ব্ল্যাকহোলের ড্যান্সিং জেট প্রথমবার পরিমাপ করা সম্ভব হলো

জানেন কি, এই ব্ল্যাকহোলগুলো থেকে মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড শক্তির আলোর ফোয়ারা বা জেট ছিটকে বের হয়?ছবি: শাটারস্টক

কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে আমাদের কৌতূহলের শেষ নেই। আমরা জানি, কৃষ্ণগহ্বরের কাছাকাছি গেলে আলো আর ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু জানেন কি, এই ভয়ংকর ব্ল্যাকহোলগুলো থেকে মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড শক্তির আলোর ফোয়ারা বা জেট ছিটকে বের হয়?

এত দিন বিজ্ঞানীরা জানতেন না, এই জেটগুলোর আসল শক্তি কতটুকু। এবার সেই অসম্ভব কাজটাই তাঁরা করে দেখিয়েছেন। তাঁরা প্রথমবারের মতো সরাসরি মেপে দেখেছেন একটি ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা জেটের শক্তি। সেই শক্তি প্রায় ১০ হাজার সূর্যের সমান!

নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই চমকপ্রদ তথ্য জানিয়েছেন। এই আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্ব এবং গ্যালাক্সিগুলোর গঠন বুঝতে আরও সাহায্য করবে।

এই গবেষণার কেন্দ্রে ছিল সিগনাস এক্স-১ নামে একটি পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডল। সিগনাস এক্স-১ মানুষের আবিষ্কৃত এবং নিশ্চিত হওয়া প্রথম ব্ল্যাকহোল। এটি একা থাকে না, এর পাশেই আছে বিশাল আকৃতির একটি সুপারজায়ান্ট নক্ষত্র। এরা একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

শিল্পীর কল্পনায় সিগনাস এক্স-১ ব্ল্যাকহোলের ছবি
ছবি: ব্রিটানিকা

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রেডিও টেলিস্কোপগুলোর একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলেছেন। তাঁরা দেখেছেন, এই কৃষ্ণগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসা জেটের শক্তি আক্ষরিক অর্থেই ১০ হাজার সূর্যের সম্মিলিত শক্তির সমান।

আরও পড়ুন
সিগনাস এক্স-১ মানুষের আবিষ্কৃত এবং নিশ্চিত হওয়া প্রথম ব্ল্যাকহোল। এটি একা থাকে না, এর পাশেই আছে বিশাল আকৃতির একটি সুপারজায়ান্ট নক্ষত্র। এরা একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

কীভাবে মাপা হলো এই শক্তি

পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা রেডিও টেলিস্কোপগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি বিশাল টেলিস্কোপের মতো ব্যবহার করেছেন। সিগনাস এক্স-১-এর ব্ল্যাকহোলটি যখন তার সঙ্গী সুপারজায়ান্ট নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করছিল, তখন বিজ্ঞানীরা অদ্ভুত একটা ব্যাপার খেয়াল করেন।

সঙ্গী নক্ষত্রটি থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী স্টেলার উইন্ড বা নাক্ষত্রিক বাতাস বইছিল। এই বাতাসের ধাক্কায় ব্ল্যাকহোল থেকে সোজা বেরিয়ে আসা জেটগুলো একটু বেঁকে যাচ্ছিল! ব্যাপারটা অনেকটা পৃথিবীতে জোরালো বাতাসে ফোয়ারার পানির ধারা বেঁকে যাওয়ার মতো।

বিজ্ঞানীরা তখন একটি দারুণ কৌশল খাটালেন। নক্ষত্রটি থেকে আসা বাতাসের জোর কতটা এবং বাতাসের ধাক্কায় জেটগুলো ঠিক কতটা বেঁকে যাচ্ছে, এই দুটির হিসাব কষে তাঁরা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে জেটের আসল শক্তি বের করে ফেললেন।

এর আগে বিজ্ঞানীরা শুধু হাজার হাজার বা লাখ লাখ বছরের গড় হিসাব ধরে জেটের শক্তি অনুমান করতেন। কিন্তু এবারই প্রথম কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে জেটের তাৎক্ষণিক শক্তি সরাসরি মাপা সম্ভব হলো!

আরও পড়ুন
সঙ্গী নক্ষত্রটি থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী স্টেলার উইন্ড বা নাক্ষত্রিক বাতাস বইছিল। এই বাতাসের ধাক্কায় ব্ল্যাকহোল থেকে সোজা বেরিয়ে আসা জেটগুলো একটু বেঁকে যাচ্ছিল!

শুধু শক্তি মেপেই বিজ্ঞানীরা থেমে থাকেননি, তাঁরা এই জেটের গতিও মেপেছেন। তাঁরা দেখেছেন, এই জেটগুলো প্রায় আলোর অর্ধেক গতিতে ছুটছে! অর্থাৎ, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার বেগে। এই গতি মাপাটা বিজ্ঞানীদের কাছে এত দিন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

গবেষক দলের প্রধান স্টিভ প্রভু এই বাঁকা হয়ে যাওয়া জেটগুলোর নাম দিয়েছেন ড্যান্সিং জেট। কারণ, কৃষ্ণগহ্বর ও নক্ষত্রটি যখন একে অপরের চারপাশে ঘুরছিল, তখন নাক্ষত্রিক বাতাসের ধাক্কায় জেটগুলো বারবার তাদের দিক পরিবর্তন করছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন তারা নাচছে!

প্রভু জানান, ব্ল্যাকহোলের দিকে যখন কোনো পদার্থ বা বস্তু ছুটে যায়, তখন সেটি গিলে নেওয়ার সময় যে পরিমাণ শক্তি তৈরি হয়, তার প্রায় ১০ শতাংশই এই জেটগুলোর মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা এত দিন তাঁদের মডেলে এ রকমটাই অনুমান করতেন, কিন্তু এবার সেটা সরাসরি প্রমাণ হলো।

আরও পড়ুন
প্রভু জানান, ব্ল্যাকহোলের দিকে যখন কোনো পদার্থ বা বস্তু ছুটে যায়, তখন সেটি গিলে নেওয়ার সময় যে পরিমাণ শক্তি তৈরি হয়, তার প্রায় ১০ শতাংশই এই জেটগুলোর মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে আসে।

পুরোনো তত্ত্ব, নতুন প্রমাণ

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সহলেখক জেমস মিলার-জোনস বলেন, ‘আমাদের তত্ত্ব বলে, সব ব্ল্যাকহোলের পেছনের পদার্থবিজ্ঞান প্রায় একই রকম। তাই এই নতুন মাপজোক ব্যবহার করে আমরা এখন যেকোনো কৃষ্ণগহ্বরের জেট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে পারি। সেটা সূর্যের চেয়ে ১০ গুণ বড় ব্ল্যাকহোলই হোক বা ১ কোটি গুণ বড় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলই হোক!’

সামনের দিনগুলোতে অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় তৈরি হতে যাওয়া ‘স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে অবজারভেটরি’র মতো শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে লাখ লাখ দূরের গ্যালাক্সির ব্ল্যাকহোলের জেট শনাক্ত করা যাবে। তখন সিগনাস এক্স-১-এর এই আবিষ্কারটি একটি চমৎকার ভিত্তি বা স্কেল হিসেবে কাজ করবে।

ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা এই জেটগুলো গ্যালাক্সির চারপাশের পরিবেশের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে। গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়, তা বুঝতে এই ব্ল্যাকহোল জেটগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সায়েন্স ডেইলি

আরও পড়ুন