মাদারবোর্ড কীভাবে কাজ করে
ডেস্কটপ কম্পিউটারের কেসিং খুললে সহজে মাদারবোর্ডের দেখা না–ও মিলতে পারে। সারি সারি যন্ত্রাংশ ও তারের ভিড় ঠেলে ভেতরের দিকে তাকালে চোখে পড়বে এক জটিল গোলকধাঁধা। সবুজ, কালো বা নীল রঙের একটি বোর্ড। এতে সাজানো থাকে ছোট ছোট সিলিকন চিপ, তামার সূক্ষ্ম রেখা ও শত শত ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ। একেই আমরা ডাকি মাদারবোর্ড। এটি হলো কম্পিউটারের পুরো সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। প্রসেসরকে যদি কম্পিউটারের মস্তিষ্ক ধরা হয়, তবে মাদারবোর্ড হলো এর কঙ্কাল ও রক্তনালির জাল। এই জাল ছাড়া মস্তিষ্কের কোনো চিন্তাই বাস্তবে রূপ পেত না।
এই প্ল্যানার বোর্ডে সহায়ক সার্কিট কার্ড যুক্ত করার জন্য বিশেষ খাঁজ রাখা হয়েছিল। এসব সহায়ক কার্ডকে বলা হতো ডটারবোর্ড। মূল সমতল বোর্ডে এই শাখা বোর্ডগুলো সন্তানের মতো যুক্ত হতো।
প্ল্যানার থেকে মাদারবোর্ড
আধুনিক মাদারবোর্ড কিন্তু এক দিনে তৈরি হয়নি। কম্পিউটিংয়ের শুরুর দিকে, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের বিখ্যাত অলটেয়ার ৮৮০০–এর মতো মাইক্রোকম্পিউটারগুলোয় একক কোনো মাদারবোর্ড ছিল না। সেখানে ব্যবহার করা হতো ‘এস–১০০ বাস’ নামে একধরনের ব্যাকপ্লেন প্রযুক্তি। এতে শুধু সারি সারি স্লট থাকত। প্রসেসর, মেমোরি বা ইনপুট–আউটপুটের জন্য আলাদা সার্কিট কার্ড গুঁজে দিতে হতো। ফলে পুরো সিস্টেম অনেক বড় হয়ে উঠত। তারের জঞ্জালে ভরে যেত ভেতরটা। এই ধারায় বিশাল পরিবর্তন আসে ১৯৮১ সালে।
আইবিএম তখন তাদের প্রথম পারসোনাল কম্পিউটার ‘আইবিএম ৫১৫০’ বাজারে আনে। সে সময় প্রকৌশলীরা পুরো সিস্টেমকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা ইন্টেল ৮০৮৮ সিপিইউ, রম–বায়োস, মেমোরি সকেট ও গুরুত্বপূর্ণ সার্কিটগুলোকে একটি সমতল বোর্ডে যুক্ত করেন। সমতল কাঠামোর কারণে আইবিএম এর নাম দিয়েছিল প্ল্যানার বোর্ড। এই প্ল্যানার বোর্ডে সহায়ক সার্কিট কার্ড যুক্ত করার জন্য বিশেষ খাঁজ রাখা হয়েছিল। এসব সহায়ক কার্ডকে বলা হতো ডটারবোর্ড। মূল সমতল বোর্ডে এই শাখা বোর্ডগুলো সন্তানের মতো যুক্ত হতো। এ কারণে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিপ্রেমীরা ভালোবেসে মূল বোর্ডটিকে ডাকতে শুরু করেন মাদারবোর্ড।
প্রকৌশলীরা ইন্টেল ৮০৮৮ সিপিইউ, রম–বায়োস, মেমোরি সকেট ও গুরুত্বপূর্ণ সার্কিটগুলোকে একটি সমতল বোর্ডে যুক্ত করেন। সমতল কাঠামোর কারণে আইবিএম এর নাম দিয়েছিল প্ল্যানার বোর্ড।
মাদারবোর্ডের নানা অংশ
বাইরে থেকে মাদারবোর্ডকে একটি সাধারণ পাতলা বোর্ড মনে হতে পারে। তবে এটি মূলত একটি মাল্টি লেয়ার প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড বা পিসিবি। আধুনিক মাদারবোর্ডে সাধারণত ৬ থেকে ১২টি তামার অতিসূক্ষ্ম স্তর সাজানো থাকে। এর ভেতর দিয়ে যাওয়া সিগন্যালগুলো যাতে একে অপরের সঙ্গে মিলে কোনো বাধা তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা হয়। এ জন্য ব্যবহার করা হয় আধুনিক বিদ্যুৎ অপরিবাহী পদার্থ।
সিপিইউ সকেট: এটি প্রসেসরকে বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত করার মূল কেন্দ্র। এতে মূলত দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। একটি পিন গ্রিড অ্যারে বা পিজিএ। এতে প্রসেসরের গায়ে পিন থাকে। অন্যটি ল্যান্ড গ্রিড অ্যারে বা এলজিএ। এতে সকেটের ভেতরে স্প্রিং পিন সাজানো থাকে। এই প্রযুক্তিগুলোর সাহায্যে প্রসেসর মাদারবোর্ডের সঙ্গে নিখুঁতভাবে আটকে থাকে।
চিপসেট: কম্পিউটারের ট্রাফিক পুলিশ। আগে নর্থব্রিজ ও সাউথব্রিজ নামে আলাদা দুটি চিপ থাকলেও বর্তমানে একটি একক প্ল্যাটফর্ম কন্ট্রোলার হাব সব পেরিফেরাল নিয়ন্ত্রণ করে।
ট্রেস ও বাস লাইন: তামার তৈরি ডেটা হাইওয়ে, যা দিয়ে সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন বিট ডেটা আদান-প্রদান হয়।
এক্সপানশন স্লট: গ্রাফিকস কার্ড বা আলট্রাফাস্ট এসএসডি যুক্ত করার হাই স্পিড বাস।
আধুনিক মাদারবোর্ডে সাধারণত ৬ থেকে ১২টি তামার অতিসূক্ষ্ম স্তর সাজানো থাকে। এর ভেতর দিয়ে যাওয়া সিগন্যালগুলো যাতে একে অপরের সঙ্গে মিলে বাধা তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা হয়।
ভিআরএম: এটি ১২ ভোল্ট বিদ্যুৎকে প্রসেসরের উপযোগী নিরাপদ ১.২ থেকে ১.৪ ভোল্টে দিলে তা মুহূর্তেই পুড়ে যাবে। এই বিপদ থেকে বাঁচায় ভোল্টেজ রেগুলেটর মডিউল বা ভিআরএম। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিদ্যুতের মাত্রাকে ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ ভোল্টে নামিয়ে আনে। ফলে প্রসেসরে মসৃণ বিদ্যুতের প্রবাহ নিশ্চিত হয়।
ফার্মওয়্যার: মাদারবোর্ডের একটি ক্ষুদ্র ফ্ল্যাশ–রম চিপে বেসিক ইনপুট–আউটপুট সিস্টেম বা বায়োস সংরক্ষিত থাকে। কম্পিউটার চালুর সঙ্গে সঙ্গেই এটি সব হার্ডওয়্যার পরীক্ষা করে। একে বলে পাওয়ার–অন সেলফ–টেস্ট বা পোস্ট। এরপর এটি বুটলোডারকে মেমোরিতে লোড করে। এভাবেই অপারেটিং সিস্টেম সচল হয়।
কম্পিউটিংয়ের গতি যত বাড়ছে, মাদারবোর্ডের চ্যালেঞ্জও তত তীব্র হচ্ছে। সিগন্যাল ঠিক রাখা ও তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে। উচ্চ কম্পাঙ্কের সিগন্যাল যেন কোনো তড়িৎ–চুম্বকীয় বাধা তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। এ জন্য উন্নত আবরণ ও একাধিক প্যাসিভ হিটসিংক ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদারবোর্ড কেবল একখণ্ড প্রাণহীন বোর্ড নয়; এটি পদার্থবিজ্ঞান, বস্তুবিজ্ঞান ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির এক নিখুঁত মেলবন্ধন। কোটি কোটি ইলেকট্রনের এই সুশৃঙ্খল যাত্রাই মূলত আমাদের আধুনিক ডিজিটাল পৃথিবীর প্রাণপ্রবাহ সচল রাখছে।