এসি কেন বিস্ফোরিত হয়

এসি বিস্ফোরণের অন্যতম প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হওয়া।ছবি: ইনফাইওয়ে

গরম থেকে বাঁচতে আমরা ঘরে যে এসি লাগাই, সেটিই যেন এখন এক নতুন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অনেক জায়গায় এসি বিস্ফোরণের খবর শোনা গেছে। এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় দেয়াল ধসে পড়েছে এবং ভয়াবহ আগুনে পুড়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে।

এত অত্যাধুনিক একটি যন্ত্র কেন এমন মারাত্মক বিপদের কারণ হয়ে উঠছে? সাধারণ মানুষের মনে এখন প্রশ্ন, এসি কি আসলেই বিপজ্জনক? নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা আমাদের কিছু ভুল?

এসি বিস্ফোরণের ঘটনা বিরল হলেও এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিতে পারে। এমনকি বিপন্ন করে তুলতে পারে মানুষের জীবন। এ ধরনের বিপজ্জনক ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের অবশ্যই এর সম্ভাব্য কারণগুলো বুঝতে হবে। সাধারণত কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বা ভুল ব্যবহারের কারণেই এমনটা ঘটে।

বৈদ্যুতিক ত্রুটি

এসি চালাতে তারের সংযোগ ও সার্কিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসি বিস্ফোরণের অন্যতম প্রধান কারণ এই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হওয়া। ত্রুটিপূর্ণ তার, হঠাৎ বিদ্যুৎ প্রবাহ বৃদ্ধি কিংবা শর্ট সার্কিটের কারণে এসির মধ্যে অতিরিক্ত গরম ও বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে। এগুলোই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পুরানো বা নিম্নমানের তার ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়। এখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এ ধরনের বিপদ এড়াতে পেশাদার টেকনিশিয়ান দিয়ে নিয়মিত বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং পরীক্ষা করানো উচিত।

আরও পড়ুন
আধুনিক এসিতে ব্যবহৃত R-32 বা R-290-এর মতো নতুন রেফ্রিজারেন্টগুলো পরিবেশবান্ধব হলেও এগুলো দাহ্য। এই গ্যাস লিক হয়ে যখন কোনো বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ বা আগুনের উৎসের সংস্পর্শে আসে, তখনই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
এসি বিস্ফোরণের আরেকটি বড় কারণ হলো যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া।
ছবি: এআই-জেনারেটেড

যন্ত্রাংশের অতিরিক্ত গরম

এসি বিস্ফোরণের আরেকটি বড় কারণ হলো যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া। অতিরিক্ত ব্যবহার বা দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের ফলে এসির কম্প্রেসার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তীব্র গরমে একটানা ব্যবহারের কারণে এই সমস্যা বাড়ে।

এই অতিরিক্ত গরমের ফলেই এসির ভেতরে মারাত্মক অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয়। এতেও বিস্ফোরণ হতে পারে। এই বিপদ এড়াতে এসি নিয়মিত সার্ভিস করা এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের সময় বিরতি দেওয়া জরুরি।

গ্যাস লিক

এসি ঠান্ডা রাখার জন্য রেফ্রিজারেন্ট নামে গ্যাস অত্যাবশ্যক। কিন্তু এটি লিক হলে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। বিশেষ করে, আধুনিক এসিতে ব্যবহৃত R-32 বা R-290-এর মতো নতুন রেফ্রিজারেন্টগুলো পরিবেশবান্ধব হলেও এগুলো দাহ্য। এই গ্যাস লিক হয়ে যখন কোনো বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ বা আগুনের উৎসের সংস্পর্শে আসে, তখনই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

তবে রেফ্রিজারেন্ট লিক হচ্ছে কিনা, তা বোঝার সহজ উপায় হলো ‘হিস হিস’ শব্দ শোনা। এছাড়া এসির এসির ঠান্ডা করার ক্ষমতা হঠাৎ কমে গেলেও লিকের সম্ভাবনা থাকে। লিক হওয়া রেফ্রিজারেন্ট শুধু আগুনের ঝুঁকিই বাড়ায় না, এটি এসির ঠান্ডা করার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। এই ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত লিক পরীক্ষা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে লিক শনাক্ত করে দ্রুত মেরামত করলেই এই বিপদ এড়ানো সম্ভব।

আরও পড়ুন
টানা এসি ২৪ ঘণ্টা বা বিরতি ছাড়াই এসি চলতে থাকলে তাতে চাপ সৃষ্টি হয় এবং অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়।এই তাপ সঞ্চয় অভ্যন্তরীণ চাপকে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে এবং সম্ভাব্য বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করে।

বায়ুপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা

এসি বিস্ফোরণের আরেকটি সাধারণ কারণ এর ফিল্টার ও কয়েলে ময়লা জমে ব্লক হয়ে যায়। এতে এসির ভেতরের বায়ুপ্রবাহ যায় কমে। স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা বাতাস তৈরি করতে তখন এসিকে আরও বেশি কাজ করতে হয়। এই অতিরিক্ত কাজের ফলে যন্ত্রটি অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত চাপ ও তাপই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। এই বিপদ এড়াতে, সঠিক বায়ুপ্রবাহ বজায় রাখতে ও অতিরিক্ত গরম হওয়া রোধ করতে নিয়মিত ফিল্টার ও কয়েল পরিষ্কার বা প্রতিস্থাপন করা অপরিহার্য।

এসি বিস্ফোরণের আরেকটি সাধারণ কারণ এর ফিল্টার ও কয়েলে ময়লা জমে ব্লক হয়ে যায়।
ছবি: এআই-জেনারেটেড

বিরতি ছাড়াই ব্যবহার

টানা এসি ২৪ ঘণ্টা বা বিরতি ছাড়াই এসি চলতে থাকলে তাতে চাপ সৃষ্টি হয় এবং অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। বিরতি না পাওয়ায় সিস্টেমটি পর্যাপ্ত ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বিপদজ্জনকভাবে বাড়তে থাকে। এই তাপ সঞ্চয় অভ্যন্তরীণ চাপকে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে এবং সম্ভাব্য বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করে। এই ঝুঁকি কমাতে এসিকে পর্যায়ক্রমে বিরতি দেওয়া জরুরি। নিয়মিত বিরতি পেলে সিস্টেমের যন্ত্রাংশগুলো অতিরিক্ত চাপ থেকে মুক্ত থাকে এবং বিস্ফোরণের ঝুঁকি কমে।

আরও পড়ুন
এসি বিস্ফোরণের আরেকটি সাধারণ কারণ এর ফিল্টার ও কয়েলে ময়লা জমে ব্লক হয়ে যায়।স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা বাতাস তৈরি করতে তখন এসিকে আরও বেশি কাজ করতে হয়। এই অতিরিক্ত কাজের ফলে যন্ত্রটি অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠে।

যন্ত্রাংশের দুর্বলতা

অনেক সময় এসির ভেতরের যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণেও বিপদ ঘটে। ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ বা দুর্বল উপাদানগুলো সুরক্ষা ঝুঁকি তৈরি করে, যা এসি বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে, সব সময় ভালো ব্র্যান্ডের এসি কেনা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসি ইনস্টল করার সময় দক্ষ ও পেশাদার টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেওয়া। কারণ, তাঁরা ইনস্টলেশনের সময় সম্ভাব্য ত্রুটিগুলো শনাক্ত করতে পারেন।

শেষ কথা

এসি বিস্ফোরণের প্রধান কারণগুলো বুঝতে পারলে এই বিপদ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এসির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সচেতন ব্যবহার এবং দ্রুত সমস্যা সমাধান করা জরুরি। আর যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে অবিলম্বে পেশাদার টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

সূত্র: ইনফাইওয়ে, নিউজ এইটিন

আরও পড়ুন