নীরব মহামারি খোসপাঁচড়া
‘শত্রুর জন্যও কেউ এই রোগ কামনা করে না’— কথাটা মোটেও বাড়িয়ে বলা নয়। কারণ এক অতিক্ষুদ্র মাইট। এগুলো খালি চোখে দেখাই যায় না। নাম সারকোপটিস স্ক্যাবিয়াই (Sarcoptes scabiei)। মাইক্রোস্কোপের নিচে ধরলে দেখা যায় সাদা রঙের, গোলগাল শরীরের ৮টি পা-ওয়ালা এক অদ্ভুত জীব। এরা আমাদের চামড়ার নিচে ঢুকে পড়ে এবং প্রতিদিন প্রায় ০.৫ থেকে ৫ মিলিমিটার হারে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সামনে এগোয়।
সেখানে স্ত্রী মাইট ডিম পাড়ে। তিন-চার দিনের মধ্যেই সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। শরীরে আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে এই মাইট মানুষকে উপহার দেয় অসহনীয় চুলকানি, নিদ্রাহীন রাত ও মানসিক বিপর্যয়। এই রোগের নাম স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া। শুনতে মধ্যযুগীয় মনে হলেও এটি আজকের ব্রিটেন ও এশিয়া মহাদেশে এক নীরব স্বাস্থ্যসংকটে রূপ নিচ্ছে। তবে এটি পোষা প্রাণী থেকে ছড়ায় না। কারণ পশুর মাইট মানুষের শরীরে বাঁচতে পারে না।
স্ক্যাবিসের বেশ কিছু রূপ রয়েছে। সাধারণ স্ক্যাবিসে যেখানে শরীরে গড়ে ১০–১৫টি মাইট থাকে, সেখানে নরওয়েজিয়ান স্ক্যাবিসে থাকতে পারে লাখ লাখ মাইট! যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়। এতে ত্বকের বড় অংশ জুড়ে মোটা, খোসার মতো স্তর তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং চিকিৎসাও বেশ কঠিন। অন্যদিকে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায় নডিউলার স্ক্যাবিস। এতে কুঁচকি, বগল বা গোপনাঙ্গে এমনকি নখের নিচেও গাঁটের মতো ফুসকুড়ি হয়।
শরীরে আশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে এই মাইট মানুষকে উপহার দেয় অসহনীয় চুলকানি, নিদ্রাহীন রাত ও মানসিক বিপর্যয়। এই রোগের নাম স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হয়। এটি মানুষকে মানসিকভাবেও ভেঙে দেয়। ত্বকে ছোট ছোট দাগ ও লালচে ফুসকুড়ি থেকে শুরু হয় চুলকানি। রাতে এই চুলকানি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দেয়। মানুষ চুলকাতে চুলকাতে রক্ত বের করে ফেলে, বিছানার চাদর ছেয়ে যায় রক্তের দাগে। সঙ্গে যুক্ত হয় অদৃশ্য আতঙ্ক, এই বুঝি চুলকানি আবার ফিরল!
স্ক্যাবিস শরীরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষণ দেখায় না। মাইট শরীরে বাসা বাঁধার পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় নেয় চার থেকে ছয় সপ্তাহ। এই সুপ্ত সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সংক্রামক থাকেন। তিনি ঘুণাক্ষরেও জানেন না, তাঁর শরীরে কী বাসা বেঁধেছে। ফলে পরিবার, সঙ্গী ও বন্ধুদের মধ্যে অজান্তেই ছড়িয়ে দেন স্ক্যাবিসের বংশধর। চুলকানি যখন শুরু হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
শুরুতে অনেকে ভাবেন এটা হয়তো অ্যালার্জি বা একজিমা। কেউ কেউ লজ্জার কারণে ডাক্তারের কাছে যেতে দেরি করেন। আমাদের সমাজে ভুল ধারণা আছে যে এটি নোংরা মানুষের রোগ। বাস্তবে পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে স্ক্যাবিসের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ এই লজ্জা আর ভুল ধারণাই রোগটি ছড়ানোর বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লুকিয়ে রাখা রোগ চিকিৎসা পায় না, ফলে তা ছড়াতেই থাকে।
ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশেও করোনা-পরবর্তী সময়ে স্ক্যাবিস মহামারির রূপ নিয়েছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা হোস্টেলে সংক্রমণ বেশি। বিশেষ করে ২০ থেকে ২৪ বছরের তরুণদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।
স্ক্যাবিস শরীরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষণ দেখায় না। মাইট শরীরে বাসা বাঁধার পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় নেয় চার থেকে ছয় সপ্তাহ। এই সুপ্ত সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সংক্রামক থাকেন।
তাত্ত্বিকভাবে চিকিৎসা সহজ মনে হলেও বাস্তবে তা কঠিন। সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা হলো পারমেথ্রিন ক্রিম (বাংলাদেশে স্ক্যাবেক্স), যা পুরো শরীরে মেখে ৮-১২ ঘণ্টা রেখে ধুয়ে ফেলতে হয় এবং এক সপ্তাহ পর আবার ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হলো রোগীর সংস্পর্শে আসা সবাইকে একই সময়ে চিকিৎসা নিতে হয়। স্পর্শে আসা একজনও যদি বাদ যায় বা ক্রিম ঠিকভাবে না লাগায়, তবে সুস্থ হওয়ার পর রোগীর শরীরে আবার মাইট ফিরে আসে। একেই বলা হয় পিং-পং সংক্রমণ।
চিকিৎসা এর একমাত্র পথ নয়, এর সঙ্গে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ, পরিচ্ছন্নতার যুদ্ধ। কাপড়, বিছানার চাদর, তোয়ালেসহ সবকিছু ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ধুতে হয়। জুতা, ঘড়ি, খেলনার মতো যেসব জিনিস ধোয়া যায় না, সেগুলো তিন দিনের জন্য পলিথিনে বাতাস-বদ্ধ করে রাখতে হয়, যাতে মাইট মারা যায়। এই ধোয়ামোছার কাজ শারীরিক ও আর্থিকভাবে মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়।
চিকিৎসার পরেও অনেক সময় চুলকানি থেকে যায়। একে বলে পোস্ট-স্ক্যাবিস ইচ। এমনটা হলে অনেকেই ভাবেন চিকিৎসা কাজ করছে না এবং হতাশ হয়ে পড়েন। এই অনিশ্চয়তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
স্ক্যাবিস রোগীর সংস্পর্শে আসা একজনও যদি বাদ যায় বা ক্রিম ঠিকভাবে না লাগায়, তবে সুস্থ হওয়ার পর রোগীর শরীরে আবার মাইট ফিরে আসে। একেই বলা হয় পিং-পং সংক্রমণ।
স্ক্যাবিস বেড়ে যাওয়ার সঠিক কারণ নিয়ে ডাক্তাররাও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। কেউ দুষছেন করোনা-টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তনকে, আবার কেউ বলছেন মাইটরা পারমেথ্রিন ক্রিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আসল সমস্যা হলো সঠিক নিয়মে ক্রিম না লাগানো এবং সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসার আওতায় আনতে না পারা।
স্ক্যাবিস যৌনবাহিত রোগ নয়, কিন্তু ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ছড়ায় বলে অনেক সময় যৌন চিকিৎসকের কাছে রোগটি ধরা পড়ে। সেখানেও অনেক চিকিৎসক একে নিজের জগৎ মনে করেন না। ফলে আক্রান্তদের মধ্যে এক ধরনের পরিত্যক্ত বোধ তৈরি হয়। সব মিলিয়ে স্ক্যাবিস এখন শুধু ত্বকের রোগ নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকট। লজ্জা ও ভুল ধারণা ঝেড়ে ফেলে সমন্বিত উদ্যোগ নিলেই কেবল এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।