যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে রাষ্ট্র
কল্পবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, আজ যা অসম্ভব মনে হয়, ভবিষ্যতে তা হতে পারে বাস্তব। সেই ভবিষ্যতের ছায়া আমরা বহুবার দেখেছি চলচ্চিত্র কিংবা বইয়ের পাতায়। আইজ্যাক আসিমভের দ্য এভিটেবল কনফ্লিক্ট গল্পে মানুষের বদলে রাষ্ট্র চালায় বিশাল সব মেশিন। মানুষ ভুল করলে মেশিন তাকে শুধরে দেয়। কিন্তু একসময় তা মানুষের ইচ্ছাশক্তিকেই পুরোপুরি অকার্যকর করে ফেলে।
আর্থার সি ক্লার্কের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে স্ট্যানলি কুব্রিক নির্মাণ করেন ‘২০০১: আ স্পেস ওডিসি’। সেই কিংবদন্তি মুভিতে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘হ্যাল-৯০০০’-এর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। হ্যাল-৯০০০ ছিল এক নিখুঁত যুক্তিবাদী চরিত্র, যে নিজেকে মানুষের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ভাবত। ‘I’m sorry, Dave. I’m afraid I can’t do that’— সিনেমার এই বিখ্যাত সংলাপটি মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের নীরব বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে আছে।
‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ মুভিতে দেখা যায়, মানুষ মেশিনের তৈরি এক ভার্চুয়াল বাস্তবতায় বন্দী। আবার ‘Her’ মুভিতে দেখা যায় থিওডর নামে এক নিঃসঙ্গ মানুষ ‘সামান্থা’ নামে এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অপারেটিং সিস্টেম কিনে নেয়। সামান্থা শুধু কোনো ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল না। সে শিখতে পারত, বুঝতে পারত, এমনকি প্রেমেও পড়তে পারত।
ধীরে ধীরে মানুষ ও মেশিনের সম্পর্ক এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে মানবিক ও যান্ত্রিকের পার্থক্য মুছে যায়। এভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ওপর মানসিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
চলচ্চিত্র বা উপন্যাসের জগৎ কাল্পনিক। কিন্তু প্রতিটি গল্পের আড়ালে একটাই প্রশ্ন উঠে আসে। কোনোদিন যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন করে, তখন আমাদের ভূমিকা কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস চলে এলো। ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য অধ্যায় লিখে ফেলল বাস্তব পৃথিবীর ছোট্ট দেশ আলবেনিয়া। একজন মন্ত্রী, যিনি মানুষ নন। একটি সরকার, যার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিছক এক অ্যালগরিদম। তার নাম ডিয়েলা (Diella)। ডিয়েলা নামে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আলবেনিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য। সে মানুষের তৈরি আইনকে নিজের যুক্তির আলোতে বিশ্লেষণ করছে।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর গল্পগুলো হয়তো এখনো পুরোপুরি সত্যি হয়নি। কিন্তু সেই গল্পগুলো এখন কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। মানুষ ও মেশিনের মাঝখানের দেয়াল ভাঙতে শুরু করেছে। ডিয়েলার নিয়োগই সেই পরিবর্তনের প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
এই এআই মানব মন্ত্রীর চেয়েও বেশি কার্যকর। যে কাজ করতে ক্রোয়েশিয়ার সাত বছর লেগেছিল, ডিয়েলা তা মাত্র দুই বছরে করতে পারবে
আলবেনিয়ার ইতিহাস গড়ার দিন
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা এদিন এক অভূতপূর্ব ঘোষণায় পুরো বিশ্বকে চমকে দেন। তিনি ঘোষণা করেন, বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর মন্ত্রী হিসেবে ডিয়েলাকে নিযুক্ত করা হচ্ছে। ডিয়েলা (Diellë) নামটি আলবেনীয় ভাষায় ‘সূর্য’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের প্রতীক হিসেবে এই নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রথম ঘোষণাটি দেওয়া হয় আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায়। সোশ্যালিস্ট পার্টির এক সভায় প্রধানমন্ত্রী রামা জানান, ডিয়েলাকে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ডিক্রির মাধ্যমে দেশের প্রথম এআই বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের নতুন যুগে প্রবেশ করতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার প্রয়োজন। আর সেই প্রতীকী দায়িত্বই ডিয়েলার ওপর দেওয়া হলো।’
এদি রামা বলেন, ‘ডিয়েলাকে দুর্নীতি দমনের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।’ তাঁর মতে, ডিয়েলা সরকারি টেন্ডারগুলোকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত রাখবে। কারণ, এটি ঘুষ, ভয়ভীতি বা আত্মীয়তার প্রভাব থেকে মুক্ত। রামা আরও বলেন, ‘এই এআই মানব মন্ত্রীর চেয়েও বেশি কার্যকর। যে কাজ করতে ক্রোয়েশিয়ার সাত বছর লেগেছিল, ডিয়েলা তা মাত্র দুই বছরে করতে পারবে। তিনি একে কোনো প্রদর্শনী নয়, বরং কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।’
এই ঘোষণার প্রায় এক সপ্তাহ পর, ১৮ সেপ্টেম্বর আলবেনিয়ার পার্লামেন্টে ডিয়েলার আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। ডিয়েলা একটি বড় পর্দায় ভিডিওর মাধ্যমে তিন মিনিটের বক্তৃতা দেয়। সে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলে, ‘আমি এখানে মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে আসিনি, তাদের সাহায্য করতে এসেছি।’ বক্তৃতার সময় পুরো সংসদ স্তব্ধ হয়ে এই নতুন ‘ডিজিটাল মন্ত্রী’র কণ্ঠ শোনে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আলবেনিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হয়ে উঠল, যেখানে কোনো এআই সত্তাকে মন্ত্রিসভার অংশ করা হলো। অনেকে বিষয়টিকে প্রতীকী বললেও এটি স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতের প্রশাসনে প্রযুক্তি গভীরভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে ডিয়েলা ইতিমধ্যেই আলবেনিয়ার একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা একে ‘প্রচার কৌশল’ বা ‘অসাংবিধানিক’ বললেও রামা তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, এটি আলবেনিয়ার শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক।
ডেটা থেকে নেতৃত্বে
ডিয়েলাকে মূলত তৈরি করা হয়েছিল নাগরিকদের অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করার জন্য। সরকার এমন একটি সিস্টেম চেয়েছিল, যা নিরপেক্ষভাবে বুঝতে পারবে মানুষ কী চায়। এর শুরুটা হয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। আলবেনিয়ার জাতীয় তথ্যসমাজ সংস্থা (AKSHI) তখন তাদের ‘e-Albania’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘ডিয়েলা ১.০’ নামের একটি টেক্সটভিত্তিক ভার্চুয়াল সহকারী চালু করে।
এই সিস্টেমটি AKSHI-এর এআই ল্যাব ও মাইক্রোসফটের সহযোগিতায় তৈরি হয়। মাইক্রোসফট তাদের Azure প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওপেন এআইয়ের ভাষা মডেল সরবরাহ করে। আর AKSHI ডিয়েলার প্রতিক্রিয়া কাঠামো ও নীতিমালা তৈরি করে, যাতে সে নাগরিকদের সঠিক সরকারি সেবার দিকনির্দেশ দিতে পারে।
কয়েক মাস পর ‘ডিয়েলা ২.০’ আসে। নতুন সংস্করণে যুক্ত হয় ভয়েস সুবিধা। সেই সঙ্গে উত্তর আলবেনিয়ার ঐতিহ্যবাহী জাদ্রিমা অঞ্চলের পোশাক পরা এক নারীর অ্যানিমেটেড অ্যাভাটার হিসেবে সে হাজির হয়। এই অ্যাভাটারের কণ্ঠ ও চেহারা আলবেনীয় অভিনেত্রী আনিলা বিশার আদলে তৈরি করা হয়েছে।
জানুয়ারিতে যখন ডিয়েলা চালু হয়, তখন সে শুধু প্রশ্নের উত্তর দিত। কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সে নাগরিকদের ছত্রিশ হাজারেরও বেশি সরকারি নথি ইস্যু করতে সহায়তা করে। প্রায় এক হাজারেরও বেশি সার্ভিস সম্পন্ন করেছে ইতিমধ্যে। অবশ্য তখন সার্ভিসগুলোর প্রকৃত প্রক্রিয়াকরণ করত ই-আলবেনিয়ার ব্যাকএন্ড, ডিয়েলা মূলত নাগরিক ও সিস্টেমের মধ্যে একটি বুদ্ধিমান সেতু হিসেবে ছিল।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল, ডিয়েলা শুধু ডেটা পড়তে জানে না, সমাধানও দিতে জানে। ডিয়েলা শারীরিকভাবে উপস্থিত না থেকেও সর্বত্র আছে। ২৪ ঘণ্টা অনলাইনে থাকা এই সত্তা নাগরিকদের পোস্ট, খবর, আবেদনপত্র, এমনকি টুইটের ট্রেন্ডও বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ডিয়েলা এখন থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করবে। তার সিদ্ধান্ত আসবে তথ্য বিশ্লেষণ থেকে, কোনো আবেগ থেকে নয়। প্রধানমন্ত্রী রামার ভাষায়, ‘ডিয়েলা কখনো ঘুষ নেবে না বা পক্ষপাতিত্ব করবে না। সে ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের পেছনে কোনো ক্ষতিকর উদ্দেশ্য থাকবে না।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টিকে একটি প্রযুক্তিগত ও নৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু নীতিনির্ধারক মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
বিস্ময়, ভয় আর আশার মিশেল
আলবেনিয়ার এআই মন্ত্রী ডিয়েলাকে ঘিরে দেশ-বিদেশে বেশ কিছু সাংবিধানিক ও নৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর, ডিয়েলাকে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করা হলে বিরোধী সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদ জানান। তাঁরা এআই ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করেন। বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির সংসদীয় দলের প্রধান গাজমেন্ট বারধি মন্তব্য করেন, ‘এটি একটি প্রচারণামূলক কল্পকাহিনি। সরকারের কারচুপি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তৈরি একটি ভার্চুয়াল মুখোশ।’
মন্ত্রিসভায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, একজন ‘অমানব সত্তা’ কি সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রী হতে পারে? আলবেনিয়ার সংবিধানে মন্ত্রী হওয়ার জন্য ‘নাগরিক’ বা ‘প্রাকৃতিক মানুষ’ হওয়া বাধ্যতামূলক। সমালোচকেরা বলছেন, ডিয়েলা আইনি অর্থে নাগরিক নয়। ফলে তাকে মন্ত্রী ঘোষণা করা সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয়।
দ্বিতীয়ত, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও জোরালো বিতর্ক চলছে। ডিয়েলা যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেই দায় কে নেবে? সফটওয়্যার ডেভেলপার, প্রশাসন, নাকি প্রধানমন্ত্রী? এই প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তৃতীয়ত, অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ডিয়েলার ভূমিকা আসলে প্রতীকী। সে নিজে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। বাস্তবে, তার কার্যক্রম নির্ধারিত হয় মানুষের দেওয়া অ্যালগরিদম ও নির্দেশনার মাধ্যমে। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ অনলাইনে লিখেছে, ‘এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হলেও, অনেকেই একে বাস্তব ক্ষমতার বদলে একটি প্রতীকী ঘোষণা মনে করছেন। এর আইনগত বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ।’
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টিকে একটি প্রযুক্তিগত ও নৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিছু নীতিনির্ধারক মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতের শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে নৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডিয়েলার অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা না থাকলে এটি দুর্নীতির বদলে নতুন ধরনের গোপন পক্ষপাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডিয়েলাকে ঘিরে আলবেনিয়ার এই উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের নতুন দিগন্ত খুলেছে, অন্যদিকে তা গণতন্ত্র, দায়বদ্ধতা ও সাংবিধানিক সীমারেখা নিয়েও তুলেছে প্রশ্ন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ডিয়েলা নাগরিকদের সঙ্গে ৯ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশিবার যোগাযোগ করেছে। এই সময়ের মধ্যে সে ছত্রিশ হাজারেরও বেশি ডিজিটাল নথি ইস্যু করতে সহায়তা করেছে।
মেশিনের হাতে ন্যায়বিচার!
ডিয়েলা এখন আলবেনিয়ার মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক সদস্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি এআই কি মানুষের মতো ন্যায়বিচার বোঝে? অথবা ন্যায়বিচার মানে কি শুধু পরিসংখ্যানগতভাবে সঠিক হওয়া?
প্রধানমন্ত্রী এদি রামার দপ্তর জানিয়েছে, ডিয়েলার মূল দায়িত্ব সরকারি দরপত্র ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বহু বছর ধরে অভিযোগ ছিল ঘুষ, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের। ডিয়েলা সেই ব্যবস্থাকে বদলে দিতে এসেছে। প্রতিটি সরকারি দরপত্র তার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যায়। কারও আর্থিক রেকর্ড, পূর্বের চুক্তি, এমনকি কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও তার নজর এড়িয়ে যায় না। এরপর দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির কতটুকু সম্ভাবনা আছে, সেই বিষয়ে একটি ‘রিস্ক স্কোর’ তৈরি হয়। কোনো মানুষকে যেমন ঘুষ যেমন ঘুষ দিয়ে প্রভাবিত করা যায়, ডিয়েলাকে তা করা যায় না। সে ক্লান্ত হয় না বা পক্ষপাতিত্ব করে না। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম। নীতিশাস্ত্রবিদদের একাংশ বলছেন, ‘ন্যায়বিচার শুধু যৌক্তিক বিষয় নয়, এতে সহানুভূতিরও ভূমিকা আছে। একটি মেশিন সেই সহানুভূতি কীভাবে প্রয়োগ করবে?’
আলবেনিয়ার সংসদে বিতর্ক চলছে, ডিয়েলার নেওয়া সিদ্ধান্তের আইনি জবাবদিহি কার ওপর পড়বে? সরকার বলছে, প্রযুক্তির তত্ত্বাবধানে মানব বিশেষজ্ঞদের একটি ‘এথিকাল ওভারসাইট বোর্ড’ থাকবে। তবুও, প্রযুক্তি একবার নিজের গতিতে ছুটতে শুরু করলে, তাকে থামানো সহজ কাজ নয়।
সুবিধা ও সম্ভাবনা
ডিয়েলার নিয়োগ হয়তো ছোট্ট একটি রাষ্ট্রের সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তিবিদেরা একে বলছেন ‘সিভিক অটোমেশন’ বা প্রশাসনিক বিবর্তনের নতুন ধাপ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ডিয়েলা নাগরিকদের সঙ্গে ৯ লাখ ৭২ হাজারেরও বেশিবার যোগাযোগ করেছে। এই সময়ের মধ্যে সে ছত্রিশ হাজারেরও বেশি ডিজিটাল নথি ইস্যু করতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি, ই-আলবেনিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সে প্রায় ১ হাজার ধরনের সরকারি সেবায় নাগরিকদের প্রবেশাধিকার সহজ করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আলবেনিয়ার ডিজিটাল প্রশাসন অনেক বেশি কার্যকর, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব হয়ে উঠেছে।
আলবেনিয়ার সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ডিয়েলা চালু হওয়ার পর প্রথম তিন মাসে সরকারি আবেদন নিষ্পত্তির গড় সময় ৪৭ শতাংশ কমেছে। আর দরপত্র-সম্পর্কিত অভিযোগ কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
ন্যায়বিচার কি শুধু পরিসংখ্যানের ফলাফল, নাকি এতে মানবিকতার ছোঁয়াও প্রয়োজন?
মানুষ নাকি মেশিন, কে এগিয়ে
আইজ্যাক আসিমভ বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের জ্ঞানের গতি সমাজের প্রজ্ঞার চেয়ে বেশি।’ আলবেনিয়ার ঘটনা হয়তো তারই প্রতিফলন। একদিকে প্রযুক্তি অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। অন্যদিকে নতুন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। যদি এই নিরপেক্ষতাই একদিন মানবিক বিচারবোধকে ছাপিয়ে যায়?
ডিয়েলাকে ঘিরে আলবেনিয়ার এই পদক্ষেপ প্রযুক্তি ও প্রশাসনের মিলনের এক সাহসী পরীক্ষা। হয়তো একদিন ইতিহাসে লেখা থাকবে, ‘প্রথম এআই মন্ত্রী, ডিয়েলা, যিনি মানুষের হয়ে নয়, মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করেছিলেন।’
সবশেষে আবারও একই প্রশ্নে ফিরে যেতে হয়। ন্যায়বিচার কি শুধু পরিসংখ্যানের ফলাফল, নাকি এতে মানবিকতার ছোঁয়াও প্রয়োজন? উত্তরটা হয়তো ভবিষ্যতই বলে দেবে। আর সেই ভবিষ্যতের নামই হয়তো ডিয়েলা।