কম্পিউটার যখন নিজেই প্রোগ্রামার: ডেভিনের গল্প এবং কোডিংয়ের নতুন ভবিষ্যৎ

এমন কোনো প্রযুক্তি কি সম্ভব, যা মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে পুরো সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে?ছবি: ফ্যাভটিউটর

ছোটদের বিজ্ঞান

কল্পনা করো, তুমি তোমার পড়ার ঘরে বসে ল্যাপটপে একটি গেম বানানোর চেষ্টা করছ। হঠাৎ একটা জায়গায় এসে তোমার কোড আটকে গেল। তুমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কপালে হাত দিয়ে ভাবছ, ‘উফ! এই বাগটা (Bug) কীভাবে ঠিক করি?’ ঠিক তখনই তোমার পাশ থেকে একজন অদৃশ্য বন্ধু ফিসফিস করে বলল, ‘দাঁড়াও বন্ধু, চিন্তা নেই। আমি কোডের ভুলটা খুঁজে ঠিক করে দিচ্ছি, আর বাকি গেমটা আমি নিজেই শেষ করে রান করে দিচ্ছি। তুমি ততক্ষণে এক কাপ চা খেয়ে এসো!’

কেমন হতো বলো তো? সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো শোনাচ্ছে? কিন্তু ২০২৬ সালের প্রযুক্তি বিশ্বে এটি আর কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এক্কেবারে বাস্তব ঘটনা।

আজকে আমরা চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো সাধারণ চ্যাটবট নিয়ে কথা বলব না, যারা শুধু আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। আজকে আমরা গল্প করব এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে, যে কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজে একা একা পুরো সফটওয়্যার তৈরি করে ফেলতে পারে। তার নাম ডেভিন (Devin)—বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় এআই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার!

আরও পড়ুন
কোড লেখার সময় কোনো ভুল বা বাগ হলে ডেভিন নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে, গুগলে সার্চ করে সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলে এবং পুরো ওয়েবসাইটটি তৈরি করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়!

ডেভিন আসলে কে বা কী?

কগনিশন (Cognition) নামের একটি নতুন আমেরিকান টেক স্টার্টআপ এই ডেভিনকে তৈরি করেছে। এতদিন আমরা যেসব এআই ব্যবহার করেছি, যেমন গিটহাব কোপাইলট (GitHub Copilot), সেগুলো ছিল মূলত আমাদের কোডিংয়ের সহকারী। তুমি এক লাইন কোড লিখলে সে পরের লাইনের পরামর্শ দিত।

কিন্তু ডেভিন সম্পূর্ণ আলাদা। সে কেবল পরামর্শ দেয় না, সে নিজেই একজন পূর্ণাঙ্গ প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করতে পারে। তাকে যদি সাধারণ বাংলায় বা ইংরেজিতে বলা হয়, ‘আমাকে একটা দাবা খেলার ওয়েবসাইট বানিয়ে দাও’—সে নিজে থেকেই একটি পরিকল্পনা সাজায়। এরপর সে তার নিজস্ব ভার্চুয়াল কম্পিউটার, কোড এডিটর এবং ইন্টারনেট ব্রাউজার ব্যবহার করে কোড লিখতে শুরু করে। কোড লেখার সময় কোনো ভুল বা ‘বাগ’ হলে সে নিজেই ইন্টারনেট ঘেঁটে, গুগলে সার্চ করে সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলে এবং পুরো ওয়েবসাইটটি তৈরি করে তোমাকে বুঝিয়ে দেয়!

আরও পড়ুন
টার্মিনাল বা শেলে ডেভিন কোডটি রান করে পরীক্ষা করে দেখে যে সব ঠিক আছে কি না। কোনো নতুন লাইব্রেরি বা কোডের নিয়ম জানতে সে নিজে মানুষের মতো ব্রাউজারে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে পারে।

কীভাবে কাজ করে এই জাদুকরী এআই?

খুব জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে না গিয়ে যদি সহজ একটা উপমা দিয়ে বোঝানো যায়: ডেভিন অনেকটা একটা রোবট শেফের (Chef) মতো। তুমি তাকে শুধু বললে, ‘আমি বিরিয়ানি খাব।’ সাধারণ এআই তোমাকে শুধু রেসিপি বা রান্নার প্রণালী লিখে দেবে। কিন্তু ডেভিন নামের এই রোবট শেফ নিজে বাজারে যাবে, চাল-মাংস কিনবে, চুলা জ্বালাবে, রান্না করবে এবং সবশেষে প্লেটে সাজিয়ে তোমার সামনে গরম গরম বিরিয়ানি পরিবেশন করবে!

প্রযুক্তির ভাষায় একে বলা হয় এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন (End-to-End Automation)। ডেভিনের ভেতরে রয়েছে তিনটি প্রধান হাতিয়ার:

১. কোড এডিটর (IDE): যেখানে সে নিজে কোড লেখে।

২. টার্মিনাল বা শেল (Shell): যেখানে সে কোডটি রান করে পরীক্ষা করে দেখে যে সব ঠিক আছে কি না।

৩. ব্রাউজার (Browser): কোনো নতুন লাইব্রেরি বা কোডের নিয়ম জানতে সে নিজে মানুষের মতো ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে পারে।

আরও পড়ুন
ডেভিন নামের এই রোবট শেফ নিজে বাজারে যাবে, চাল-মাংস কিনবে, চুলা জ্বালাবে, রান্না করবে এবং সবশেষে প্লেটে সাজিয়ে তোমার সামনে গরম গরম বিরিয়ানি পরিবেশন করবে!

তাহলে কি মানুষের কোডিং শেখার দিন শেষ?

বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের মনে এখন এই প্রশ্নটা আসা খুব স্বাভাবিক—‘এআই যদি নিজেই সব কোড লিখে ফেলে, তাহলে আমরা কষ্ট করে পাইথন, জাভাস্ক্রিপ্ট বা সি++ শিখব কেন?’

উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের চিন্তাভাবনার গভীরে। এআই যতই নিখুঁত কোড লিখুক না কেন, সে কিন্তু মানুষের মতো ‘অনুভব’ করতে পারে না কিংবা একটা নতুন আইডিয়া মাথা থেকে বের করতে পারে না। সে কেবল মানুষের দেওয়া লজিক এবং ইন্টারনেটে থাকা কোটি কোটি ডেটা বিশ্লেষণ করে কাজ করে।

আসল সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভিটি কিন্তু মানুষেরই থাকবে। ডেভিনের মতো প্রযুক্তির কারণে এখন কোডিংয়ের রূপ বদলে যাচ্ছে:

  • আগে প্রোগ্রামিং মানে ছিল: ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে টাইপ করা, একটি সেমিকোলন বা ব্র্যাকেটের ভুল খোঁজা এবং বোরিং বয়লারপ্লেট (Boilerplate) কোড লেখা।

  • এখন প্রোগ্রামিং মানে হলো: সফটওয়্যারের মূল আইডিয়াটা কেমন হবে, সেটা মানুষের কী উপকারে আসবে এবং বিভিন্ন সিস্টেম কীভাবে একসাথে কাজ করবে তা ডিজাইন করা।

অর্থাৎ, এআই আমাদের হাতের খাটুনি কমিয়ে দিচ্ছে, যাতে আমরা আমাদের মগজটাকে আরও বড় এবং জটিল কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করতে পারি।

আরও পড়ুন
এআই যতই নিখুঁত কোড লিখুক না কেন, সে কিন্তু মানুষের মতো অনুভব করতে পারে না কিংবা একটা নতুন আইডিয়া মাথা থেকে বের করতে পারে না।

বিজ্ঞানমনস্ক তরুণদের জন্য বার্তা

আজ থেকে ৫০ বছর আগে যারা কম্পিউটার আবিষ্কার করেছিলেন, তারা কি ভেবেছিলেন একদিন কম্পিউটার নিজেই নিজের প্রোগ্রাম লিখতে পারবে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই গতি সত্যিই রোমাঞ্চকর।

ডেভিনের এই গল্প আমাদের ভয় দেখায় না, বরং এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। এখন আর কোডিং শেখার জন্য তোমাকে কম্পিউটার সায়েন্সের মস্ত বড় পণ্ডিত হতে হবে না। তোমার মাথায় যদি একটা দারুণ বৈজ্ঞানিক আইডিয়া থাকে, তাহলে এই এআই-কে সঙ্গী করে তুমি নিজেই তৈরি করে ফেলতে পারো ভবিষ্যতের কোনো চমৎকার আবিষ্কার।

তাই টেকনোলজির এই নতুন যুগে মুখস্থ করার অভ্যেস বাদ দিয়ে আমাদের বাড়াতে হবে লজিক্যাল থিংকিং বা যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং প্রবলেম সলভিং স্কিল। কারণ দিনশেষে, যন্ত্র যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, তার বুদ্ধির চাবিকাঠি কিন্তু মানুষের হাতেই থাকে!

লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

সূত্র: কগনিশন ল্যাবস রিসার্চ রিপোর্ট, এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ এবং হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ

আরও পড়ুন