যে ডিএনএ টেস্ট ভিলেন বানিয়ে দিয়েছিল একজন মাকে

ডিএনএ কখনো মিথ্যা বলে না। মুভি, সিরিয়াল বা গোয়েন্দা গল্পে কথাটা তুমি নিশ্চয়ই কখনো শুনেছ। খুনি ধরতে হবে, ডিএনএ টেস্ট করো। সন্তানের আসল বাবা-মা কে, ডিএনএ টেস্ট করো। আমরা ধরে নিই, ডিএনএ হলো পরিচয়ের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভুল প্রমাণ। এতে কোনো ভুল হতেই পারে না।

কিন্তু লিজ বার্নোর হিডেন গেস্টস বইয়ে এমন এক অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা তুলে ধরা  হয়েছে, যা শুনলে তোমার মাথা ঘুরে যাবে। এমন এক ঘটনা, যেখানে ডিএনএ টেস্টই একজন মাকে ভিলেন বানিয়ে দেয়। চলো আগে গল্পটা শুনি। 

লিজ বার্নোর লেখা বই হিডেন গেস্টস
ছবি: লাইভ সায়েন্স

লিডিয়ার বয়স তখন ২৬ বছর। একা হাতে দুই সন্তানকে বড় করছিলেন তিনি। সরকারি ভাতার জন্য আবেদন করলেন। নিয়মানুযায়ী তাঁকে একটা মাতৃত্বের পরীক্ষা দিতে হলো। কয়েক সপ্তাহ পর সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ডেকে পাঠানো হলো তাঁকে। অফিসাররা তাঁকে এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে লিডিয়া প্রথমে হেসেই ফেলেছিলেন। তাঁরা বললেন, ‘তুমি এই দুই বাচ্চার মা নও!’

লিডিয়া বুঝলেন, তাঁরা মোটেও মজা করছেন না। একজন সমাজকর্মী কড়া গলায় তাঁকে বললেন, ‘ডিএনএ ১০০ ভাগ নির্ভুল। এটা কখনো মিথ্যা বলে না। তাহলে তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?’

আরও পড়ুন
লিডিয়ার বয়স তখন ২৬ বছর। একা হাতে দুই সন্তানকে বড় করছিলেন তিনি। সরকারি ভাতার জন্য আবেদন করলেন। নিয়মানুযায়ী তাঁকে একটা মাতৃত্বের পরীক্ষা দিতে হলো।

ভাবো তো একবার লিডিয়ার অবস্থা! যে বাচ্চাদের সে নিজের পেটে ধরেছে, জন্ম দিয়েছে, সেই বাচ্চাদের নাকি সে মা নয়! রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা তদন্তে নেমে পড়লেন। প্রথমে সন্দেহ হলো, লিডিয়া হয়তো ভাতার টাকা হাতানোর জন্য অন্য কারও বাচ্চা চুরি করে এনেছে। লিডিয়া তাঁর গর্ভাবস্থার ছবি দেখালেন। তাঁর মা, বাচ্চাদের বাবা, এমনকি যে ডাক্তারের হাতে বাচ্চাদের জন্ম হয়েছে, সবাই সাক্ষ্য দিলেন। কিন্তু আইন তো আর মুখের কথা শোনে না, সে শোনে ডিএনএর কথা।

লিডিয়া কি তবে সারোগেট বা ভাড়ায় খাটা মা ছিলেন? অন্যের বাচ্চা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন? একের পর এক আদালতে শুনানি হতে লাগল। লিডিয়া ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন। তাঁর মনে হতে লাগল, যেকোনো দিন হয়তো পুলিশ এসে তাঁর সন্তানদের কেড়ে নেবে।

তিনি শহরের বড় বড় আইনজীবীকে ফোন করলেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা বিশ্বাস করল না। করবেই বা কীভাবে? একদিকে একজন সাধারণ মানুষের মুখের কথা, অন্যদিকে অকাট্য ডিএনএ টেস্ট। সবাই ডিএনএর পক্ষেই দাঁড়াল। লিডিয়া একা হয়ে গেলেন।

ঘটনার সময় লিডিয়া তৃতীয়বারের মতো গর্ভবতী ছিলেন। বিচারক নির্দেশ দিলেন, বাচ্চা জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই অপারেশন থিয়েটারে মা এবং বাচ্চার ডিএনএ টেস্ট করতে হবে। বাচ্চা জন্ম নিল। সঙ্গে সঙ্গে টেস্ট হলো। এরপর যে রেজাল্ট এল, তা দেখে ডাক্তার ও বিচারকদের চোখ ছানাবড়া! লিডিয়ার গর্ভ থেকে এইমাত্র যে বাচ্চাটি বের হলো, জেনেটিক্যালি বা ডিএনএর হিসাবে সেই বাচ্চাও নাকি লিডিয়ার নয়! এও কি সম্ভব?

আরও পড়ুন
লিডিয়া তাঁর গর্ভাবস্থার ছবি দেখালেন। তাঁর মা, বাচ্চাদের বাবা, এমনকি যে ডাক্তারের হাতে বাচ্চাদের জন্ম হয়েছে, সবাই সাক্ষ্য দিলেন। কিন্তু আইন তো আর মুখের কথা শোনে না, সে শোনে ডিএনএর কথা।

অবশেষে অ্যালান টিন্ডেল নামে একজন আইনজীবী লিডিয়াকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তিনি বোস্টনের একদল গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁরা এর আগে কারেন কিগান নামে এক নারীর শরীরে এমন এক অদ্ভুত ঘটনার প্রমাণ পেয়েছিলেন।

গবেষকেরা লিডিয়ার রক্ত পরীক্ষা করলেন। কোনো লাভ হলো না। রক্তের ডিএনএ বাচ্চাদের ডিএনএর সঙ্গে মিলল না। এরপর তাঁরা লিডিয়ার ত্বক, চুল ও গালের ভেতর থেকে কোষ নিলেন। নাহ! কোথাও কোনো মিল নেই। অবশেষে তাঁরা লিডিয়ার জরায়ুমুখ থেকে নিলেন কোষের নমুনা। আর সেখানেই লুকিয়ে ছিল আসল রহস্য!

জরায়ুমুখের ওই কোষগুলোর ডিএনএ লিডিয়ার শরীরের অন্যান্য অংশের ডিএনএ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা! আর এই নতুন ডিএনএই লিডিয়ার বাচ্চাদের ডিএনএর সঙ্গে হুবহু মিলে গেল!

কিন্তু একজন মানুষের শরীরে দুই রকম ডিএনএ এল কোথা থেকে?

বিজ্ঞানীরা জানালেন, এর কারণ হলো হারিয়ে যাওয়া যমজ। লিডিয়া যখন তাঁর মায়ের গর্ভে ছিলেন, তখন তিনি একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে তাঁর একজন যমজ বোনও ছিল। কিন্তু জন্মের অনেক আগেই মাতৃগর্ভে লিডিয়ার ভ্রূণটি তাঁর যমজ বোনের ভ্রূণটিকে নিজের ভেতরে শুষে নেয়। দুটি ভ্রূণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

ফলে লিডিয়া জন্ম নেন একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু তাঁর শরীরের ভেতরে থেকে যায় দুজনের ডিএনএ! তাঁর রক্তের ডিএনএ এক রকম, আবার জরায়ুর ডিএনএ আরেক রকম। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে মাইক্রোকাইমেরিজম। 

আরও পড়ুন
গবেষকেরা লিডিয়ার রক্ত পরীক্ষা করলেন। কোনো লাভ হলো না। রক্তের ডিএনএ বাচ্চাদের ডিএনএর সঙ্গে মিলল না। এরপর তাঁরা লিডিয়ার ত্বক, চুল ও গালের ভেতর থেকে কোষ নিলেন।

অর্থাৎ, লিডিয়ার সন্তানেরা জেনেটিক্যালি তাঁর অদৃশ্য যমজ বোনের সন্তান! যদিও সেই অদৃশ্য বোন জন্মগ্রহণই করেনি!

লিডিয়াই কি একমাত্র উদাহরণ? মোটেও না। আমেরিকায় একজন বাবা তাঁর সন্তানের পিতৃত্বের পরীক্ষা করিয়েছিলেন। বাচ্চাটির জন্ম হয়েছিল আইভিএফ পদ্ধতিতে, মানে ল্যাবে। টেস্টের রেজাল্ট দেখে ওই ব্যক্তির মাথায় হাত, তিনি বাচ্চার বাবা নন! তিনি ভাবলেন, ক্লিনিক হয়তো ভুল করে অন্য কারও শুক্রাণু ব্যবহার করেছে। তিনি ক্লিনিকের নামে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

কিন্তু আরও সূক্ষ্ম পরীক্ষার পর এক অদ্ভুত তথ্য বেরিয়ে এল। ওই ব্যক্তি বাচ্চার বাবা না হলেও বাচ্চার ডিএনএর সঙ্গে তাঁর ২৫ শতাংশ মিল আছে। জেনেটিক্যালি তিনি বাচ্চাটির চাচা! কীভাবে? ওই ব্যক্তির শুক্রাণুর ১০ শতাংশের মধ্যে তাঁর হারিয়ে যাওয়া যমজ ভাইয়ের ডিএনএ ছিল। অর্থাৎ, যে যমজ ভাই কোনোদিন পৃথিবীতেই জন্ম নেয়নি, সেই অদৃশ্য ভাই-ই হলো বাচ্চাটির আসল বায়োলজিক্যাল বাবা!

ডিএনএ টেস্টকে আমরা শতভাগ নিখুঁত ভাবি, প্রকৃতির খেয়ালে সেটাও মাঝেমধ্যে আমাদের বোকা বানিয়ে দিতে পারে!
ছবি: ওয়েস্টএন্ড ৬১ / গেটি ইমেজ

আমরা ছোটবেলা থেকে বইয়ে পড়েছি, ‘একজন মানুষ, একটাই ডিএনএ’। কিন্তু মাইক্রোকাইমেরিজমের এই ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতি কতটা জটিল। আমাদের শরীর নামের এই অদ্ভুত যন্ত্রটার খুব সামান্যই আমরা এখনো জানতে পেরেছি। যেকোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণকেই আমরা চোখ বন্ধ করে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিই। কিন্তু বিজ্ঞান সব সময় নিজেকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ রাখে। 

লিডিয়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধবিশ্বাস বিজ্ঞানের স্বভাব নয়। যে ডিএনএ টেস্টকে আমরা শতভাগ নিখুঁত ভাবি, প্রকৃতির খেয়ালে সেটাও মাঝেমধ্যে আমাদের বোকা বানিয়ে দিতে পারে!

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন