অহেতুক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি, ভালো ঘুমের বৈজ্ঞানিক উপায়
সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে রাতে বিছানায় যাওয়ার পরও দুই চোখের পাতা অনেক সময় এক হতে চায় না। চোখ বন্ধ করলেই মাথায় একের পর এক চিন্তা এসে হানা দেয়। অতীত ও ভবিষ্যতের নানা হিসাব-নিকাশ ঘুরপাক খেতে থাকে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এভাবে বারবার একই ধরনের নেতিবাচক বা উদ্বেগজনক চিন্তা ঘুরপাক খাওয়াকে বলা হয় রিউমিনেশন। দিনের বেলার মানসিক চাপ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ বা অকারণ দুশ্চিন্তার কারণে মস্তিষ্ক কিছুতেই শান্ত হতে পারে না। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বাধাগ্রস্ত হয়। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই অনিদ্রা সমস্যায় ভোগেন।
দিনের বেলার মানসিক চাপ, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ বা অকারণ দুশ্চিন্তার কারণে মস্তিষ্ক কিছুতেই শান্ত হতে পারে না। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বাধাগ্রস্ত হয়।
কেন আমাদের ঘুম আসে না
আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো কারণে উদ্বেগ বা চাপের সংকেত পায়, তখন এটি ফাইট অর ফ্লাইট মোডে চলে যায়। এ সময় শরীরে কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা আমাদের সজাগ রাখে। যতক্ষণ মস্তিষ্ক মনে করে যে কোনো অমীমাংসিত সমস্যা বা বিপদের আশঙ্কা রয়েছে, ততক্ষণ সে শরীরকে ঘুমাতে দেয় না। অতিরিক্ত স্পর্শকাতর ও বেশি চিন্তাশীল মানুষেরা সাধারণত অন্যদের তুলনায় এই সমস্যায় বেশি ভোগেন।
অনিদ্রা কমানোর বৈজ্ঞানিক কৌশল
ঘুম না আসার এই দুষ্টচক্র ভাঙার জন্য কানাডার সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ সায়েন্সের অধ্যাপক ও গবেষক লুক ব্যুডোইন একটি দারুণ মানসিক কৌশল প্রস্তাব করেছেন। এর নাম কগনিটিভ শাফল। এটি মূলত এমন একটি মানসিক ব্যায়াম, যা মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে এলোমেলো চিন্তার দিকে নিয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে।
সাধারণত আমরা যখন ঘুমের গভীরে তলিয়ে যেতে থাকি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে পরপর অনেকগুলো অর্থহীন ও এলোমেলো ছবি বা চিন্তা আসতে থাকে। কগনিটিভ শাফল মূলত সেই এলোমেলো অবস্থাকেই কৃত্রিমভাবে তৈরি করে মস্তিষ্ককে এই সংকেত দেয় যে—‘এখন চারপাশ শান্ত, কোনো বিপদ নেই, ঘুমানো নিরাপদ।’
আমাদের মস্তিষ্ক যখন কোনো কারণে উদ্বেগ বা চাপের সংকেত পায়, তখন এটি ফাইট অর ফ্লাইট মোডে চলে যায়। এ সময় শরীরে কর্টিসল নামে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা আমাদের সজাগ রাখে।
কীভাবে করবেন এই কগনিটিভ শাফল
এই কৌশলটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত সহজ। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।
১. প্রথমে একটি সহজ ও সাধারণ শব্দ ভাবুন। তবে খেয়াল রাখবেন, শব্দটি যেন এমন কিছু না হয় যা আপনার মনে কোনো চাপ তৈরি করে। যেমন শব্দটি হতে পারে পাখি বা কমলা।
২. এবার সেই শব্দটির প্রতিটি অক্ষর মনে মনে বানান করুন।
৩. শব্দের প্রথম অক্ষর দিয়ে শুরু হয়, এমন নতুন কিছু জিনিসের কথা কল্পনা করুন। যেমন পাখি শব্দের ‘প’ দিয়ে হতে পারে পাতা, পাহাড়, পানি, পেঁচা, পাতিল ইত্যাদি।
৪. এই প্রতিটি জিনিসকে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড ধরে মনের পর্দায় গভীরভাবে কল্পনা করুন। এরপর পরবর্তী শব্দে যান।
৫. প্রথম অক্ষরের জিনিসগুলো শেষ হলে বা আর কিছু মনে না পড়লে মূল শব্দের দ্বিতীয় অক্ষরে চলে যান এবং একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন। যেমন ‘খ’ দিয়ে খাতা, খেলনা, খড় ইত্যাদি ভাবুন এবং ৫ সেকেন্ড করে কল্পনা করুন।
এই পদ্ধতিটি মস্তিষ্ককে অহেতুক ও নেতিবাচক চিন্তার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে। এক চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন আরেক চিন্তায় লাফ দেওয়ার ফলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যায়, উদ্বেগ কমে আসে এবং ধীরে ধীরে গভীর ঘুম চলে আসে।
প্রথমে একটি সহজ ও সাধারণ শব্দ ভাবুন। তবে খেয়াল রাখবেন, শব্দটি যেন এমন কিছু না হয় যা আপনার মনে কোনো চাপ তৈরি করে। যেমন শব্দটি হতে পারে পাখি বা কমলা।
ভালো ঘুমের জন্য আরও কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস
শুধু মানসিক কৌশলই নয়, ভালো ঘুমের জন্য দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস মেনে চলাও খুব জরুরি:
স্ক্রিন টাইম কমানো: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির পর্দা থেকে দূরে থাকুন। এসব পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো মস্তিষ্কের মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) নিঃসরণে বাধা দেয়।
ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা: সূর্য ডোবার পর চা, কফি বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান থেকে বিরত থাকুন। এগুলো মস্তিষ্ককে দীর্ঘক্ষণ সজাগ রাখে।
নিয়মিত ঘুমের রুটিন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। এতে শরীরের নিজস্ব বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক থাকে।
খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম: দিনের বেলা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করলে রাতে গভীর ঘুম হয়। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম করা উচিত নয়। এ ছাড়া রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে খেয়ে নেওয়া ভালো। ভারী বা অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
ঘুমানোর আগে শিথিলতা: ঘুমানোর আগে মানসিক চাপ কমাতে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করতে পারেন। বই পড়া, মৃদু সুরের গান শোনা বা ধ্যান করা মস্তিষ্ককে শান্ত করতে সাহায্য করে। ঘুমের পরিবেশ হতে হবে শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক। ঘরের তাপমাত্রা সামান্য ঠান্ডা রাখলে ঘুম ভালো হয়।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। এতে শরীরের নিজস্ব বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক থাকে।
শেষ কথা
অনিদ্রা কোনো স্থায়ী রোগ নয়, বরং এটি অনেক সময় আমাদের অনিয়ন্ত্রিত চিন্তার ফল। মস্তিষ্ককে শান্ত করার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই আজ রাতে ঘুম না এলে এপাশ-ওপাশ না করে চোখ বন্ধ করে কগনিটিভ শাফল কৌশলটি প্রয়োগ করে দেখতে পারেন। একটু সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই পারে আপনাকে একটি সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম উপহার দিতে।