প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কৃষক কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন

২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশছবি: প্রথম আলো

ধানের খেত, সবজির খেত কিংবা ফলের বাগান; সবখানেই পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে এখন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ফসল রক্ষার এই রাসায়নিক উপাদানগুলো কৃষকের নিজেদের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৪৬ শতাংশ কৃষক ও কৃষিশ্রমিক অনিচ্ছাকৃতভাবে তীব্র কীটনাশক বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে কীটনাশকের ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। ১৯৭২ সালে দেশে বছরে প্রায় ৪ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। ২০২২ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার টনে! অর্থাৎ পাঁচ দশকে এর ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। সাম্প্রতিক সময়েও এই বৃদ্ধির হার বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ৩৯ হাজার ১৫৭ টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। ধান, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনেই এসব কীটনাশক সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে কীটনাশকের ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে
ছবি: মং হাই সিং মারমা

কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বাজারও বড় হচ্ছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে কীটনাশকের বাজারের আকার প্রায় ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল বাজারের বড় অংশই আবার আমদানিনির্ভর। দেশের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ কীটনাশকই বিদেশ থেকে আসে, যেখানে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের অংশ খুবই সামান্য।

এইসব কীটনাশক কৃষকের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক সময় কৃষকেরা জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের সময় মাস্ক, গ্লাভসের মতো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করেন না। ফলে জমিতে কীটনাশক ছিটানোর সময় তাঁরা সরাসরি এই বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন।

আরও পড়ুন
১৯৭২ সালে দেশে বছরে প্রায় ৪ হাজার টন কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। ২০২২ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার টনে! অর্থাৎ পাঁচ দশকে এর ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।

নতুন গবেষণায় কীটনাশকের প্রভাব

বাংলাদেশের এই বিপৎজনক চিত্রের সঙ্গে পুরো বিশ্বের পরিস্থিতিই মিলে যায়। ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাওয়া বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণা করা হয়েছে। এই গবেষণাটি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক নামে একটি আন্তর্জাতিক জোট। বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে এই জোট কাজ করে। এদের সঙ্গে যুক্ত আছে ৬০০-এরও বেশি এনজিও, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি।

গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, প্রতিবছর বিশ্বের কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ থেকে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে তীব্র কীটনাশক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন। বিশ্বে মোট কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৯৩ কোটি ৪০ লাখ ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিবছর প্রায় ৪৬ শতাংশ কৃষকই এই বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছেন! এখানে ‘তীব্র কীটনাশক বিষক্রিয়া’ বলতে কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার অল্প সময়ের মধ্যে দেখা দেওয়া যেকোনো অসুস্থতা বা শারীরিক সমস্যাকে বোঝানো হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটেছে আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায়। এরপরই রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকা। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি কৃষক ও কৃষিশ্রমিক কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোয়। সেখানকার প্রায় ৮৪ শতাংশ কৃষক ও কৃষিশ্রমিকই এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, প্রতিবছর বিশ্বের কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ থেকে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে তীব্র কীটনাশক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন।

গবেষণাটি সম্প্রতি ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রতিবছর কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় বিশ্বে আনুমানিক ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যুই ঘটে প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক জয়কুমার চেলাটন বলেন, ‘এই গবেষণা এমন এক সংকটের চিত্র সামনে এনেছে, যাকে আর উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।’ গবেষণাপত্রের লেখকেরা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, জাতিসংঘের একটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। ওই সুপারিশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় বিশ্বে আনুমানিক ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যুই ঘটে প্রতিবেশী দেশ ভারতে।

কমছে না কীটনাশকের ব্যবহার

বিশ্বজুড়ে কীটনাশকের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে বহু বছর ধরেই সতর্ক করা হচ্ছে। তারপরও এর ব্যবহার তো কমেইনি, বরং নিয়মিত হারে বেড়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৩৮ লাখ টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ!

পেস্টিসাইড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক ইউকের আন্তর্জাতিক কর্মসূচির প্রধান শিলা উইলিস বলেন, ‘এখন কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে হবে। কীটনাশকের কারণে কৃষকদের দুর্ভোগের যে বড় চিত্রটি এই গবেষণায় উঠে এসেছে, এরপর আর একমুহূর্ত দেরি করা উচিত নয়। কৃষকদের স্বাস্থ্য যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত রাখতে হবে।’

তবে এই গবেষণারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন, কৃষিতে কাজ করা প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ শিশুর কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি এতে বিবেচনা করা হয়নি। এ ছাড়া মানবদেহে কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও এই গবেষণায় বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়নি।

আরও পড়ুন
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৩৮ লাখ টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ!

কীভাবে বিষক্রিয়ার শিকার হন কৃষকেরা

কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা বিভিন্নভাবেই কীটনাশকের সংস্পর্শে আসেন। কীটনাশক প্রস্তুত ও জমিতে প্রয়োগ করার সময় তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এ ছাড়া কীটনাশক দেওয়া ফসল খালি হাতে ধরার সময়ও শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিক ঢুকতে পারে। এমনকি দূষিত কৃষিযন্ত্রপাতি বা পোশাক থেকেও কৃষকেরা কীটনাশকের সংস্পর্শে আসতে পারেন।

কীটনাশক প্রস্তুত ও জমিতে প্রয়োগ করার সময় কৃষকদের কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে
ছবি: আনিস মাহমুদ

কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়ার মধ্যেই আটকে নেই। দীর্ঘদিন কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকার সঙ্গে বিভিন্ন জটিল রোগের সম্পর্ক নিয়েও এখন গবেষণা চলছে। পারকিনসন্স ইউরোপের মহাপরিচালক হেলেন নিকোরার মতে, ‘পারকিনসন্স রোগের সঙ্গে পরিবেশগত কারণের সম্পর্ক থাকার পক্ষে এখন অনেক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। কীটনাশকের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে পারকিনসন্স রোগ হওয়ার সম্পর্কটিও ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’

আরও পড়ুন
নেদারল্যান্ডসের এক কৃষক রেন্ডার্ট আলগ্রাও মনে করেন, তাঁর পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে কৃষিকাজের সময় কীটনাশক ব্যবহারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

পারকিনসন্স হলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা একটি স্নায়বিক রোগ। এতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু অংশ ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে চলাফেরা ও শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশ্বজুড়েই পারকিনসন্স রোগের প্রকোপ বাড়ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি ইতিমধ্যে কৃষকদের ক্ষেত্রে পারকিনসন্সকে একটি পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের এক কৃষক রেন্ডার্ট আলগ্রাও মনে করেন, তাঁর পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে কৃষিকাজের সময় কীটনাশক ব্যবহারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বছরের শুরুতে ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ ইউরোপ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে তিনি নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। পরিবারের খামারে কাজ করার সময় বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁকেই জমিতে কীটনাশক ছিটানোর কাজ করতে হতো। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় এই দায়িত্ব তাঁর ওপরই পড়েছিল বলে জানান আলগ্রা।

আরও পড়ুন
বিশ্বজুড়েই পারকিনসন্স রোগের প্রকোপ বাড়ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি ইতিমধ্যে কৃষকদের ক্ষেত্রে পারকিনসন্সকে একটি পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে।

পুরো চিত্র কি জানা যাচ্ছে

কীটনাশকের বিষক্রিয়ার যে ভয়াবহ চিত্র নতুন এই গবেষণায় উঠে এসেছে, তা বেশ বড় হলেও পুরো চিত্রটি হয়তো এখনো আমাদের অজানা। গবেষকেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত করা গবেষণাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য। তারপরও কীটনাশকের বিষক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ তথ্য পাওয়া যায়, তা মোটেও যথেষ্ট নয়।

কোথায় কত মানুষ কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তা নিখুঁতভাবে জানার জন্য আরও নিবিড় অনুসন্ধান দরকার। গবেষণাপত্রের লেখকেরা তাই বিশ্বের সব দেশে একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির ব্যবস্থা চালুর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। এতে কীটনাশকের কারণে হওয়া বিষক্রিয়ার তথ্য আরও নির্ভরযোগ্য হবে।

প্রতিবছর কোটি কোটি কৃষক ফসল ফলাতে গিয়ে কীটনাশকের সংস্পর্শে আসছেন
ছবি: মং হাই সিং মারমা

একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতিও পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করা সহজ হবে। কারণ, প্রতিবছর কোটি কোটি কৃষক ফসল ফলাতে গিয়ে কীটনাশকের সংস্পর্শে আসছেন। তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজন অসুস্থ হচ্ছেন, কতজন দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ক্ষতির শিকার হচ্ছেন—তার পুরো চিত্র এখনো আমাদের সামনে নেই। এটি জানা গেলে হয়তো কৃষকদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

লেখক: আহমাদ মুদ্দাসসের, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও প্রথম আলো

আরও পড়ুন