এক ঘণ্টা এসি চালালে কতটা বিদ্যুৎ খরচ হয়
রাত সাড়ে দশটা। ঘরের তাপমাত্রা তখনও ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। রিমোটের সবুজ বোতাম টিপতেই কম্প্রেসারের গুনগুন শব্দ, তারপর ঠান্ডা বাতাসের প্রথম ঝাপটা। এই স্বস্তির পেছনে যে যন্ত্রটা একটানা খাটছে, সেটা ঠিক কতটা বিদ্যুৎ খরচ করছে, সেই হিসাব বেশির ভাগ মানুষই কখনো করে দেখেন না। মাস শেষে বিলের কাগজ হাতে পেয়ে চমকে যাওয়াটাই তখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এসি আসলে কী করে, যাতে আমাদের আরাম লাগে?
এসি কিন্তু সরাসরি ঘরের বাতাস ঠান্ডা করে না, বরং ঘরের ভেতরের গরম বাতাস টেনে নিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। এর ভেতরে থাকা রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস তরল হয়ে কয়েলের মধ্য দিয়ে ঘোরে এবং তাপ শুষে নেয়। এরপর কম্প্রেসার সেই গ্যাসকে চাপ দিয়ে বাইরের ইউনিটে পাঠায়, যেখানে তাপটা বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ খরচের আসল জায়গাটাই হলো এই কম্প্রেসার। কারণ, গ্যাসকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করার কাজেই সবচেয়ে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়।
এসি সরাসরি ঘরের বাতাস ঠান্ডা করে না, বরং ঘরের ভেতরের গরম বাতাস টেনে নিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। এর ভেতরে থাকা রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস তরল হয়ে কয়েলের মধ্য দিয়ে ঘোরে এবং তাপ শুষে নেয়।
খরচের হিসাবে এসি
এবার একটু সংখ্যার হিসাবে ফেরা যাক। একটি ১.৫ টনের সাধারণ বা নন-ইনভার্টার এসি চললে ইনপুট পাওয়ার সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ ওয়াটের মধ্যে থাকে। অর্থাৎ টানা এক ঘণ্টা চললে এটি প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে। ১ টনের এসিতে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ ওয়াটের ঘরে দাঁড়ায়। তবে ২ টনের বড় এসি হলে বিদ্যুৎ খরচ ২ হাজার ওয়াটও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে এখানে একটি ‘কিন্তু’ আছে। নন-ইনভার্টার এসি একবার চালু হলে তা পুরো ক্ষমতায় চলে। ঘর ঠান্ডা হয়ে গেলে কম্প্রেসার বন্ধ হয়ে যায় এবং তাপমাত্রা বেড়ে গেলে আবার চালু হয়। অন্যদিকে ইনভার্টার এসির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। এর কম্প্রেসার একেবারে বন্ধ না হয়ে ঘরের তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে গতি কমিয়ে বা বাড়িয়ে চলতে থাকে। একই ঘর ঠান্ডা রাখার কাজে ইনভার্টার মডেলের এসি সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ খরচ করে, বিশেষ করে যদি তা দীর্ঘ সময় ধরে চালানো হয়। এসির গায়ে থাকা স্টার রেটিংও বিদ্যুৎ খরচের একটি ভালো নির্দেশক। একই ঠান্ডা করার ক্ষমতাসম্পন্ন ফাইভ স্টার ও ওয়ান স্টার এসির মধ্যে বিদ্যুৎ খরচের পার্থক্য অনেক সময় ২০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
উইন্ডো এসিতে কম্প্রেসার ও ইনডোর ইউনিট একসঙ্গে বসানো থাকে বলে ঘরের ভেতরেই কিছুটা তাপ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু স্প্লিট এসিতে কম্প্রেসারটি ঘরের বাইরে থাকে বলে এই সমস্যা তুলনামূলক কম।
মাস শেষে বিল কত আসে
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ২০২৬ সালের জুনে খুচরা বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা ইউনিটপ্রতি প্রায় দেড় টাকার মতো। আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ধাপভিত্তিক এই মূল্যহার এখন সর্বনিম্ন প্রায় সাড়ে পাঁচ টাকা থেকে শুরু হয়ে বেশি ব্যবহারে ১৩ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। মাঝারি ধাপে থাকা একটি পরিবারের গড় হিসাব ধরলে প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে ৭ টাকা থেকে ৭.৫ টাকা।
একটি দেড় টনের নন-ইনভার্টার এসি যদি গড়ে ঘণ্টায় ১.৬ ইউনিট বিদ্যুৎ টানে, তবে প্রতি ইউনিটের দাম ৭ টাকা ধরলে এক ঘণ্টা চালানোর খরচ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১১ টাকা। রাতে টানা আট ঘণ্টা চললে খরচ হয় প্রায় ৯০ টাকা। মাসের ৩০ দিনে শুধু এই একটি এসির পেছনেই বিদ্যুৎ বিল আসতে পারে ২ হাজার ৭০০ টাকার কাছাকাছি! তবে ইনভার্টার এসি হলে একই ব্যবহারে এই খরচ কমে হাজার দুয়েক টাকায় নেমে আসতে পারে।
স্প্লিট বনাম উইন্ডো এসির ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ খরচে সামান্য ফারাক রয়েছে। উইন্ডো এসিতে কম্প্রেসার ও ইনডোর ইউনিট একসঙ্গে বসানো থাকে বলে ঘরের ভেতরেই কিছুটা তাপ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু স্প্লিট এসিতে কম্প্রেসারটি ঘরের বাইরে থাকে বলে এই সমস্যা তুলনামূলক কম। তাই একই ক্ষমতার দুটি যন্ত্রের মধ্যে স্প্লিট মডেলটিই সাধারণত সামান্য কম বিদ্যুৎ খরচ করে।
একটি দেড় টনের নন-ইনভার্টার এসি যদি গড়ে ঘণ্টায় ১.৬ ইউনিট বিদ্যুৎ টানে, তবে প্রতি ইউনিটের দাম ৭ টাকা ধরলে এক ঘণ্টা চালানোর খরচ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১১ টাকা।
খরচ কমবেশি হওয়ার আসল কারণ
শুধু এসির ক্ষমতা বা রেটিং দিয়েই পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। ঘরের আকার এবং দেয়ালের ইনসুলেশনও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। টিনের চাল বা বড় কাচের জানালাযুক্ত ঘরে কম্প্রেসারকে বেশি খাটতে হয়। এ ছাড়া এসির তাপমাত্রা বা থার্মোস্ট্যাট ২৪-এর বদলে ১৮ বা ১৯ ডিগ্রিতে সেট করলে খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। কারণ, ভেতর ও বাইরের তাপমাত্রার পার্থক্য বেশি হলে কম্প্রেসারকে টানা কাজ করতে হয় এবং এটি বিরতি পাওয়ার সুযোগ কম পায়। ফিল্টারে জমে থাকা ধুলাবালুও নীরবে খরচ বাড়ায়। বাতাস চলাচলে বাধা পেলে এসিকে বেশি চাপ দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বের করতে হয়, যা বিদ্যুৎ খরচ বাড়িয়ে দেয়।
টিনের চাল বা বড় কাচের জানালাযুক্ত ঘরে কম্প্রেসারকে বেশি খাটতে হয়। এ ছাড়া এসির তাপমাত্রা বা থার্মোস্ট্যাট ২৪-এর বদলে ১৮ বা ১৯ ডিগ্রিতে সেট করলে খরচ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।
তাহলে উপায় কী
এসি একেবারে বন্ধ রাখাটা কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়; ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরের গরমে সেটা কেউ মেনেও নেবে না। তবে এসির তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখলে অনেকখানি বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। ঘুমানোর আগে টাইমার সেট করে দিলে মাঝরাতে যন্ত্রটি এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। ঘরের জানালা-দরজা ঠিকমতো আটকানো থাকলে বাইরের গরম বাতাস ঢুকে কম্প্রেসারের কাজ বাড়াতে পারে না। আর বছরে অন্তত দুবার এসির ফিল্টার পরিষ্কার করালেও বিদ্যুৎ খরচে বেশ পার্থক্য টের পাওয়া যায়। নতুন এসি কেনার পরিকল্পনা থাকলে ইনভার্টার প্রযুক্তি ও বেশি স্টার রেটিং একসঙ্গে খোঁজা উচিত। শুরুতে দাম একটু বেশি পড়লেও মাস ছয়েকের মধ্যেই বেঁচে যাওয়া বিদ্যুৎ বিল দিয়ে সেই বাড়তি টাকা পুষিয়ে যায়।
তাই কম্প্রেসারের গুনগুন শব্দটি শুধু ঘর ঠান্ডা করার প্রতিশ্রুতি নয়, এটি মিটারের কাঁটা একটু একটু করে ঘোরারও শব্দ। খেয়াল করলে তা শোনা যায়, না করলে যায় না। তবে মাস ঘুরলে বিলটা কিন্তু ঠিকই আসে!