গাছকে গান শোনালে কি সত্যিই গাছ দ্রুত বাড়ে
গাছের সঙ্গে কথা বললে বা গান শোনালে নাকি গাছ দ্রুত বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কথা হয়তো শুনেছেন। অনেকেই হয়তো শখ করে বারান্দার গাছের কাছে গুনগুনও করেন। কিন্তু বিজ্ঞান কি একে স্বীকৃতি দেয়? ক্যালিফোর্নিয়ার একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান বলছে, কেবল গান নয়, বিশেষ ধরনের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে রীতিমতো গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব! কোনো রকম জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা রাসায়নিক ছাড়াই কেবল শব্দ শুনিয়ে তারা ফসলের ফলন অভাবনীয় হারে বাড়িয়ে দেখিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান বলছে, কেবল গান নয়, বিশেষ ধরনের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে রীতিমতো গাছের বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব!
গাছ কীভাবে শোনে
প্রাণীদের মতো কান না থাকলেও গাছেরা চারপাশের পরিবেশের কম্পন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুঁয়োপোকা যখন পাতা খায়, সেই পাতা চিবানোর শব্দ বা কম্পন টের পেয়ে গাছেরা নিজেদের বাঁচাতে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করতে শুরু করে। এই ধারণা কাজে লাগিয়েছে হাইভিয়া নামে ওই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান।
তারা বায়োঅ্যাকোস্টিক কাল্টিভেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রোটোকল নামে একটি বিশেষ পদ্ধতি তৈরি করেছে। হাইভিয়ার প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেয়া অট-ডাহল জানান, ‘এটি কোনো সাধারণ মিউজিক বা শব্দের ঝলকানি নয়। এটি মূলত বিভিন্ন সাউন্ড এবং ফ্রিকোয়েন্সির একটি সুনির্দিষ্ট স্তর।’ এই শব্দ যেকোনো সাধারণ স্পিকার দিয়েই বাজানো যায় এবং এর মাত্রা থাকে ৮০ ডেসিবেলের নিচে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুঁয়োপোকা যখন পাতা খায়, সেই পাতা চিবানোর শব্দ বা কম্পন টের পেয়ে গাছেরা নিজেদের বাঁচাতে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করতে শুরু করে।
ফলন বাড়ার প্রমাণ
সম্প্রতি তারা বেল পেপার, সয়াবিনসহ সাতটি ভিন্ন প্রজাতির গাছের ওপর এই পরীক্ষা চালায়। ফলাফল ছিল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। একই জাতের গাছে ভিন্ন ভিন্ন বিসিসিপি প্রোটোকল ব্যবহার করে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে ফলন বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। আরেকটি পদ্ধতিতে ফলন ৫৯ শতাংশ বাড়ার পাশাপাশি গাছের বৃদ্ধির সময়কাল ১৪ শতাংশ কমে গেছে এবং পানির ব্যবহারও অনেক কম লেগেছে। একটি তামাকজাতীয় গাছের ওপর করা তৃতীয় পক্ষের একটি স্বাধীন পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই শব্দতরঙ্গ ব্যবহারের ফলে বিক্রয়যোগ্য ফলন বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ এবং পানি সাশ্রয় হয়েছে ৩৪ শতাংশ!
বয়স অনুযায়ী শব্দের পরিবর্তন
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এটি বীজ বোনার পর থেকে শুরু করে গাছের পুরো জীবনচক্র জুড়ে চলতে থাকে। গাছের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের ধরনও বদলাতে থাকে। আন্দ্রেয়া বলেন, ‘গাছের বৃদ্ধির কোন পর্যায়ে কী ধরনের ফলাফল দরকার, আমি ঠিক সেই ফ্রিকোয়েন্সিগুলোই বেছে নিয়েছি।’ যেমন, চারাগাছের সময় মূল লক্ষ্য থাকে শিকড় বাড়ানোর দিকে, আবার পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে লক্ষ্য থাকে বেশি কুঁড়ি বা ফলন আনার দিকে। এটিই তাদের প্রোটোকলকে অতীতের অন্যান্য সাধারণ শব্দ-পরীক্ষা থেকে আলাদা করেছে।
একটি তামাকজাতীয় গাছের ওপর করা তৃতীয় পক্ষের একটি স্বাধীন পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই শব্দতরঙ্গ ব্যবহারের ফলে বিক্রয়যোগ্য ফলন বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ এবং পানি সাশ্রয় হয়েছে ৩৪ শতাংশ!
বিজ্ঞানের পেছনের বিজ্ঞান
মানুষের কানের ভেতরে থাকা রোমকূপগুলো শব্দের কম্পনে বেঁকে যায়, ফলে ক্যালসিয়াম আয়ন কোষে প্রবেশ করে স্নায়ুতে সংকেত পাঠায়। আন্দ্রেয়ার মতে, গাছও ঠিক একইভাবে শব্দ শনাক্ত করতে পারে। শব্দের কম্পনের ফলে গাছের কোষের আয়ন চ্যানেলগুলো সাড়া দেয় এবং ক্যালসিয়াম বা পটাশিয়াম আয়ন কোষের ভেতরে-বাইরে যাওয়া আসা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের গবেষক সাইমন গিলরয় জানান, ‘গাছ যে শব্দে সাড়া দেয় তা বিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে ঠিক কোন জিনিসটা এই কম্পন শনাক্ত করে তাকে বায়োকেমিক্যাল সংকেতে রূপান্তর করে, তা এখনো বিজ্ঞানীদের অজানা।’
হাইভিয়ার এই গবেষণাপত্রটি এখনো পিয়ার-রিভিউ বা অন্য বিজ্ঞানীদের দিয়ে যাচাই করা হয়নি। গিলরয় মনে করেন, ‘এটি কীভাবে কাজ করছে তা নিয়ে আরও গবেষণার দরকার। হয়তো এই শব্দতরঙ্গ সরাসরি গাছকে নয়, বরং মাটিকে প্রভাবিত করছে!’
তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, এই পদ্ধতি যদি সত্যিই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়, তবে তা কৃষিক্ষেত্রে এক বিশাল বিপ্লব নিয়ে আসবে। গিলরয়ের ভাষায়, ‘কৃষিক্ষেত্রে ফলন ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানোও বিরাট ব্যাপার। আর এটি যদি সত্যিই কাজ করে, তবে তা হবে চরম উত্তেজনার একটি বিষয়!’