ধেয়ে আসছে ভয়ংকর সৌরঝড়, আর্টেমিস ২ মিশন কি আবারও পেছাচ্ছে
১৯৭২ সালের পর থেকে চাঁদের বুকে মানুষের আর পায়ের ছাপ পড়েনি। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানবজাতি আবারও চাঁদের পানে ছুটতে প্রস্তুত। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১ এপ্রিল নাসার মেগারকেট স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (SLS) এবং ওরিয়ন স্পেসক্রাফটে চড়ে চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসার কথা চারজন নভোচারীর। কিন্তু ঠিক এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণের আগেই ঘটে গেল এক মহাজাগতিক বিপত্তি! গত ২৯ মার্চ (রোববার) গভীর রাতে সূর্য থেকে এক ভয়ংকর সৌরঝড় বিস্ফোরণ ঘটে।
মহাকাশের আবহাওয়া যখন এত চরম রূপ নিয়েছে, তখন সবার মনেই একটা প্রশ্ন জেগেছে—এই ঐতিহাসিক আর্টেমিস ২ মিশন কি তবে আবারও পেছাতে যাচ্ছে?
২৯ মার্চ রাতে সূর্যের একটি সক্রিয় সৌরকলঙ্ক থেকে যে বিস্ফোরণটি ঘটে, বিজ্ঞানীরা তাকে এক্স ১.৪-ক্লাস ফ্লেয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সৌরঝড়গুলোর মধ্যে এই এক্স-ক্লাস হলো সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ধ্বংসাত্মক। এই ভয়ংকর বিস্ফোরণের পরপরই এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে বেতার যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শুধু তা-ই নয়, এই বিস্ফোরণের ফলে সূর্যের বুক থেকে করোনাল ম্যাস ইজেকশন বা সৌর প্লাজমার এক বিশাল মেঘ ছিটকে সোজা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এবং চৌম্বকক্ষেত্র হয়তো আমাদের বাঁচিয়ে দেবে, কিন্তু পৃথিবীর সুরক্ষাবলয়ের বাইরে থাকা নভোচারী বা স্পেসক্রাফটের জন্য এই মহাজাগতিক প্লাজমা এবং রেডিয়েশন আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর কারণ হতে পারে!
২৯ মার্চ রাতে সূর্যের একটি সক্রিয় সৌরকলঙ্ক থেকে যে বিস্ফোরণটি ঘটে, বিজ্ঞানীরা তাকে এক্স ১.৪-ক্লাস ফ্লেয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তাই এই সৌরঝড়ের খবর শুনে মহাকাশপ্রেমীদের হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। কারণ এই মিশন যে আগেও পিছিয়েছে কয়েকবার। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ২০২৪ সালের শেষের দিকে এই মিশন চালু শুরু হবে। কিন্তু নভোচারীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম এবং আর্টেমিস ১ মিশনের পর ওরিয়ন ক্যাপসুলের তাপ প্রতিরোধক আবরণের কিছু ত্রুটি মেরামতের জন্য মিশনটি পিছিয়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেওয়া হয়। এরপর নানা কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চূড়ান্তভাবে ২০২৬ সালের এই এপ্রিলে এসে দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। এতবার পেছানোর পর এই সৌরঝড় যেন আক্ষরিক অর্থেই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছিল!
তবে নাসার অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অমিত ক্ষত্রিয়ের কথায় সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। কেনেডি স্পেস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা আশা করছি না যে এই সিএমই আমাদের মিশনে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। মিশন নিয়ে আমাদের এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’
নাসার ম্যানেজমেন্ট টিম ১ এপ্রিলের উৎক্ষেপণকে (বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ২ এপ্রিল ভোরে) আনুষ্ঠানিকভাবে সবুজ সংকেত দিয়ে দিয়েছে!
তবে জানিয়ে রাখি, সৌরঝড় নভোচারীদের জন্য সব সময়ই বড় ঝুঁকি। এক্স-ক্লাস ফ্লেয়ার থেকে নির্গত ভয়ংকর রেডিয়েশন নভোচারীদের ডিএনএ পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে পারে। তবে মজার ব্যাপার হলো, নাসা এই মিশনের ভেতরেই একটি বিশেষ পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করে রেখেছে।
অমিত ক্ষত্রিয় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা আশা করছি না যে এই সিএমই আমাদের মিশনে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। মিশন নিয়ে আমাদের এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’
আর্টেমিস ২-এর ফ্লাইট ডিরেক্টর এমিলি নেলসন জানান, ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের ভেতরেই একটি রেডিয়েশন শেল্টার তৈরি করার পরীক্ষা চালাবেন নভোচারীরা। যদি মহাকাশে হঠাৎ কোনো সৌরঝড় আঘাত হানে, তবে নভোচারীরা স্পেসক্রাফটের সেই নির্দিষ্ট সুরক্ষিত অংশে গিয়ে আশ্রয় নেবেন এবং বিপদ না কাটা পর্যন্ত সেখানেই থাকবেন। তাই এই সৌরঝড় নাসার জন্য ভয়ের বদলে বরং তাদের প্রস্তুতির একটা দারুণ পরীক্ষাও হয়ে যেতে পারে!
এই ঐতিহাসিক ১০ দিনের মিশনে চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন চার সাহসী নভোচারী। এই দলের কমান্ডার হিসেবে আছেন নাসার বর্ষীয়ান নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান এবং পাইলট হিসেবে আছেন ভিক্টর গ্লোভার। মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নাসার ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।
গত শুক্রবারই নভোচারীরা ফ্লোরিডার লঞ্চ সাইটে এসে পৌঁছেছেন এবং বর্তমানে তাঁরা প্রি-লঞ্চ কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তাঁরা ইতিমধ্যেই লঞ্চ প্যাড ঘুরে দেখেছেন এবং নাসার বিখ্যাত অ্যাস্ট্রোনট বিচ হাউসে পরিবারের খুব কাছের মানুষদের সঙ্গে রাতের খাবার সেরেছেন।
সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই কেনেডি স্পেস সেন্টারের আকাশে এক পশলা বৃষ্টির পর দারুণ একটি জোড়া রংধনু ভেসে ওঠে! নাসা জানিয়েছে, উৎক্ষেপণের দিন আবহাওয়া অনুকূল থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রকৃতির এই রংধনু যেন মানবজাতির নতুন করে চাঁদ জয়ের শুভ সংকেত!