পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা গ্রহাণুদের ঠেকানোর উপায় নেই, বলছে নাসা
সম্প্রতি নাসার প্ল্যানেটারি ডিফেন্স অফিসার কেলি ফাস্ট এবং জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যান্সি চ্যাবট এক সাক্ষাৎকারে বেশ ভয়ের কথাই শুনিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, হুট করে যদি আমরা জানতে পারি, বড় কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে আসছে, তাহলে সেটাকে থামানোর কোনো উপায় এখন মহাকাশ সংস্থাগুলোর হাতে নেই। চ্যাবট তো বলেই ফেলেছেন, ‘এই চিন্তা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না!’
গ্রহাণুর কথা শুনলেই আমাদের মনে পড়ে ডাইনোসরদের বিলুপ্তির দৃশ্য। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে ডাইনোসরেরা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতটা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওই মাপের বিশাল গ্রহাণু সচরাচর পৃথিবীকে আঘাত করে না। গত সাড়ে ৬ কোটি বছরে এমনটা আর ঘটেনি। হলিউডের মুভি ডিপ ইমপ্যাক্ট বা ডোন্ট লুক আপ-এ যেমনটা দেখানো হয়, বাস্তবে তেমনটা ঘটার সম্ভাবনা খুব কম। আগামী ১০০ বছরেও পৃথিবী ধ্বংস করে দেওয়ার মতো কোনো গ্রহাণু আসার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।
তাহলে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা কেন চিন্তিত?
আসলে তাদের ভয়ের কারণ হলো মাঝারি আকারের গ্রহাণু। এগুলোকে বিজ্ঞানীরা বলেন সিটি-কিলার। এগুলোর আকার ১০০ থেকে ১৪০ মিটারের মতো হয়। এই আকারের কোনো পাথর যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তাহলে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হবে না ঠিকই, কিন্তু যে শহরের ওপর পড়বে, সেই শহর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে ডাইনোসরেরা হারিয়ে গিয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ওই মাপের বিশাল গ্রহাণু সচরাচর পৃথিবীকে আঘাত করে না।
১৯০৮ সালে রাশিয়ার তুংগুস্কায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। তখন একটি গ্রহাণু আকাশেই বিস্ফোরিত হয়েছিল, ফলে হাজার হাজার একর বনের গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভাগ্যিস ওটা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পড়েনি! বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, এমন সিটি-কিলার গ্রহাণু প্রতি ১০ হাজার বছরে একবার পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে।
ইতিমধ্যে আপনারা হয়তো নাসার ডার্ট মিশনের কথা জানেন। কয়েক বছর আগে নাসা একটা নভোযান দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে এক গ্রহাণুকে ধাক্কা দিয়ে তার গতিপথ বদলে দিয়েছিল। এটা ছিল একটি পরীক্ষা। পরীক্ষায় আমরা পাস করেছি ঠিকই, কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।
চ্যাবট বলছেন, আমাদের প্রযুক্তি আছে, কিন্তু অস্ত্র তৈরি নেই। ডার্ট মিশনটি প্রস্তুত করতে লেগেছিল তিন বছর। এখন যদি আমরা জানতে পারি যে আগামী মাসে একটা গ্রহাণু পৃথিবীকে আঘাত করবে, তাহলে এক মাসের মধ্যে এমন আরেকটি মহাকাশযান বানিয়ে সেটাকে মহাকাশে পাঠানো অসম্ভব। মুভির মতো পারমাণবিক বোমা মেরে গ্রহাণু উড়িয়ে দেওয়াটাও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, এতে গ্রহাণু ভেঙে হাজারো টুকরো হয়ে বৃষ্টির মতো পৃথিবীর ওপর পড়তে পারে, যা আরও বিপজ্জনক।
আরেকটা বড় সমস্যা হলো, আমরা সব গ্রহাণুর খোঁজ জানি না। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাকাশে প্রায় ২৫ হাজার এমন গ্রহাণু আছে, যেগুলো ১৪০ মিটারের চেয়ে বড় এবং পৃথিবীর কাছাকাছি আসতে পারে। এর মধ্যে আমরা মাত্র ৪০ শতাংশের খোঁজ পেয়েছি। বাকি ৬০ শতাংশ এখনো অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে!
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাকাশে প্রায় ২৫ হাজার এমন গ্রহাণু আছে, যেগুলো ১৪০ মিটারের চেয়ে বড় এবং পৃথিবীর কাছাকাছি আসতে পারে। এর মধ্যে আমরা মাত্র ৪০ শতাংশের খোঁজ পেয়েছি।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো সূর্যের দিক থেকে আসা গ্রহাণুগুলো নিয়ে। সূর্যের তীব্র আলোর কারণে টেলিস্কোপ দিয়ে এদের দেখা যায় না। ২০১৩ সালে রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্কে যে উল্কাপাত হয়েছিল, সেটা কেউ আগে থেকে দেখতে পায়নি। কারণ ওটা এসেছিল সূর্যের দিক থেকে।
তবে একদম হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভেরা রুবিন টেলিস্কোপ নামে বিশাল এক টেলিস্কোপ আসছে, যা মহাকাশের এই লুকিয়ে থাকা পাথরগুলোকে খুঁজে বের করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এটি চালু হলে আমরা ওই বাকি ৬০ শতাংশ অজানা গ্রহাণুর খোঁজ পেয়ে যাব। তখন হয়তো আমরা কয়েক বছর আগেই জানতে পারব বিপদ আসছে কি না!
নাসার বিজ্ঞানীরা চিন্তিত, কারণ এটা তাঁদের কাজ। কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের এখনই আতঙ্কে ভোগার কারণ নেই। পরিসংখ্যান বলছে, গ্রহাণুর আঘাতে মারা যাওয়ার চেয়ে ভূমিকম্প বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপদে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
তবুও বিজ্ঞানীরা চাইছেন, পৃথিবী যেন প্রস্তুত থাকে। আমরা যেমন ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখি, তেমনই মহাজাগতিক এই বিপদের জন্যও পৃথিবীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা জরুরি। হয়তো এই প্রস্তুতির কারণে একদিন পৃথিবী রক্ষা পাবে বড় কোনো বিপর্যয় থেকে!