এআইয়ের জন্য তৈরি হলো পর্যায় সারণি, এটি কীভাবে কাজ করবে
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জড়িয়ে গেছে। টেক্সট, ছবি, অডিও কিংবা ভিডিও—সব ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার জন্য এখন মাল্টিমোডাল এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কাজ করা ডেভেলপারদের জন্য একটা বড় মাথাব্যথা হলো, নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য ঠিক কোন অ্যালগরিদমটি সবচেয়ে ভালো হবে, তা বেছে নেওয়া। দ্রুত বর্ধনশীল এই এআই প্রযুক্তিতে এত এত অ্যালগরিদমের ভিড়ে সঠিকটি খুঁজে বের করা ভীষণ সময়সাপেক্ষ ও জটিল কাজ।
এই সমস্যারই একটি চমৎকার ও সুশৃঙ্খল সমাধান নিয়ে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির একদল পদার্থবিজ্ঞানী। দ্য জার্নাল অব মেশিন লার্নিং রিসার্চ-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তাঁরা এআই পদ্ধতির জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি গাণিতিক কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি এমন এক কাঠামো, যা ডেভেলপারদের কাছে এআইয়ের পর্যায় সারণি হিসেবে কাজ করবে!
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও এমোরি ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইলিয়া নেমেনম্যান জানান, আজকের দিনের সবচেয়ে সফল এআই পদ্ধতিগুলোর মূলে একটি খুব সাধারণ ধারণা কাজ করে। তা হলো, বিভিন্ন ধরনের ডেটাকে ঠিক ততটুকুই সংকুচিত করা, যতটুকু রাখলে আপনার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিখুঁতভাবে অনুমান করা যায়।
এআই নিয়ে কাজ করা ডেভেলপারদের জন্য একটা বড় মাথাব্যথা হলো, নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য ঠিক কোন অ্যালগরিদমটি সবচেয়ে ভালো হবে, তা বেছে নেওয়া।
এআইয়ের জগতে একটি খুব পরিচিত শব্দ হলো লস ফাংশন। এটি মূলত একটি গাণিতিক সূত্র, যা পরিমাপ করে যে এআইয়ের অনুমানটি সঠিক উত্তরের চেয়ে কতটা দূরে আছে। এআইয়ের ভুলের মাত্রা যত কমবে, লস ফাংশন তত কমবে এবং মডেলটি তত ভালো কাজ করবে। এখন সমস্যা হলো, মাল্টিমোডাল এআইয়ের জন্য বিজ্ঞানীরা শত শত লস ফাংশন তৈরি করেছেন। কোন কাজের জন্য কোনটি সেরা, তা প্রতিবার শূন্য থেকে শুরু করে খোঁজাটা বেশ ঝামেলার। এই নতুন পর্যায় সারণিটি লস ফাংশনের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন এআই পদ্ধতিকে আলাদা আলাদা ছকে ভাগ করে দেবে।
এই ঝামেলার অবসান ঘটাবে নতুন যে গাণিতিক কাঠামো, তার নাম দেওয়া হয়েছে ভ্যারিয়েশনাল মাল্টিভ্যারিয়েট ইনফরমেশন বটলনেক ফ্রেমওয়ার্ক। গবেষক দলের সদস্য মাইকেল মার্টিনির ভাষায়, ‘আমাদের এই ফ্রেমওয়ার্কটি আসলে একটি কন্ট্রোল নবের মতো কাজ করে। নির্দিষ্ট কোনো সমস্যার সমাধানের জন্য আপনার ঠিক কতটুকু তথ্য ধরে রাখা প্রয়োজন আর কতটুকু ফেলে দেওয়া প্রয়োজন, তা এই নব ঘুরিয়েই আপনি ঠিক করে ফেলতে পারবেন।’
মজার ব্যাপার হলো, সাধারণ মেশিন লার্নিং গবেষকেরা যেখানে শুধু এআইয়ের নির্ভুলতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন, সেখানে এই পদার্থবিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছেন এআই কেন এবং কীভাবে কাজ করে। তাঁরা আধুনিক এআইয়ের জটিলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই মৌলিক সূত্রটিই খুঁজে বের করেছেন।
লস ফাংশন মূলত একটি গাণিতিক সূত্র, যা পরিমাপ করে যে এআইয়ের অনুমানটি সঠিক উত্তরের চেয়ে কতটা দূরে আছে। এআইয়ের ভুলের মাত্রা যত কম হবে, লস ফাংশনও তত কম হবে।
এই সূত্র আবিষ্কারের পেছনের গল্পটাও বেশ দারুণ! বছরের পর বছর হোয়াইটবোর্ডে হিসাবনিকাশ ও ট্রায়াল অ্যান্ড এররের পর একদিন তাঁরা ডেটা কমপ্রেস করা এবং তা রিকনস্ট্রাক্ট করার মধ্যকার জাদুকরী গাণিতিক ভারসাম্যটি খুঁজে পান।
এই আবিষ্কারের উত্তেজনায় গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এসলাম আবদেল আলীমের হৃৎস্পন্দন এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর হাতে থাকা স্যামসাং গ্যালাক্সি স্মার্টওয়াচটি তাঁকে ভুল বুঝে এক অদ্ভুত নোটিফিকেশন দেয়! ঘড়িটি জানায়, লেখক এসলাম নাকি গত তিন ঘণ্টা ধরে সাইকেল চালাচ্ছেন! বিজ্ঞান মানুষের শরীরে কতটা উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, এটা তারই প্রমাণ।
এই ফ্রেমওয়ার্কটি এআই ডেভেলপারদের কাজ অনেক সহজ করে দেবে। তাঁরা এখন আগেই বুঝতে পারবেন কোন অ্যালগরিদমটি সফল হবে, কতটুকু ট্রেনিং ডেটা লাগবে এবং কোথায় সমস্যা হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় ডেটা বাদ দেওয়ার কারণে এআই সিস্টেম চালাতে এখন আগের চেয়ে অনেক কম কম্পিউটেশনাল পাওয়ার লাগবে, যা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে এবং পরিবেশের জন্যও বেশ উপকারী হবে।
ভবিষ্যতে এই বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্কের কাজের ধরন বুঝতেও এই ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করতে চান। মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে একসঙ্গে এত তথ্য সংকুচিত করে এবং প্রসেস করে, তার সঙ্গে এআই মডেলের কোনো মিল আছে কি না; এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চান তাঁরা।