মানুষের মস্তিষ্কের সমতুল্য নিউরোমরফিক চিপ বাণিজ্যিকীকরণ কি সম্ভব
প্রকৃত মেধা কি কৃত্রিম হতে পারে? এই বিতর্ক আমাদের মধ্যে থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনেকখানি সহজ ও গতিময় করে তুলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এআইয়ের কল্যাণে আমরা এখন চটজলদি ই-মেইলের উত্তর দিতে পারি, মুহূর্তেই জটিল কোনো মেডিকেল রিপোর্ট পড়ে রোগ শনাক্ত করতে পারি, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে কোনো বিষয়ের ওপর কী কী গবেষণা হচ্ছে, তারও একটা পরিষ্কার ধারণা পেতে পারি। কিন্তু আমাদের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বিদ্যুৎ বিল! আমাদের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞানীদের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এআই মডেল বানাতে হয়। সে জন্য প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত সার্ভার। বাড়তি সার্ভারের জন্য দরকার হয় পর্যাপ্ত হার্ডওয়্যার; আর হার্ডওয়্যারের সংখ্যা যত বাড়বে, বিদ্যুৎ খরচও বাড়বে ঠিক ততটাই।
এই সমস্যা থেকে মুক্তির দারুণ এক উপায় খুঁজে পেয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাঁরা এআইভিত্তিক হার্ডওয়্যারকে মানুষের মস্তিষ্কের মতো করে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন, যাতে বিদ্যুতের খরচ কমে যায়। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ তাঁদের এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের এই যুগান্তকারী কাজ বোঝার আগে আমরা বরং একটু দেখে নিই, এআইয়ের জন্য এত বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় কেন?
বর্তমানে আমরা এআইনির্ভর কোনো পরিষেবা ব্যবহার করার সময় প্রচলিত কম্পিউটিং সিস্টেমের ওপর নির্ভর করি, যেগুলোতে মেমোরি ও প্রসেসর পৃথকভাবে কাজ করে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রচলিত কম্পিউটিং সিস্টেমে তথ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জায়গা আলাদা হওয়ায় ডেটাকে বারবার একই রাস্তা অতিক্রম করতে হয়। আমরা যখন একটু জটিল কোনো সমস্যা এআইনির্ভর সিস্টেমের সামনে হাজির করি, তখন ডেটার এই ছোটাছুটির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ খরচ হয় বেশি।
প্রচলিত কম্পিউটিং সিস্টেমে তথ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জায়গা আলাদা হওয়ায় ডেটাকে বারবার একই রাস্তা অতিক্রম করতে হয়।
এ জন্যই কেমব্রিজের গবেষক দলটি প্রচলিত কম্পিউটিংয়ের পরিবর্তে নিউরোমরফিক কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করছে। এর মূল উদ্দেশ্য মানুষের মস্তিষ্কের সমতুল্য একধরনের অত্যাধুনিক কম্পিউটিং প্রযুক্তি মানবসভ্যতার সামনে হাজির করা। নতুন এই সিস্টেমে তথ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ একই জায়গায় করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ডেটার বেশি ছোটাছুটি করার দরকার হয় না। ফলে প্রচলিত এআই চিপের তুলনায় নিউরোমরফিক চিপগুলো অনেক কম শক্তিতে কাজ করতে পারে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, এসব চিপের ব্যবহারে শক্তির খরচ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়! সেই সঙ্গে কাজের গতিও বাড়ে বহুগুণ। সে জন্যই বর্তমানে গবেষক, প্রকৌশলী এবং চিপ ডিজাইনাররা মেমরিস্টর নামে মৌলিক সার্কিট উপাদানগুলোর সাহায্য নিচ্ছেন।
কী সেই মেমরিস্টর? এটি একধরনের বুদ্ধিমান রেজিস্টর, যা তড়িৎপ্রবাহের অনুপস্থিতিতেও এর আগের রোধ বা রেজিস্ট্যান্সের কথা মনে রাখতে পারে। দুটি ধাতব ইলেকট্রোডের মাঝে টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডের (TiO2) একটি পাতলা লেয়ারের সাহায্যে এই ন্যানো উপাদানগুলো তৈরি করা হয়। কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরিতে এদের জুড়ি মেলা ভার। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এটি স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের আকার কমাতেও সাহায্য করে। তবে শুধু আকারেই নয়, এর শক্তির চাহিদাও অনেক কম। সে জন্যই প্রযুক্তির দুনিয়ায় এর কদর ক্রমশ বাড়ছে।
বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ মেমরিস্টরের কার্যক্ষমতার মূলে আছে ধাতব অক্সাইড উপাদানের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র পরিবাহী ফিলামেন্ট, যেগুলো যন্ত্রটিকে বিভিন্ন কার্যকরী অবস্থার মধ্যে পরিবর্তন করতে সাহায্য করে। তবে সেগুলোর ওপর যে সব সময় নির্ভর করা যাবে, তা নয়। অনেক সময় উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতের দরকার পড়ে, যা উদ্ভাবকদের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
মেমরিস্টর একধরনের বুদ্ধিমান রেজিস্টর, যা তড়িৎপ্রবাহের অনুপস্থিতিতেও এর আগের রোধ বা রেজিস্ট্যান্সের কথা মনে রাখতে পারে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড মেটালার্জি বিভাগের বাবাক বখিতের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই সীমাবদ্ধতাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তাঁরা দুটি পর্যায়ে হাফনিয়ামভিত্তিক একটি পাতলা ফিল্ম তৈরি করেছেন এবং এতে স্ট্রনশিয়াম ও টাইটানিয়ামের মতো পদার্থ যোগ করেছেন। এভাবে তাঁরা বহু উপাদান সহযোগে তৈরি ফিল্মের (Hf(Sr,Ti)O2) ভেতরে একটি p-n জাংশন তৈরি করতে পেরেছেন, যেখানে পাতলা ফিল্মের স্তরগুলো এসে মেশে। এই জাংশনের মধ্যবর্তী শক্তির বাধা পরিবর্তন করে বৈদ্যুতিক রোধ অনায়াসেই পরিবর্তন করা সম্ভব।
এখন আর তাঁদেরকে ধাতব অক্সাইড উপাদানের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র পরিবাহী ফিলামেন্টের ওপর নির্ভর করতে হবে না। সহজ করে বললে, তাঁরা ফিল্মের ভেতরে একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক গেট তৈরি করতে পেরেছেন। এই পরিবর্তনের ফলে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় সুইচ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। কারণ, ফিল্মের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র ফিলামেন্ট মাঝেমধ্যেই গোলমেলে আচরণ করে।
এআই-নির্ভর যেকোনো যন্ত্রে ধারাবাহিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা, যেকোনো এআই-ভিত্তিক হার্ডওয়্যার পরীক্ষাগারের বাইরেও সমান কার্যকরী হওয়া উচিত। এই লক্ষ্যে শুরু থেকেই কাজ করছিলেন কেমব্রিজের গবেষকেরা। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের তৈরি হাফনিয়াম-ভিত্তিক মেমরিস্টরগুলো প্রচলিত কিছু অক্সাইড-ভিত্তিক ডিভাইসের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ গুণ কম সুইচিং কারেন্ট ব্যবহার করে কাজ করতে পারে! এটি অবশ্যই বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের মাঝে নতুন আশা দেখাচ্ছে।
গবেষকরা ফিল্মের ভেতরে একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক গেট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই পরিবর্তনের ফলে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় সুইচ করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
তবে বড় কথা হলো, তাঁদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার কি মানুষের মস্তিষ্কের সমতুল্য নিউরোমরফিক চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদনে সত্যিই সহায়ক হবে? প্রযুক্তিটি এখনই ব্যাপক উৎপাদনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর পেছনে আরও একটি বড় সমস্যা রয়েছে। এই ফ্যাব্রিকেশন পদ্ধতির জন্য প্রায় ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন। সেটা বাণিজ্যিকভাবে অর্ধপরিবাহী উৎপাদনের সাধারণ তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। গবেষক দলটি এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে প্রচলিত প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নিউরোমরফিক চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হয়।