জেমস ওয়েবের ক্যামেরায় লায়ন নেবুলার নতুন রূপ

লায়ন নেবুলাছবি: নাসা

চোখ বন্ধ করে মহাকাশের এক বিশাল সিংহের কথা কল্পনা করুন তো! এটি এমন এক সিংহ, যার নাকটা তৈরি হয়েছে আস্ত একটা মৃতপ্রায় নক্ষত্র দিয়ে, রাজকীয় কেশরগুলো তৈরি হয়েছে মহাজাগতিক ধুলোকণা দিয়ে। আপনার থেকে তার দূরত্ব মাত্র...১০ হাজার আলোকবর্ষ!

হেঁয়ালি করছি না, মহাকাশের বুকে ঠিক এমনই এক ‘সিংহ’-এর দেখা পেয়েছে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। অবলোহিত ক্যামেরায় তোলা মহাজাগতিক এই সাফারির ছবিটি যেন আক্ষরিক অর্থেই এক বিস্ময়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই সিংহটির নাম এনজিসি ২৩৯২। দেখতে সিংহের মতো হওয়ায় আদর করে একে ‘লায়ন নেবুলা’ বলেও ডাকা হয়। ২০০০ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ প্রথমবার এর চমৎকার একটি ছবি তুলেছিল। কিন্তু এবার জেমস ওয়েবের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এর এমন এক জাদুকরী ও স্পষ্ট রূপ, যা মহাকাশবিজ্ঞানীদেরও চমকে দিয়েছে।

আরও পড়ুন
লায়ন নেবুলার ঠিক কেন্দ্রে বসে আছে একটি শ্বেত বামন বা মৃতপ্রায় নক্ষত্র। এই নক্ষত্রটি থেকে অনবরত বিকিরণ ছড়াচ্ছে। সেই বিকিরণের ফলে তার চারপাশে তৈরি হয়েছে এক বিশাল গ্যাসের বুদ্‌বুদ।

প্ল্যানেটারি নেবুলা আসলে কী

লায়ন নেবুলার এই রূপ বোঝার আগে একটু জানা দরকার, নেবুলা জিনিসটা আসলে কী। লায়ন নেবুলা হলো একটি প্ল্যানেটারি নেবুলা বা গ্রহাণু নীহারিকা। নাম শুনে ঘাবড়ে যাবেন না, এর সঙ্গে গ্রহের বিন্দুবিসর্গও কোনো সম্পর্ক নেই! শত শত বছর আগে যখন টেলিস্কোপ অত উন্নত ছিল না, তখন এগুলো দেখতে অনেকটা গ্রহের মতো গোলাকার লাগত। সেই ভুল থেকেই এমন নাম দেওয়া হয়েছিল।

আসলে প্ল্যানেটারি নেবুলা হলো সূর্যের মতো মাঝারি আকারের কোনো নক্ষত্রের জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ের একটা দৃশ্য। সূর্যও আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর যখন নিভে যেতে শুরু করবে, তখন ঠিক এভাবেই একটি নেবুলায় পরিণত হবে।

প্ল্যানেটারি নেবুলা হলো সূর্যের মতো মাঝারি আকারের কোনো নক্ষত্রের জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ের একটা দৃশ্য
ছবি: উইকিপিডিয়া

মহাকাশের সিংহের শরীরতত্ত্ব

এই নেবুলার ঠিক কেন্দ্রে বসে আছে একটি শ্বেত বামন বা মৃতপ্রায় নক্ষত্র। এই নক্ষত্রটি থেকে অনবরত বিকিরণ ছড়াচ্ছে। সেই বিকিরণের ফলে তার চারপাশে তৈরি হয়েছে এক বিশাল গ্যাসের বুদ্‌বুদ। জেমস ওয়েবের ছবিতে ঠিক এই বুদ্‌বুদটিকেই সিংহের মুখের মতো দেখাচ্ছে! এই প্রবল শক্তি তার সামনের সব ধুলোবালি ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর মৃত তারার চারপাশ ঘিরে থাকা ধুলোর যে বিশাল আবরণ দেখা যাচ্ছে, সেটাই হলো সিংহের সেই রাজকীয় কেশর!

আরও পড়ুন
জেমস ওয়েবের রয়েছে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া বিশাল আয়না এবং শক্তিশালী ইনফ্রারেড সেন্সর। এই সেন্সর মহাকাশের ধুলোর পর্দা সরিয়ে একদম ভেতরের নিখুঁত ছবি বের করে আনতে পারে।

জেমস ওয়েব কেন হাবলের চেয়েও আলাদা

আপনার মনে হতে পারে, হাবল তো আগেই ছবি তুলেছিল, তাহলে জেমস ওয়েবের ছবিতে নতুন কী আছে? এখানেই জেমস ওয়েবের আসল ক্যারিশমা! হাবল টেলিস্কোপ মূলত দৃশ্যমান আলোতে ছবি তোলে, যা মহাকাশের ঘন ধুলার মেঘ ভেদ করে খুব বেশি গভীরে যেতে পারে না। কিন্তু জেমস ওয়েবের রয়েছে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া বিশাল আয়না এবং শক্তিশালী ইনফ্রারেড সেন্সর। এই সেন্সর মহাকাশের ধুলোর পর্দা সরিয়ে একদম ভেতরের নিখুঁত ছবি বের করে আনতে পারে।

জেমস ওয়েবের তোলা নতুন ছবিতে এই শ্বেত বামন তারার চারপাশের আয়নিত গ্যাস এবং ধুলোর মেঘ হাবলের চেয়ে বহুগুণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গ্যাস ও ধুলো মিলে নেবুলার ভেতরে কীভাবে এত জটিল বলয় ও খোলসের মতো নিখুঁত কাঠামো তৈরি হলো, তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য। জেমস ওয়েবের এই নতুন ডেটা হয়তো সেই রহস্য সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে রয়েছে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া বিশাল আয়না
ছবি: নাসা

তবে মহাকাশের এই সিংহের রাজত্ব কিন্তু চিরকাল থাকবে না। একসময় ওই মৃতপ্রায় নক্ষত্রটি পুরোপুরি নিভে যাবে। তখন তার আকর্ষণ হারিয়ে সিংহের এই কেশর, গ্যাস ও ধুলোর মেঘ অনন্ত শূন্যতায় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, মহাকাশের এই গ্যাসীয় সিংহের মৃত্যু হতে এখনো বেশ দেরি আছে। আজ থেকে ঠিক ১০ হাজার বছর পর শোনা যাবে এর শেষ গর্জন। এরপরই চিরতরে হারিয়ে যাবে অপরূপ এই লায়ন নেবুলা। তার আগে অন্তত জেমস ওয়েবের কল্যাণে এর ভয়ংকর সুন্দর রূপটা আমরা দেখে নিতে পারলাম!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন