১০০ বছরে একবার ঘটবে, তবু পরের বছরই মহাকাশে কেন একই রকম ঘটনা দেখা যায়
খবরের কাগজে বা অনলাইনে মাঝেমধ্যেই এমন চমকপ্রদ শিরোনাম চোখে পড়ে—‘এবারের সূর্যগ্রহণ জীবনে একবারই দেখার সুযোগ’, ‘এই ধূমকেতু আবার ফিরবে ৮০ বছর পর’ কিংবা ‘এমন গ্রহের সারি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ১০০ বছর’। এসব শিরোনাম পড়ে মনে হতেই পারে, ইশ! এবার দেখতে না পেলে বুঝি জীবনে আর কোনো দিন এমন দৃশ্য দেখার সুযোগই পাব না। অথচ দেখা যায়, ঠিক তার পরের বছরই আবার সূর্যগ্রহণ হচ্ছে, আকাশে উঁকি দিচ্ছে নতুন কোনো ধূমকেতু, কিংবা গ্রহগুলো সেজে বসেছে বিশেষ কোনো বিন্যাসে। তখন মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক—আগের বছর যে ঘটনাকে ‘১০০ বছরে একবার’ বলা হয়েছিল, ঠিক পরের বছরই মহাকাশে আবার তেমন ঘটনা ঘটছে কীভাবে?
এই গোলকধাঁধার আসল উত্তর লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক ঘটনাটি আসলে কী এবং পৃথিবী থেকে সেটি দেখার সুযোগ কেমন, এই দুটি বিষয়ের মধ্যে। মহাকাশে কোনো একটি ঘটনা ঠিক কতবার ঘটছে আর পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সেটি কতবার দেখা যাচ্ছে—দুটি বিষয় কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।
এর সবচেয়ে দারুণ উদাহরণ হতে পারে সূর্যগ্রহণ। যেমন ধরুন, ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চল থেকে চমৎকার একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। আবার ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের কিছু অঞ্চল থেকে আরও একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গেছে। তার মানে, একটি গ্রহণের পর আরেকটি গ্রহণ দেখার জন্য কিন্তু আমাদের শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়নি।
পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চল থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ আসতে কয়েক দশক বা এক শ বছরও লেগে যেতে পারে।
তবে একটা বিষয় খেয়াল করেছেন কী? দুটি গ্রহণের দৃশ্য দেখার জায়গা কিন্তু এক নয়। সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদের ছায়া পৃথিবীর বুকে যে সরু পথ তৈরি করে, কেবল সেই পথের ওপর থাকা মানুষেরাই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হতে পারেন। এর আশপাশের জায়গাগুলো থেকে হয়তো বড়জোর আংশিক গ্রহণ দেখা যায়, আর পৃথিবীর অন্য অনেক জায়গা থেকে গ্রহণ দেখাই যায় না।
এ জন্যই পৃথিবীতে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটলেই যে সেটা আমাদের বাংলাদেশ থেকে দেখা যাবে, এমন কোনো কথা নেই। পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চল থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ আসতে কয়েক দশক বা এক শ বছরও লেগে যেতে পারে। অথচ এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে হয়তো বেশ কয়েকবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটে গেছে!
সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদের ছায়া পৃথিবীর বুকে যে সরু পথ তৈরি করে, কেবল সেই পথের ওপর থাকা মানুষেরাই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হতে পারেন।
সূর্যগ্রহণের এই পুনরাবৃত্তির চমৎকার একটি ছন্দ আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সারোস চক্র। প্রতি ১৮ বছর ১১ দিন ৮ ঘণ্টা পর সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ ঠিক আগের মতো একই অবস্থানে ফিরে আসে। এর ফলে একই ধরনের সূর্যগ্রহণ আবার ঘটার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পৃথিবীর একই জায়গা থেকে সেই গ্রহণটি আবার দেখা যাবে। কারণ, এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর অনেকবার ঘুরে আসে। বিশেষ করে সারোস চক্রের ওই অতিরিক্ত ৮ ঘণ্টার কারণে পৃথিবী তার নিজ অক্ষে আরও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি ঘুরে যায়। ফলে পরের গ্রহণের ছায়াপথ পৃথিবীর বুকে আগেরবারের তুলনায় প্রায় ১২০ ডিগ্রি পশ্চিমে সরে যায়। সোজা কথায়, গ্রহণের ধরন এক হলেও পৃথিবীর যে অঞ্চলের ওপর চাঁদের ছায়া পড়ে, তা একেবারেই বদলে যায়।
সূর্যগ্রহণের পুনরাবৃত্তির চমৎকার একটি ছন্দ আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সারোস চক্র। প্রতি ১৮ বছর ১১ দিন ৮ ঘণ্টা পর সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ ঠিক আগের মতো একই অবস্থানে ফিরে আসে।
কিছু ঘটনা সত্যিই বহু বছর পরপর ঘটে
অবশ্য সব মহাজাগতিক ঘটনাই যে প্রতিবছর ঘটে, তা কিন্তু নয়। বিখ্যাত হ্যালির ধূমকেতুর কথাই ধরা যাক। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এর গড়ে সময় লাগে প্রায় ৭৬ বছর। ১৯১০ সালে আকাশে এই ধূমকেতুটি দেখা গিয়েছিল, এরপর তা আবার ফিরে আসে ১৯৮৬ সালে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, পরেরবার এটি আমাদের আকাশে উঁকি দেবে ২০৬১ সালে। অর্থাৎ, ১৯৮৬ সালে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু ২০৬১ সালে তার ৭৫ বছর বয়সে এই ধূমকেতুটিকে আবার দেখার এক বিরল সুযোগ পেতে পারে!
এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ‘বহু বছর পর দেখা যাওয়ার’ দাবিটি কিন্তু মোটেই ভুল নয়। হ্যালির ধূমকেতু চাইলেই দু-এক বছর পর পর ফিরে আসতে পারে না। তবে এই ধূমকেতুর মতো এত দীর্ঘ বিরতিতে ফিরে আসা বস্তু আর প্রতিবছর আকাশে দেখা দেওয়া সাধারণ ধূমকেতু মোটেও এক জিনিস নয়। আকাশে নতুন কোনো উজ্জ্বল ধূমকেতু দেখেই হ্যালির ধূমকেতু ফিরে এসেছে, এমনটা ভেবে বসার কোনো কারণ নেই।
১৯১০ সালে আকাশে এই ধূমকেতুটি দেখা গিয়েছিল, এরপর তা আবার ফিরে আসে ১৯৮৬ সালে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, পরেরবার এটি আমাদের আকাশে উঁকি দেবে ২০৬১ সালে।
আবার কোনো কোনো মহাজাগতিক ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও সেগুলোর বিশেষ কোনো দৃশ্য খুবই বিরল হতে পারে। ধরা যাক, আকাশে কয়েকটি গ্রহকে পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। এর মানে এই নয় যে গ্রহগুলো সত্যি সত্যি মহাকাশে এক সরলরেখায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে! পৃথিবী থেকে দেখার দৃষ্টিকোণ বা অ্যাঙ্গেল এমন হয় যে আমাদের চোখে গ্রহগুলোকে খুব কাছাকাছি মনে হয়। প্রতিটি গ্রহের আলাদা কক্ষপথ, ঘোরার গতি ও অবস্থানের কারণে বিশেষ কোনো গ্রহাণু-সারি বা বিন্যাস আবার ফিরে আসতে আসলেই দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। তাই ‘এমন গ্রহের সারি ১০০ বছর পর আবার দেখা যাবে’—এই দাবি শুনলে আগে জানতে হবে, ঠিক কোন বিন্যাসের কথা বলা হচ্ছে।
প্রতিটি গ্রহের আলাদা কক্ষপথ, ঘোরার গতি ও অবস্থানের কারণে বিশেষ কোনো গ্রহাণু-সারি বা বিন্যাস আবার ফিরে আসতে আসলেই দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
শিরোনামের ফাঁদে পড়বেন না
তাই মহাজাগতিক কোনো ঘটনা নিয়ে ‘১০০ বছরে একবার’ এমন চটকদার দাবি শুনলেই ভড়কে যাওয়া যাবে না। বরং কয়েকটি বিষয় ঠান্ডা মাথায় খেয়াল করতে হবে এবং বুঝতে হবে আসলে আকাশে কী ঘটতে যাচ্ছে।
প্রথমত, ঘটনাটি কি পুরো পৃথিবীর সব জায়গা থেকেই দেখা যাবে, নাকি নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা অঞ্চল থেকে? দ্বিতীয়ত, ‘একবার’ বলতে আসলে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে? এটি কি একই ধরনের কোনো ঘটনা, নাকি একই মহাজাগতিক বস্তু, নাকি হুবহু একই রকম দৃশ্য? তৃতীয়ত, বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি আবার কবে ঘটবে?
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৬ সালের ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৭ সালের ২ আগস্ট আবার একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ ঘটার কথা রয়েছে। সেটি দেখা যাবে দক্ষিণ স্পেন, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অঞ্চল থেকে। এর মানে এই নয় যে ২০২৬ সালের গ্রহণের বিরলতার দাবিটি ভুল ছিল। মূল বিষয়টা হলো, দুটি গ্রহণের ছায়াপথ ও দেখা যাওয়ার অঞ্চল সম্পূর্ণ আলাদা। তাই ‘এখন না দেখলে ১০০ বছরেও দেখা যাবে না’—এমন কথা শুনেই দুশ্চিন্তায় ভোগার কিছু নেই।
মূল বিষয়টা হলো, দুটি গ্রহণের ছায়াপথ ও দেখা যাওয়ার অঞ্চল সম্পূর্ণ আলাদা। তাই এখন না দেখলে ১০০ বছরেও দেখা যাবে না—এমন কথা শুনেই দুশ্চিন্তায় ভোগার কিছু নেই।
তবে সব দাবিকেই আবার চোখকান বুজে মিথ্যা ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। কখনো কখনো সত্যিই কোনো বিরল মহাজাগতিক ঘটনা দেখার সুযোগ এক জীবনে মাত্র একবারই আসে। বিজ্ঞানপ্রেমী হিসেবে আমাদের শুধু জানতে হবে, সেই বিরল ঘটনার হিসাবটা ঠিক কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
অবশ্য সংবাদপত্র বা নিউজ পোর্টালগুলো অনেক সময়ই পাঠকদের মনোযোগ কাড়তে শিরোনামে কৌশলের আশ্রয় নেয়, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বিজ্ঞান নিয়ে একটু পড়াশোনা থাকলে আর সামান্য মাথা খাটালেই মহাকাশে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে, সেটা খুব সহজেই বুঝে ফেলা সম্ভব।
