৪১৫ মিলিয়ন বছর আগের জীবাশ্মে মিলল বিশ্বের বৃহত্তম বিচ্ছুর খোঁজ
জাদুঘরে অনেক সময় এমন কিছু প্রাচীন নমুনা বা জীবাশ্ম থাকে, যেগুলোর আসল পরিচয় সহজে জানা যায় না। প্রতিটি প্রদর্শনীর পাশে তথ্য দেওয়া থাকলেও, অনেক নমুনা আবিষ্কারের বহু বছর পরও বিজ্ঞানীদের কাছে সেটা নিয়ে তেমন কোনো তথ্য থাকে না। কোনো কোনো নমুনার সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে গবেষকদের কয়েক দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিচ্ছুর জীবাশ্মটি আবিষ্কার ও তা শনাক্ত করার গল্পটি ঠিক তেমনই।
বিশ্বের বৃহত্তম বিচ্ছুর খোঁজ নিয়ে নতুন গবেষণাটি প্যালিওন্টোলজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন এই গবেষণা থেকে জানা গেছে, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই বিশাল প্রাণীটির নাম ছিল প্রেআর্কটুরাস গিগাস (Praearcturus gigas)। ১৮৭১ সালে যখন প্রথম এর সন্ধান মেলে, তখন বিজ্ঞানীরা এটিকে বিটল বা ক্রাস্টেশিয়ান গোত্রের কোনো জীব বলে মনে করেছিলেন। প্রায় ৪১৫ মিলিয়ন বছর পুরোনো হওয়ায় এই প্রাণীর জীবাশ্মগুলো ছিল ভাঙাচোরা ও খণ্ডিত। ফলে এটি দেখতে কেমন ছিল বা কীভাবে বেঁচে থাকত, তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন ছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রাণীর আরও কিছু ভালো মানের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যায়। তা দেখে বিজ্ঞানীরা প্রাণীটিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। একদল গবেষক এক্সরে টমোগ্রাফির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রাচীন জীবাশ্মটি পরীক্ষা করেন। সেখান থেকে শরীরের গঠনকে অন্যান্য বিলুপ্ত ও বর্তমান প্রাণীদের সঙ্গে তুলনা করে দেখেন।
১৮৭১ সালে যখন প্রথম প্রেআর্কটুরাস গিগাসের সন্ধান মেলে, তখন বিজ্ঞানীরা এটিকে বিটল বা ক্রাস্টেশিয়ান গোত্রের কোনো জীব বলে মনে করেছিলেন।
পরীক্ষায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসে, যা কেবল বিচ্ছুর শরীরেই থাকা সম্ভব। এর ছিল বিশাল দুটি চিমটা বা আঁকশি, যার একটি নাড়ানো যেত। এটি ছিল প্রায় ৭৬ মিলিমিটার লম্বা। এছাড়া এর শরীরে এমন একটি বিশেষ অংশ ছিল, যা বর্তমানে টিকে থাকা বিচ্ছুরা শিকারীদের ভয় দেখাতে নিজেদের শরীরের সঙ্গে ঘষে এক ধরনের আওয়াজ তৈরি করে। এমনকি এর বুকের হাড়ের গঠনও সিলুরিয়ান যুগের এক প্রাচীন বিচ্ছুর হাড়ের গঠনের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
তবে এই বিচ্ছুটির শরীরের গঠনে এমন কিছু অংশ ছিল, যা সাধারণ বিচ্ছুদের মধ্যে দেখা যায় না। এর পেটের দুই পাশে ডানার মতো বাড়তি কিছু অংশ ছড়ানো ছিল। সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিচ্ছুটি ছিল প্রায় এক মিটার লম্বা। বিশাল চিমটাসদৃশ অঙ্গটি একে সেই সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শিকারী প্রাণীতে পরিণত করেছিল।
কিন্তু বিচ্ছুটি কি আসলেই যুগের সেরা শিকারী ছিল? আর এত বড় শরীর নিয়ে এটি কী খেয়ে বেঁচে থাকত? লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞ ও এই গবেষণার লেখক রিচি হাওয়ার্ড জানান, সেটাই এই গল্পের সবচেয়ে রহস্যময় অংশ। আমরা সাধারণত জানি বিচ্ছুরা ডাঙায় বাস করে। আর মাটিতেই শিকার ধরে। কিন্তু এই দানব বিচ্ছুটি সেই সময়ের ডাঙায় বাস করা অন্য যেকোনো পোকা বা জীবের চেয়ে প্রায় দশগুণ বড় ছিল।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিচ্ছুটি ছিল প্রায় এক মিটার লম্বা। বিশাল চিমটাসদৃশ অঙ্গটি একে সেই সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শিকারী প্রাণীতে পরিণত করেছিল।
বিচ্ছুটি যদি শুধুই ডাঙায় বাস করত, তাহলে সেই সময়ের ছোট ছোট পোকা খেয়ে এত বড় শরীর টিকিয়ে রাখা এর পক্ষে অসম্ভব ছিল। তবে এমনও হতে পারে যে সেই যুগে ডাঙায় অন্য কোনো বিশাল আকৃতির পোকাও বাস করত, যার জীবাশ্ম বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে পাননি।
সেই সময়ের পরিবেশের কথা চিন্তা করে গবেষকেরা ধারণা করছেন, বিচ্ছুটি আসলে পানি ও স্থল উভয় জায়গাতেই বাস করত। উভচর হওয়ায় এটি পানির নিচের আদিম বর্মযুক্ত মাছ ও অন্যান্য বড় আকারের পোকাও শিকার করতে পারত। এক মিটার লম্বা এই দানব শিকারীর পেট ভরানোর জন্য এমন বড় খাবারই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত।
সেই যুগে পানিতে অন্যান্য বড় শিকারী প্রাণী থাকলেও, এই জীবাশ্মটি যে স্তর থেকে পাওয়া গেছে সেখানে প্রিয়ার্কটুরাসই ছিল সবচেয়ে বড় জীব। তাই একে সেই সময়ের সেরা শিকারী বলা যেতেই পারে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন একটি শক্তিশালী ও দানবীয় প্রাণীর জীবাশ্ম প্রায় ১৫০ বছর ধরে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহশালায় সবার চোখের সামনে পড়ে ছিল। এত দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর, উন্নত প্রযুক্তি ও নতুন কিছু জীবাশ্মের প্রমাণের সহায়তায় বিজ্ঞানীরা অবশেষে নিশ্চিত হতে পেরেছেন, এই ধরনের বিচ্ছু পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
সেই যুগে পানিতে অন্যান্য বড় শিকারী প্রাণী থাকলেও, এই জীবাশ্মটি যে স্তর থেকে পাওয়া গেছে সেখানে প্রিয়ার্কটুরাসই ছিল সবচেয়ে বড় জীব। তাই একে সেই সময়ের সেরা শিকারী বলা যেতেই পারে।
এতদিন পর্যন্ত পৃথিবীতে যত বিচ্ছুর সন্ধান মিলেছে, তার মধ্যে প্রিয়ার্কটুরাসই সবচেয়ে বড়। এই আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হলো, পৃথিবীতে বিশাল আকৃতির পোকাদের রাজত্ব বিজ্ঞানীদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক আগে শুরু হয়েছিল। যেমন, একটা গাড়ির সমান বড় আর্থ্রোপ্লিউরা নামের এক দানব পোকার চেয়েও প্রায় ৫ কোটি বছর আগে এই বিচ্ছুর জন্ম হয়েছিল।