রাতের আকাশ, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ—মহাবিশ্বের অপার রহস্য আমাদের সব সময়ই মুগ্ধ করে। ফটোগ্রাফার বা আলোকচিত্রীরা ক্যামেরায় সেসব রহস্যের কিছুটা ধারণ করতে পারেন। প্রতিবছর ইংল্যান্ডের রয়্যাল মিউজিয়ামস গ্রিনউইচ আয়োজন করে জেডডব্লিউও অ্যাস্ট্রোনমি ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতা। সেখানে নিজেদের অসাধারণ দক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রদর্শন করেন বিশ্বের সেরা জ্যোতির্বিদ্যাবিষয়ক ফটোগ্রাফাররা।
এ বছর ১৬তম জেডডব্লিউও অ্যাস্ট্রোনমি ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতায় ৬৬টি দেশের পেশাদার ও শৌখিন আলোকচিত্রীর কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার ছবি জমা পড়ে। ২০২৬ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর। এরপর বিজয়ী ও নির্বাচিত সেরা ছবিগুলো ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়ামে সবার দেখার জন্য প্রদর্শন করা হবে।
ইতিমধ্যে সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা চমৎকার কিছু ছবি প্রকাশ করেছে রয়্যাল মিউজিয়ামস গ্রিনউইচ। সেখান থেকে বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য ১০টি ছবি তুলে ধরা হলো।
সিয়াটলের ওপর সোনালি চন্দ্রোদয় ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের সিয়াটল শহর থেকে তোলা। গ্রীষ্মের সূর্যাস্তের সময় সিয়াটল শহরের রূপ অনেকটাই বদলে যায়। শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের পেছনে যখন কমলা রঙের চাঁদ উঠতে শুরু করে, তখন পুরো শহরজুড়ে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের তৈরি দালান ও প্রকৃতির এই মেলবন্ধনটিকেই আলোকচিত্রী এজে স্মাডি তাঁর ফ্রেমে তুলে ধরেছেন।
অ্যান্ড্রোমিডার রক্তিম ঘূর্ণির ছবিটি তুলেছেন চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের আলোকচিত্রী চুহং ইউ এবং জুওমিং ওয়াং। অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাকহোলের দিকে লাল রঙের গ্যাস ও ধূলিকণা যেভাবে ঘুরে ঘুরে ছুটে যাচ্ছে, তা এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ছায়াপথটির বাইরের অংশে নতুন জন্ম নেওয়া উজ্জ্বল নীল রঙের নক্ষত্রগুলোও স্পষ্ট।
আইফেল টাওয়ার ও সুপারমুন ফ্রান্সের মিউডনের আলোকচিত্রী মার্টিন জিরাউড ছবিটি তুলেছেন। আইফেল টাওয়ার থেকে ৬.৩ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা নিয়ে তৈরি ছিলেন তিনি। বহু বছর খোঁজ করার পর অ্যাপের সাহায্যে তিনি জানতে পারেন, ২০২৬ সালের প্রথম পূর্ণিমার চাঁদটি ঠিক ওই জায়গা থেকেই সোজা দেখা যাবে। মাঝের দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ার কারণে ক্যামেরার লেন্সে আইফেল টাওয়ারের ঠিক পেছনে চাঁদটিকে বেশ বড় দেখাচ্ছে।
সুইস আল্পসের ওপর ধূমকেতু রাতের পরিষ্কার আকাশ দেখতে সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতে গাড়ি চালিয়ে যান আলোকচিত্রী জ্যাকব সাহনার। এরপর টানা চার ঘণ্টা হেঁটে পাহাড়ি চূড়ায় পৌঁছান। ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে পাহাড়ি চূড়ার ওপর ধূমকেতু সি/২০২৫ এ৬ (লেমন) স্পষ্ট দেখতে পান তিনি। কোনো পূর্বপরিকল্পনা না থাকলেও কষ্ট করে পাহাড়ে ওঠার পর এই অসাধারণ দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করতে পারেন তিনি।
শ্যাডো মুন ছবিটি তুলেছেন ইংল্যান্ডের মার্সিসাইডের আলোকচিত্রী রিচার্ড অ্যাডিস। সাধারণত পূর্ণিমার দিনে সোজা আলো পড়ার কারণে চাঁদের গর্ত বা উঁচু-নিচু অংশগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। তাই অমাবস্যা থেকে শুরু করে টানা দুই সপ্তাহ চাঁদের প্রতিদিনের পরিবর্তনকে একটি ফ্রেমে ফুটিয়ে তোলার কাজ করেন তিনি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে টানা ১৪ দিন আকাশ একদম পরিষ্কার থাকায় তিনি চাঁদের প্রতিটি অবস্থার ছবি তোলার সুযোগ পান। সেই সব ছবি একত্র করেই তৈরি হয়েছে এই ছবি।
সূর্যের শিখা চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের ১৪ বছর বয়সী তরুণ আলোকচিত্রী ও চেন লিন ছবিটি তুলেছে। সে তার বাড়ির ছাদ থেকে পরিষ্কার আকাশে সূর্যের ওপরের ক্রোমোস্ফিয়ার স্তরের এই ছবিটি তোলে। ছবিতে সূর্যের উপরিভাগের কালো দাগ বা সানস্পট, সৌরশিখা এবং সুতার মতো ফিলামেন্টগুলো খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ও চেন লিনের এই ছবিটি প্রতিযোগিতার জুনিয়র বিভাগে সেরা ছবির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
মেঘের আড়ালে আংশিক সূর্যগ্রহণ ছবিটি তুলেছেন আলোকচিত্রী জেমস ম্যাকবিথ। গত বছর বসন্তের এক সকালে স্থানীয় একটি পার্কে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে তিনি আংশিক সূর্যগ্রহণের এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেন। ওই সময় আকাশে দ্রুত মেঘ ভেসে যাচ্ছিল। শত শত ছবি তোলার পর মেঘের মধ্য দিয়ে সূর্য ঢেকে যাওয়ার এই ছবিটিই তাঁর সবচেয়ে পছন্দ হয়। পার্কে আসা অনেক সাধারণ মানুষও তাঁর ক্যামেরার মাধ্যমে এই সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পান।
পাহাড়ের ওপারে অরোরা নরওয়ের ট্রোমসের আলোকচিত্রী জুলিয়েন ক্যাডেন ছবিটি তুলেছেন। নরওয়ের বিখ্যাত সেনজা দ্বীপের ‘ডেভিলস টিথ’ পাহাড়চূড়ার দিকে ক্যামেরা রেখে অরোরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। তবে অরোরাটি তাঁর ভাবনার বিপরীত দিক থেকে হঠাৎ জ্বলে ওঠে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আলোর তীব্রতা বেশি থাকার কারণে ছবি তোলা কঠিন ছিল। পরে কম্পিউটারে আলো ও রঙের সামঞ্জস্য ঠিক করে পাহাড় আর অরোরার এই ছবিটি ফুটিয়ে তোলেন তিনি।
হেলিক্স নেবুলা পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত হেলিক্স নেবুলা (এনজিসি ৭২৯৩)। এটি মূলত একটি মৃত নক্ষত্রের অবশেষ। প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রের আয়ু শেষ হয়ে গেলে এর বাইরের গ্যাসের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি তুলেছেন চিলির কোকুইম্বোর আলোকচিত্রী হামবার্ট সেড্রিক।
মহাজাগতিক প্রতিবেশী ছবিটি তুলেছেন চীনের জিনজিয়াংয়ের আলোকচিত্রী ইজিং ঝু এবং শিংহান ইয়াং। আমাদের থেকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে থাকা দুটি গ্যালাক্সিকে এই ফ্রেমে পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। বাম পাশের বোডস গ্যালাক্সিটি (এম৮১) দেখতে সুন্দর সর্পিল আকারের। কিন্তু ডান পাশের সিগার গ্যালাক্সিটি (এম৮২) পাশের ছায়াপথের আকর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেতরে তীব্রভাবে নতুন নক্ষত্র তৈরি করছে।