গাছ যখন রক্ত ঝরায়
ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপে প্রথমবার যে গেছে, সে ফিরে এসে দুটো কথাই বলে। এক, গাছটার চেহারা। দুই, কাটলে কী বের হয়।
চেহারাটা আসলেই অদ্ভুত—মাটি থেকে একটা মোটা কাণ্ড উঠে গেছে, তারপর হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়েছে চ্যাপটা সবুজ ছাদের মতো। যেন কেউ একটা বিশাল ব্রকলি পুঁতে রেখেছে মরুভূমিতে। কিন্তু আঘাত লাগলে যা বের হয়, সেটা দেখে থমকে যেতে হয়। গাঢ়, টকটকে লাল। ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে, ঠিক যেন কেটে গেলে মানুষের হাত থেকে যেভাবে রক্ত পড়ে। গাছটির নাম ড্রাগন ব্লাড ট্রি। বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena cinnabari। আর এই রক্তের পেছনে যে বিজ্ঞান আছে, সেটা কিংবদন্তির চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।
ফ্ল্যাভোনয়েড নিজে খুব পরিচিত একটা শ্রেণি—চায়ের রং, আপেলের হালকা তেতো স্বাদ, ব্লুবেরির গাঢ় রঙ—এসব পেছনে ফ্ল্যাভোনয়েডের হাত আছে। তবে ড্র্যাকোরোডিন এই দলে একটু আলাদা।
রক্ত নয়, রেজিন
গাছ থেকে যা বের হয় সেটা রক্ত তো নয়ই, এমনকি সাধারণ কষও না। এটা এক ধরনের রেজিন। উদ্ভিদজগতে রেজিন হলো একটি বিশেষ জৈব যৌগের মিশ্রণ, যা গাছ নিজেই তৈরি করে—মূলত বাইরের আক্রমণ সামলানোর জন্য। পোকামাকড়ের কামড়, প্রাণীর আঁচড়, বা যেকোনো শারীরিক ক্ষতির পর গাছের কোষপ্রাচীর ভাঙলে একটা সংকেত পাঠানো হয় বিশেষ কোষগুলোতে। এই কোষগুলোকে বলা হয় রেজিন ডাক্ট। সেগুলো সক্রিয় হয়ে ঘন তরল ঠেলে পাঠায় ক্ষতের দিকে। উদ্দেশ্য একটাই—জায়গাটা ঢেকে দাও, বাইরের সংক্রমণ আটকাও।
কাজটা অনেকটা আমাদের রক্তজমাট বাঁধার মতোই। কিন্তু রঙটা লাল কেন—সেটা আলাদা গল্প।
ড্র্যাকোরোডিন ও ড্র্যাকোরুবিন: লালের রসায়ন
রেজিনের রং নির্ধারণ করে মূলত দুটো যৌগ—ড্র্যাকোরুবিন এবং ড্র্যাকোরোডিন। দুটোই ফ্ল্যাভোনয়েড গোষ্ঠীর অন্তর্গত। ফ্ল্যাভোনয়েড নিজে খুব পরিচিত একটা শ্রেণি—চায়ের রং, আপেলের হালকা তেতো স্বাদ, ব্লুবেরির গাঢ় রঙ—এসব পেছনে ফ্ল্যাভোনয়েডের হাত আছে। তবে ড্র্যাকোরোডিন এই দলে একটু আলাদা। এটা অ্যান্থোসায়ানিন-সদৃশ একটি রঞ্জক, যার আণবিক গঠন এমন যে দৃশ্যমান আলোর লাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যটুকু প্রতিফলিত করে, বাকিটা শুষে নেয়। ফলে চোখে আসে শুধু সেই গাঢ় লাল।
মজার ব্যাপার হলো, গোটা রেজিনে এই রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ এক শতাংশেরও কম। এতটুকু উপাদান দিয়ে এত তীব্র রং—এটা রসায়নের একটা চমৎকার কারসাজি। বাকি রেজিনে থাকে সিনাবারোন, ট্রাইফ্ল্যাভোনয়েড, মেটাসাইক্লোফেন, চ্যালকোন, ডাইহাইড্রোচ্যালকোন, স্টেরল এবং টার্পেনয়েড—প্রত্যেকে আলাদা আলাদা কাজ করে গাছের ভেতরে।
পোকামাকড়ের কামড়, প্রাণীর আঁচড়, বা যেকোনো শারীরিক ক্ষতির পর গাছের কোষপ্রাচীর ভাঙলে একটা সংকেত পাঠানো হয় বিশেষ কোষগুলোতে। এই কোষগুলোকে বলা হয় রেজিন ডাক্ট।
বাতাসে শক্ত হয়ে যাওয়া: পলিমারাইজেশন
রেজিন বের হওয়ার পরের ঘটনাটা আরও আকর্ষণীয়। তরল অবস্থায় বের হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা জমে যায়, শক্ত হয়, চকচকে একটা আবরণ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটার নাম পলিমারাইজেশন। বাতাসের অক্সিজেন রেজিনের অণুগুলোর সঙ্গে বিক্রিয়া করে, অণুগুলো পরস্পরের হাত ধরে লম্বা শৃঙ্খল তৈরি করে এবং এই শৃঙ্খলই পুরো মিশ্রণটাকে কঠিন করে দেয়। ক্ষতস্থানে তৈরি হওয়া এই আবরণ ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাককে ভেতরে ঢুকতে দেয় না।
রেজিনের ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলোও অসাধারণ—এটি আর্দ্রতারোধী, যেকোনো পৃষ্ঠে শক্তভাবে আটকে যায় এবং রংটা এত স্থায়ী যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ এটাকে রং ও বার্নিশ হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে।
একটা অদ্ভুত উদ্ভিদতাত্ত্বিক রহস্য
Dracaena cinnabari উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে একটা ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ একবীজপত্রী উদ্ভিদে সেকেন্ডারি গ্রোথ হয় না, মানে কাণ্ড বয়সের সঙ্গে মোটা হয় না। কিন্তু এই গাছে হয়। এমনকি কাণ্ডের ভেতরে দ্বিবীজপত্রী গাছের মতো গ্রোথ রিং-ও তৈরি হয়—যা দেখে বয়স আন্দাজ করা যায়। কলাগাছ বা নারকেলগাছের মতো একবীজপত্রী উদ্ভিদে এটা থাকার কথা না। Dracaena কীভাবে এই পথে বিবর্তিত হলো, সেটা এখনও গবেষণার বিষয়।
Dracaena cinnabari উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে একটা ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ একবীজপত্রী উদ্ভিদে সেকেন্ডারি গ্রোথ হয় না, মানে কাণ্ড বয়সের সঙ্গে মোটা হয় না। কিন্তু এই গাছে হয়।
ওষুধের খনি
রসায়নটা না জেনেও হাজার বছর আগের মানুষ বুঝেছিল, এই লাল রস কাজে লাগে। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এটা ব্যবহার হয়েছে ত্বকের ক্ষত, দাঁতের আঘাত, চোখের সমস্যা, রক্ত সংবহনের গোলমাল, পেটের অসুখে। আধুনিক গবেষণা বলছে, অনুভূতিটা ভুল ছিল না। রেজিনে অ্যান্টিডায়ারিয়াল, অ্যান্টি-আলসার, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিটিউমার, প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট গুণ পাওয়া গেছে।
আর এই রেজিন শুধু ওষুধেই থামেনি। বিখ্যাত স্ট্র্যাডিভেরিয়াস বেহালায় বিশেষ রং ও ফিনিশ দিতে আঠারো শতকের ইতালীয় কারিগরেরা ড্রাগনস ব্লাড রেজিন ব্যবহার করতেন। প্রাচীন রোমে এটা ক্ষত সারানোর ওষুধ, মধ্যযুগীয় ইউরোপে রঙের উপাদান, আর চীনে কাঠের আসবাবে লাল বার্নিশ—একই জিনিস, এক গাছ থেকে, ভিন্ন সভ্যতার ভিন্ন হাতে।
চিন্তা যেখানে
এত কিছুর পরেও গাছটার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। ছাগলের অতিরিক্ত চারণে নতুন চারা জন্মাতে পারছে না, কচি গাছ বেঁচে থাকছে শুধু পাথুরে ঢালে—যেখানে ছাগলের পা পৌঁছায় না। জলবায়ু পরিবর্তনে সোকোত্রার বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাচ্ছে, যা গাছের প্রজননচক্রে আঘাত করছে।
লক্ষ বছরের বিবর্তনে এই গাছ একটা রাসায়নিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল—যা ক্ষত সারায়, শত্রু ঠেকায়, আর মানুষের হাতে ওষুধ-রং-সুর হয়ে ওঠে। সেই গাছ এখন মানুষের অসতর্কতায় কমছে। রক্ত ঝরানোর ক্ষমতা আছে, কিন্তু বাঁচার লড়াইটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।