কাপিণ্ডরা কীভাবে খণ্ড খণ্ড হয়ে মাটিতে আঘাত হানতে পারে, তার সত্যিকারের স্থিরচিত্র নিচে দেখানো হয়েছে।

যেভাবে বড় উল্কা ভেঙে বহুসংখ্যক ছোট উল্কার আত্মপ্রকাশ ঘটে

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ১৯৫৪ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামায় বসবাসকারী অ্যান হজেস নামে এক মধ্যবয়স্ক নারীকে সরাসরি একটি উল্কাপিণ্ড আঘাত করেছিল। সেটি অবশ্য খুব বেশি বড় ছিল না, একটি গতানুগতিক ইটের সমান। প্রায় ৪ কেজি ওজনের পাথরখণ্ডটি ঘরের ছাদ ফুটো করে কাঠের রেডিও ক্যাবিনেটে ধাক্কা খেয়ে সজোরে আঘাত করেছিল সোফায় ঘুমিয়ে থাকা অ্যানকে। হাতে ও শরীরের এক পাশে ভালো রকম ব্যথা পেলেও সে যাত্রায় ভাগ্যগুণে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন ঘটনার শতভাগ নিশ্চিত পুনরাবৃত্তির রেকর্ড না থাকলেও উল্কাপিণ্ডের আঘাতে বাড়ি-গাড়ির মতো স্থাবর সম্পত্তিতে ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার বহু নজির রয়েছে। এগুলোর কয়েকটিকে সরাসরি ক্যামেরার লেন্সে ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে পিকস্কিল মিটিওরাইটের কথা।

আরও পড়ুন
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ১৯৫৪ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামায় বসবাসকারী অ্যান হজেস নামে এক মধ্যবয়স্ক নারীকে সরাসরি একটি উল্কাপিণ্ড আঘাত করেছিল।

১৯৯২ সালের ৯ অক্টোবর মাঝারি আকারের পাথরখণ্ডটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল। অতঃপর অতিকায় এক অগ্নিগোলকরূপে উড়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব দিকে। কাকতালীয়ভাবে সেই দিনটি ছিল শুক্রবার। নিউইয়র্কের পিকস্কিলে এক স্থানীয় স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখার জন্য জড়ো হয়েছিলেন হাজারো দর্শক। তাঁদের অনেকের হাতে শোভা পাচ্ছিল অত্যাধুনিক ভিডিও ক্যামেরা। ফলে বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনাটির চাক্ষুষ সাক্ষী হওয়ার পাশাপাশি নানা কোণ থেকে একে ক্যামেরাবন্দী করতে মোটেই বেগ পেতে হয়নি তাঁদের।

মোট ১৬টি আলাদা ভিডিও ক্লিপে উল্কাপিণ্ডটির মাঝ আকাশে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়াসহ মাটিতে আছড়ে পড়ার দৃশ্য পরিষ্কার ফুটে উঠেছিল। প্রায় ফুটবলের সমান আকারের বস্তুটির মূল অংশ ঘণ্টায় ১৬৪ মাইল বেগে সেদিন সজোরে আঘাত হেনেছিল মিশেল ন্যাপ নামে এক তরুণীর সদ্য কেনা গাড়ির পেছনের দিকে। পাথরখণ্ডটির ভর ছিল প্রায় ১২.৫ কেজি। পরে ন্যাপ একে ৫০ হাজার ডলারে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া গাড়িটিকে সুপরিচিত এক সংগ্রাহক ২৫ হাজার ডলারে কিনে নেন। অর্থাৎ মাত্র ৩০০ ডলারের গাড়ির বিপরীতে নগদ প্রাপ্তি ৭৫ হাজার ডলার। একেই বুঝি বলে রাজকপাল!পিকস্কিল মিটিওরাইটের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির সঙ্গে মিশেল ন্যাপ (বাঁয়ে

মধ্য আকাশে পাথরখণ্ড বিস্ফোরণের এখন পর্যন্ত জানাশোনা সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনার নাম তুঙ্গুস্কা ইভেন্ট। এটি ঘটেছিল শতবর্ষেরও বেশি সময় আগে। আনুমানিক ৭০ মিটার লম্বা সেই মহাজাগতিক বস্তুটিকে গতানুগতিক উল্কার পরিবর্তে ছোট গ্রহাণু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেই বিজ্ঞানীরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অবশ্য কারও কারও মতে, সেটি ছিল একটি ধূমকেতু। বস্তুটির গতিপথ পৃথিবীর কক্ষপথের বুক চিরে হওয়ায় মোটামুটি অনুমিত ছিল এর আগমন। অপেক্ষা কেবল সময়ের পরিক্রমায় বস্তু দুটির এক বিন্দুতে মিলে যাওয়ার। সেই ক্ষণটি এসেছিল ১৯০৮ সালের ৩০ জুন। পাথরখণ্ডটি পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল সাইবেরিয়ার আকাশে, পডকামেন্নায়া তুঙ্গুস্কা নদীর নিকটবর্তী এলাকায়। বায়ুমণ্ডলের প্রবল চাপ ও ঘর্ষণে অচিরেই সেটি টুকরো টুকরো হয়ে ভূপৃষ্ঠের ৩ থেকে ৬ মাইল ওপরে বিস্ফোরিত হয়। এই সময়ে অবমুক্ত শক্তির পরিমাণ প্রায় ৩ থেকে ২০ মেগাটন।

আরও পড়ুন
প্রায় ফুটবলের সমান আকারের বস্তুটির মূল অংশ ঘণ্টায় ১৬৪ মাইল বেগে সেদিন সজোরে আঘাত হেনেছিল মিশেল ন্যাপ নামে এক তরুণীর সদ্য কেনা গাড়ির পেছনের দিকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানের হিরোশিমাতে যে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল, সেটির চেয়েও হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী এই বিস্ফোরণ! হাজার হাজার মানুষ সাক্ষী হয়েছিলেন এই ঘটনার। সিসমোগ্রাফ যন্ত্রগুলো একে শনাক্ত করেছিল রিখটার স্কেলের ৫ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে। ঘটনাস্থল থকে শত মাইল দূরে থাকা মানুষও সেদিন এর প্রবল ধাক্কায় মাটিতে ছিটকে পড়েছিল।

তুঙ্গুস্কা ইভেন্ট বিশ্বব্যাপী প্রবল আলোড়ন তুললেও ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শনের জোগাড়যন্ত্র করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল বিজ্ঞানীদের। কারণ, প্রচণ্ড দুর্গম এক এলাকায় বিস্ফোরিত হয়েছিল পাথরখণ্ডটি। শীতকালে হিমশীতল ঠান্ডা, গ্রীষ্মে জলাভূমিতে মশার চোখরাঙানিসহ শ্বাপদসংকুল পরিবেশ। এমন জায়গায় যাওয়ার আগে যেকোনো দুঃসাহসিক অভিযাত্রীও অন্তত দুবার ভাববেন। তা ছাড়া সে সময়ে যোগাযোগব্যবস্থাও ছিল অনুন্নত। সব দিক সামলে প্রথম বৈজ্ঞানিক অভিযান পরিচালনা করতে সময় লেগে যায় প্রায় দুই দশক!

১৯২৭ সালে রাশিয়ান খনিজবিদ লিওনিড কুলিকের নেতৃত্বে একদল চৌকস বিজ্ঞানী ঘটনাস্থলে প্রথম পা রাখেন। তাঁরা সাক্ষী হন এমন এক দৃশ্যের, যা আগে কখনোই দেখা যায়নি। প্রায় ৮৩০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ৮০ মিলিয়নেরও বেশি গাছপালা শকওয়েভের ধাক্কায় এক পাশে, মাটির প্রায় সমান্তরালে হেলে পড়েছিল। এদের অধিকাংশ দগ্ধ হলেও সম্পূর্ণ পুড়ে যায়নি। সেখানকার প্রাণিকুলের ভাগ্য অবশ্য এতটা সুপ্রসন্ন হয়নি। হাজার হাজার বল্গা হরিণ সেদিন জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। এগুলোই ছিল সেই দুর্গম অঞ্চলের বাসিন্দাদের খাবারের অন্যতম প্রধান উৎস।

আরও পড়ুন
১৯২৭ সালে রাশিয়ান খনিজবিদ লিওনিড কুলিকের নেতৃত্বে একদল চৌকস বিজ্ঞানী ঘটনাস্থলে প্রথম পা রাখেন। তাঁরা সাক্ষী হন এমন এক দৃশ্যের, যা আগে কখনোই দেখা যায়নি।

অভিযাত্রী দল যতই গ্রাউন্ড জিরো’র দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, ততই স্পষ্ট হচ্ছিল ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতা। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁরা কোনো গভীর গর্তের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। চোখে পড়েনি উল্কাপিণ্ডের ধ্বংসাবশেষও। আসলে ভূপৃষ্ঠ থেকে কয়েক মাইল ওপরে বিস্ফোরিত হওয়ায় সবই বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল। গ্রাউন্ড জিরোতে সবচেয়ে অবাক করা দৃশ্য ছিল, গাছগুলোর একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। এদের কোনোটায় অবশ্য পাতা বা ডালের চিহ্নমাত্র ছিল না। শকওয়েভ সেখানে ওপর থেকে খাড়াভাবে নেমে এসেছিল বলেই এগুলো এক পাশে হেলে যেতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘটানো নানা পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের সময়ও ঠিক এমন সজ্জা খেয়াল করা গেছে।

শকওয়েভের ধাক্কায় এক পাশে হেলে পড়া বনভূমির একাংশ

বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রায় দারুণ ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হলেও দুর্গম এলাকায় উল্কাপিণ্ডের বিস্ফোরণ নিঃসন্দেহে আশীর্বাদস্বরূপ। তুঙ্গুস্কা ইভেন্টে মনুষ্য প্রাণহানির সংখ্যা ছিল খুব কম। নিশ্চিত হতাহত মাত্র দুজন। যদি অনুরূপ ঘটনা লন্ডন, টোকিও বা ঢাকার মতো জনবহুল শহরে ঘটে, তাহলে সেকেন্ডের ব্যবধানে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটবে। অবশ্য তখনো ধ্বংসযজ্ঞ সীমাবদ্ধ থাকবে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মাঝে, ছড়াবে না বিশ্বব্যাপী। কিন্তু কেমন হবে যদি কয়েক মাইল ব্যাসের কোনো গ্রহাণু আমাদের পৃথিবীতে সরাসরি আঘাত হানে?

চলবে…

ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে

টীকা:

১. ১ মাখ গতিতে চলার অর্থ প্রতি সেকেন্ডে ০.২১৩ মাইল পথ অতিক্রম করা। ২০১৩ সালে রাশিয়ার আকাশে ৫৫ থেকে ৬০ মাখ, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১২ মাইল গতিতে চলমান এক উল্কার দেখা মিলেছিল।

২. বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গড়ে প্রতি মাসে একবার এমন বিস্ফোরণ ঘটে।

আরও পড়ুন