মৃতপ্রায় গাছের কাছ থেকে দূরে সরে যায় অন্য গাছ
বারান্দায় বা বাগানের টবে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, গাছগুলো বড্ড শান্ত, এক জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের তো আর আমাদের মতো হাত-পা নেই যে বিপদ দেখলে দৌড় লাগাবে! কিন্তু আসলেই কি তাই? উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা কিন্তু একদম অন্য কথা বলছেন। গাছপালা হয়তো আমাদের মতো হেঁটে বা উড়ে বেড়ায় না, কিন্তু তারা প্রতিনিয়ত নড়াচড়া করে। আলোর দিকে হেলে পড়া, মাধ্যাকর্ষণের টানে শেকড় মাটির গভীরে পাঠানো কিংবা জলের খোঁজে শেকড় বাঁকিয়ে ফেলার মতো কিছু অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করে গাছ। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ট্রপিজম।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গাছের নড়াচড়ার এমন এক গা ছমছমে কৌশল আবিষ্কার করেছেন, যা শুনে আপনি রীতিমতো চমকে যাবেন। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গাছ তার নিজের প্রজাতির মৃত বা পচে যাওয়া অংশের গন্ধ পেলেই সেখান থেকে শেকড় বাঁকিয়ে উল্টো দিকে পালাতে শুরু করে! সম্প্রতি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের নাম দেওয়া হয়েছে স্যাপ্রোট্রপিজম।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গাছ তার নিজের প্রজাতির মৃত বা পচে যাওয়া অংশের গন্ধ পেলেই সেখান থেকে শেকড় বাঁকিয়ে উল্টো দিকে পালাতে শুরু করে!
বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় বড় আবিষ্কারই হয়েছে নিছক দুর্ঘটনার হাত ধরে। চীনের নর্থওয়েস্ট এঅ্যান্ডএফ ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী ইয়ুঝউ ঝাংয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। তিনি অস্ট্রিয়ার একটি ল্যাবরেটরিতে গাছের শেকড় কীভাবে মাধ্যাকর্ষণের প্রতি সাড়া দেয়, তা নিয়ে কাজ করছিলেন। একদিন হঠাৎ করেই তার পরীক্ষার একটি অ্যাগার প্লেটে (যেখানে চারাগাছ বড় করা হয়) বাইরের বাতাস থেকে জীবাণু ঢুকে ছত্রাক পড়ে যায়। প্লেটটি নষ্ট হয়ে গেছে ভেবে তিনি যখন সেটি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তার চোখ আটকে যায় এক অদ্ভুত দৃশ্যে। তিনি খেয়াল করলেন, ওই প্লেটে থাকা প্রতিটি চারাগাছের শেকড় পচে যাওয়া অংশটির দিকে না গিয়ে, অদ্ভুতভাবে ঠিক উল্টো দিকে বেঁকে গেছে! ঝাংয়ের বৈজ্ঞানিক মন তখনই সন্দেহ করে বসে। তিনি বুঝেছিলেন, এটি কোনোভাবেই কাকতালীয় হতে পারে না।
এর পেছনের সত্যটা বের করার জন্য তিনি এবং তাঁর সহকারীরা মিলে এক অদ্ভুত পরীক্ষার আয়োজন করলেন। তারা কিছু পাত্রে অ্যারাবিডোপসিস থ্যালিয়ানা (Arabidopsis thaliana) নামের এক ধরনের পরিচিত চারাগাছ লাগালেন। এরপর কিছু পাত্রের মাটির মাঝে মাঝে পচা আপেলের টুকরো গুঁজে দিলেন। ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! যে গাছগুলোর শেকড় ওই পচা আপেলের পচনশীল এলাকার কাছাকাছি গিয়েছিল, সেগুলো অবিলম্বে নিজেদের শেকড়ের গতিপথ বদলে ফেলে পচা আপেল থেকে দূরে সরে গেছে।
ইয়ুঝউ খেয়াল করলেন, ওই প্লেটে থাকা প্রতিটি চারাগাছের শেকড় পচে যাওয়া অংশটির দিকে না গিয়ে, অদ্ভুতভাবে ঠিক উল্টো দিকে বেঁকে গেছে! ঝাংয়ের বৈজ্ঞানিক মন তখনই সন্দেহ করে বসে।
অন্যদিকে যে পাত্রগুলোতে পচা আপেল ছিল না, সেগুলোর শেকড় একদম সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে। শুধু তা-ই নয়, টমেটো এবং গমের চারা নিয়ে পরীক্ষা করেও বিজ্ঞানীরা ঠিক একই রকম রোমাঞ্চকর ফলাফল পেয়েছেন।
তবে সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপারটি হলো, এই গাছগুলোর সামনে যখন কোনো প্রাণীর পচা টিস্যু রাখা হলো, তখন গাছগুলো মোটেও ভয় পেল না বা শেকড় বাঁকাল না! কিন্তু কেন এমনটা হয়?
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, পচা আপেল বা পচা গাছের অংশ থেকে যে জীবাণু বা প্যাথোজেন ছড়ায়, তা ওই জীবিত গাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। আমরা যেমন পচা বা বাসি খাবারের দুর্গন্ধ পেলেই নাক চেপে সেখান থেকে দূরে সরে যাই, গাছও ঠিক তেমনি নিজের প্রজাতির পচা অংশের রাসায়নিক সংকেত পেয়ে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সেখান থেকে পালাতে শুরু করে।
গাছের এই স্যাপ্রোট্রপিজম বা পচা অংশ এড়িয়ে চলার কৌশলটি কিন্তু প্রচলিত বিজ্ঞানের চেনা নিয়মে মোটেও কাজ করে না। গবেষক ঝাং খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, এটি গাছের চেনা কোনো পদ্ধতি নয়। আপনাকে একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলি। গাছ যখন আলোর দিকে বাঁকে বা মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচে যায়, তখন তারা অক্সিন নামের এক ধরনের হরমোন ব্যবহার করে। এই হরমোনটি গাছের শেকড় বা কাণ্ডের একদিকে জমে গিয়ে তার বৃদ্ধির দিক পরিবর্তন করে দেয়।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, পচা আপেল বা পচা গাছের অংশ থেকে যে জীবাণু বা প্যাথোজেন ছড়ায়, তা ওই জীবিত গাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
কিন্তু স্যাপ্রোট্রপিজমের ক্ষেত্রে অক্সিনের কোনো জায়গাই নেই! এখানে কলকাঠি নাড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি হরমোন, যার নাম অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (Abscisic Acid) বা সংক্ষেপে এবিএ। যখন গাছের শেকড় মাটির নিচে এমন কোনো জায়গায় পৌঁছায়, যা অন্যান্য মৃত গাছের পচনের কারণে অতিরিক্ত অম্লীয় হয়ে গেছে, তখন ওই হরমোনের আসল খেলা শুরু হয়। শেকড়ের যে দিকটা পচা অংশের দিকে থাকে, সেখানে হু হু করে এবিএ হরমোন জমতে থাকে। এই হরমোনটি তখন শেকড়কে নির্দেশ দেয় উল্টো দিকে বাড়তে শুরু করার জন্য। আর ঠিক এভাবেই শেকড়টি পচা এলাকা থেকে নিরাপদ মাটির দিকে এগোতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ওয়েসলিওন ইউনিভার্সিটির উদ্ভিদবিজ্ঞানী ক্রিস উলভারটন এই গবেষণায় সরাসরি যুক্ত না থাকলেও, তিনি এটিকে অসাধারণ কাজ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে তিনি একটি দারুণ প্রশ্নও ছুঁড়ে দিয়েছেন। আমরা তো জানি যে মৃত গাছপালা পচেই একসময় সার বা কম্পোস্টে পরিণত হয়, যা গাছের জন্য দারুণ পুষ্টিকর। তাহলে ঠিক কোন পর্যায় পর্যন্ত পচা অংশটি গাছের জন্য হুমকিস্বরূপ থাকে, আর কখন তা পুষ্টিকর সারে পরিণত হয়, তা নিয়ে এখনো বিশাল রহস্য রয়ে গেছে। গবেষক ঝাং এবং তাঁর দল ভবিষ্যতে এই রহস্যের জট খোলার অপেক্ষায় আছেন, যা হয়তো আমাদের চারপাশের নীরব প্রকৃতির এক অজানা ভাষা শিখতে সাহায্য করবে।