ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের শেয়ার কিনতে চান, যা যা জানতে হবে
প্রথমবারের মতো বিনিয়োগকারীরা ইলন মাস্কের টেক্সাসভিত্তিক কোম্পানি স্পেসএক্সের শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন। এই কোম্পানিটি মঙ্গল গ্রহে মানববসতি স্থাপন এবং মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার বসানোর পরিকল্পনা করছে।
এটি হতে যাচ্ছে শেয়ারবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পাবলিক সেল। এর মাধ্যমে স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১০টি বৃহৎ তালিকাভুক্ত কোম্পানির একটিতে পরিণত হবে। এবার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি অনুপাতে শেয়ার উন্মুক্ত করা হচ্ছে। তবে শেয়ারের এই বিশাল পরিমাণের কারণে অনেক বড় বড় ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডও স্পেসএক্সের মালিকানার অংশীদার হয়ে যাবে।
তাহলে যারা এখানে বিনিয়োগ করবেন, তারা আসলে কী কিনছেন? এর পেছনের ঝুঁকিগুলোই বা কী?
১২ জুন থেকে শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির লাখ লাখ নতুন শেয়ারের লেনদেন শুরু হয়েছে। এই আইপিওর মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্পেসএক্সে আসলে কী ঘটছে
বর্তমানে স্পেসএক্সের মালিকানায় আছেন ইলন মাস্ক এবং অন্যান্য প্রাইভেট বিনিয়োগকারীরা। তবে সম্প্রতি তারা ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইপিও চালু করেছে। ১২ জুন থেকে শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির লাখ লাখ নতুন শেয়ারের লেনদেন শুরু হয়েছে।
এই আইপিওর মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি শেয়ার কেনা হয়েছে ১৩৫ ডলার দরে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এমন একটি ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যার কাজের পরিধি মহাকাশ অনুসন্ধান এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (আগের নাম টুইটার) এবং বহুল আলোচিত এআই প্ল্যাটফর্ম গ্রক পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্পেসএক্স ইলন মাস্কের সবচেয়ে পরিচিত কোম্পানি। এটি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে অনেকেই ধারণা করছেন, আগামী বছর হয়তো কোম্পানি দুটি মিলে একটি কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে।
শেয়ারবাজার থেকে তোলা এই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে মাস্ক স্পেসএক্সের বর্তমান কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের নতুন সব উদ্যোগেও বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণ, মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন এবং মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার তৈরি করা।
স্পেসএক্স কোম্পানিটি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে অনেকেই ধারণা করছেন, আগামী বছর হয়তো কোম্পানি দুটি মিলে একটি কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে।
সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানের আদলে লেখা তাদের সেলস প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছে, মানুষকে অবশ্যই ডাইনোসরদের মতো পরিণতি এড়াতে হবে। মহাকাশকে ঘিরেই এক প্রাচুর্যের যুগের পরিকল্পনা করতে হবে, কারণ চেতনার আলো শুধু একটি নির্দিষ্ট গ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
মাস্কের এই উচ্চাভিলাষী স্বপ্নগুলোর বাস্তবতা নিয়ে বেশ ভালোই সংশয় রয়েছে। কিন্তু তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, যারা আগে তাঁকে সন্দেহ করেছিল, মাস্ক তাদের সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছেন।
১২ জুন বিকেলে প্রতিটি শেয়ারের লেনদেন শুরু হয় ১৫০ ডলারে—যা আইপিওর প্রাথমিক দামের চেয়ে অনেকটাই বেশি। এরপর দ্রুতই শেয়ারের দাম আরও বাড়তে থাকে, যা ইলন মাস্ককে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
মাস্কের এই উচ্চাভিলাষী স্বপ্নগুলোর বাস্তবতা নিয়ে বেশ ভালোই সংশয় রয়েছে। কিন্তু তাঁর সমর্থকেরা বলছেন, যারা আগে তাঁকে সন্দেহ করেছিল, মাস্ক তাদের সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছেন।
যে কেউ কি শেয়ার কিনতে পারবে
১২ জুন নিউইয়র্কের প্রযুক্তিভিত্তিক শেয়ারবাজার নাসডাকে স্পেসএক্স তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এর শেয়ার কিনেছে। তবে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য জায়গার সাধারণ মানুষও নির্দিষ্ট কিছু ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও ব্রোকারের মাধ্যমে শেয়ার কেনার আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন। অবশ্য লেনদেন শুরু হওয়ার আগেই চাহিদার ওপর ভিত্তি করে শেয়ারগুলো বণ্টন করা হয়েছে।
এখন যেহেতু লেনদেন শুরু হয়ে গেছে, তাই শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে বা কমতে পারে। এটা নির্ভর করছে সামগ্রিক বাজার এই প্রাথমিক দামটাকে খুব বেশি নাকি খুব কম মনে করছে, তার ওপর।
আপনি যদি সরাসরি স্পেসএক্সের শেয়ার নাও কেনেন, তবু পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে আপনার আর্থিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকতে পারে। যেমন ধরুন, আপনার পেনশন বা সেভিংস ফান্ড ম্যানেজার যদি তাদের বিনিয়োগ কৌশলের অংশ হিসেবে এর শেয়ার কেনেন, অথবা আপনার যদি এমন কোনো ইনডেক্স-ট্র্যাকিং ফান্ড থাকে যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় বড় কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে, তবে আপনিও এর অংশ হয়ে যাবেন। মানে, স্পেসএক্সে যা ঘটবে তার প্রভাব অন্তত সামান্য হলেও লাখ লাখ মানুষের অর্থের ওপর পড়বে।
স্পেসএক্সের বাজারমূল্য এখন প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে যাচ্ছে। ফলে এটি তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআইয়ের চেয়ে বড় কোম্পানিতে পরিণত হবে। তবে এটি এখনো অ্যালফাবেট (গুগল), অ্যাপল, মাইক্রোসফট এবং অ্যামাজনের মতো বড় টেক জায়ান্টগুলোর চেয়ে ছোটই থাকছে।
স্পেসএক্সের বাজারমূল্য এখন প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে যাচ্ছে। ফলে এটি তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআইয়ের চেয়ে বড় কোম্পানিতে পরিণত হবে।
স্পেসএক্সে বিনিয়োগকারীরা কি ধনী হবেন
বাজার বিশ্লেষকদের বড় বড় দল স্পেসএক্সের মতো কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স গভীরভাবে নজরে রাখে। কিন্তু শেয়ার লেনদেন শুরু হওয়ার পর এর দাম বাড়বে নাকি কমবে, তা স্বয়ং বিশ্লেষকেরাও বলতে পারছিলেন না।
অতীতে রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়া, উৎপাদনে ধীরগতি এবং রাজনৈতিক বিতর্কের মতো অনেক বাধা ইলন মাস্ক সামলে উঠেছেন। কিন্তু এআইয়ের এই ইঁদুরদৌড় যেমন ভীষণ ব্যয়বহুল, তেমনি অনিশ্চয়তায় ভরা। ফলে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে শেয়ারের দাম হয়তো ইতিমধ্যেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করা হয়েছে এবং এই বুদবুদ যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে।
গত বছর, স্পেসএক্স ১৮.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করলেও তাদের নিট লোকসান ছিল ৪.৯ বিলিয়ন ডলার। এমনকি তাদের আইপিও প্রসপেক্টাসেও (শেয়ার বিক্রির শর্তাবলি লেখা থাকে যে নথিতে) বলা হয়েছে, কোম্পানিটির নিট লোকসানের ইতিহাস রয়েছে এবং তারা ভবিষ্যতে হয়তো লাভের মুখ না-ও দেখতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম সিট্রিন ভেঞ্চার পার্টনারসের রুথ ফক্স-ব্লেডার মনে করেন, স্পেসএক্সের প্রজেক্টের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য এত বেশি যে এর বিক্রি করার মতো অনেকগুলো আকর্ষণীয় দিক রয়েছে।
স্পেসএক্সের আইপিও প্রসপেক্টাসেও বলা হয়েছে, কোম্পানিটির নিট লোকসানের ইতিহাস রয়েছে এবং তারা ভবিষ্যতে হয়তো লাভের মুখ না-ও দেখতে পারে।
অন্যদিকে আইফরেক্সের মাইকেল হিউসন বলছেন, এই সংখ্যাগুলো অবিশ্বাস্য। তার মতে, এই বিনিয়োগটা হলো ইলন মাস্কের কিছু বিশাল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর বাজি ধরার শামিল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্পেসএক্সকে তার বর্তমান এই আকাশছোঁয়া বাজারমূল্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তাদের আয় ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।
এই বছর এআইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি বিশাল কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরমধ্যে প্রথম স্পেসএক্স। অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআই যখন তাদের শেয়ার বিক্রি করবে, তখনও ঠিক একই মূলনীতি কাজ করবে; বিশাল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে এর সমপরিমাণ লাভের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্পেসএক্সকে তার বর্তমান এই আকাশছোঁয়া বাজারমূল্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তাদের আয় ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।
শেয়ারহোল্ডাররা কি স্পেসএক্স পরিচালনার ক্ষেত্রে মতামতের সুযোগ পাবেন
কোম্পানির যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শেয়ার বিক্রির পরও ইলন মাস্কের হাতে ৮০ শতাংশের বেশি ভোটাধিকার থেকে যাবে, যা তার বর্তমান ক্ষমতার চেয়ে খুব সামান্যই কম। কোম্পানি কে চালাবে এবং এর সার্বিক কৌশল কী হবে, তা তিনি একাই নির্ধারণ করবেন।
ইলন মাস্কের খামখেয়ালি ব্যবস্থাপনা এবং তার একাধিক ব্যবসার কথা মাথায় রেখে বিষয়টি অনেকের কপালেই ভাঁজ ফেলেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে এই ব্যবসায় আগ্রহের মূল কারণটাই হলো মাস্কের ব্যক্তিগত সুনাম!
সত্যি বলতে, বিষয়টা নিয়ে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা হচ্ছে, এই আইপিওটি ব্যবসার মূল ভিত্তির চেয়ে ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত ইমেজের ওপর ভর করেই বেশি চলছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত করার এই বিরাট প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, এই শেয়ার বিক্রির নেপথ্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার খোদ ইলন মাস্ক।