হাঁচি চেপে রাখা কি আসলেই বিপজ্জনক
হাঁচি চেপে রাখলে চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে, এমন কথা আমরা অনেকেই কমবেশি শুনেছি। চুইংগাম গিলে ফেললে হজম হতে সাত বছর সময় লাগে গল্পের মতোই এটা একটা বানিয়ে বলা কথা!
অনেকেই বড় হওয়ার পর লোকলজ্জার ভয়ে বা আশপাশের মানুষকে জীবাণু থেকে বাঁচাতে হাত বা রুমাল দিয়ে চেপে হাঁচি বন্ধ করার চেষ্টা করেন। আবার যখন হাঁচি আটকানো যায় না, তখন কনুইয়ের ভাঁজে নাক-মুখ গুঁজে হাঁচি দেওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। তবে চোখ বেরিয়ে না গেলেও জোর করে হাঁচি চেপে রাখা শরীরের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষক কিন লিউ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, হাঁচি আমাদের শ্বাসনালির একটি জরুরি ও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাতাস ও জীবাণুকে ফুসফুস থেকে তীব্র বেগে বের করে দেওয়ার জন্য শরীর এই ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু যখন আমরা জোর করে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিকে আটকে দিই, তখন সেই তীব্র বাতাসের চাপ শরীরের ভেতরেই উল্টো আঘাত হানতে পারে। এতে শরীরের ভেতরের নরম টিস্যু বা রক্তনালির বড় ক্ষতি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
গবেষক কিন লিউ জানান, হাঁচি আমাদের শ্বাসনালির একটি জরুরি ও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাতাস ও জীবাণুকে ফুসফুস থেকে তীব্র বেগে বের করে দেওয়ার জন্য শরীর এই ব্যবস্থা নেয়।
হাঁচি আটকে দিলে কী ক্ষতি হয়
হাঁচির মূল কাজ ফুসফুসের বাতাস ও ময়লা বাইরে বের করে দেওয়া; শরীরের ভেতরে আটকে রাখা নয়। হাঁচি আমাদের কাছে হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি সাধারণ বিষয় মনে হলেও এটি শরীরের খুব গোছানো একটি কাজ। ক্ষতিকর ধুলাবালি, অ্যালার্জি বা রোগজীবাণু যাতে ফুসফুসে ঢুকতে না পারে, সে জন্য শরীর জোর বাতাসে সেগুলোকে বাইরে বের করে দেয়। এই কাজের জন্য শরীর প্রচুর শক্তি ব্যবহার করে।
কিন্তু আমাদের শরীর কীভাবে এই তীব্র শক্তি তৈরি করে? আমাদের বুক ও পেটের মাঝের পেশি এবং পাঁজরের ভেতরের পেশিগুলো এ ক্ষেত্রে একটি বন্দুকের মতো কাজ করে। আর ভেতরের বাতাসের চাপ কাজ করে বুলেটের মতো। একটি স্বাভাবিক হাঁচির সময় এই জমা হওয়া শক্তি আমাদের নাক ও মুখ দিয়ে সহজে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আমরা যখন নাক ও মুখ শক্ত করে বন্ধ করে দিই, তখন তীব্র চাপের এই বাতাস বাইরে বের হওয়ার আর কোনো পথ পায় না।
আমরা যখন জোর করে হাঁচি আটকে দিই, তখন সেই তীব্র বাতাসের চাপ বাইরে বের হতে না পেরে উল্টো শরীরের ভেতরেই আঘাত করে। শরীরের নরম অংশগুলো এই প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার জন্য তৈরি নয়। ফলে এই আটকে পড়া বাতাস আমাদের নাক, গলা, সাইনাস এবং কানের একদম ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাতাসের চাপ বেশি হলে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে।
সাধারণত দু-একবার হাঁচি চেপে রাখলে বড় কোনো বিপদ হয় না। তবে হাঁচির মতো সাধারণ একটি ঘটনাও যে আমাদের কান বা গলার ক্ষতি করতে পারে, তা থেকেই বোঝা যায় এর শক্তি কতটা তীব্র। তাই হাঁচি চেপে না রেখে রুমাল বা টিস্যু দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁচি দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
ক্ষতিকর ধুলাবালি, অ্যালার্জি বা রোগজীবাণু যাতে ফুসফুসে ঢুকতে না পারে, সে জন্য শরীর জোর বাতাসে সেগুলোকে বাইরে বের করে দেয়। এই কাজের জন্য শরীর প্রচুর শক্তি ব্যবহার করে।
দ্বিধায় পড়লে হাঁচি আটকে রাখবেন না
হাঁচি চেপে রাখলে শরীরের কোনো উপকার তো হয়ই না, উল্টো বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু হাঁচি দেওয়ার সময় কীভাবে চারপাশের মানুষকে জীবাণু থেকে বাঁচানো যায়?
সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ উপায় হলো হাঁচিটি স্বাভাবিকভাবে হতে দেওয়া। তবে হাঁচি দেওয়ার সময় অবশ্যই একটি টিস্যু ব্যবহার করা উচিত। আর হাতের কাছে টিস্যু না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে নাক-মুখ ঢেকে হাঁচি দেওয়া যেতে পারে।
তবে এমন কিছু পরিস্থিতি থাকে, যখন পুরোপুরি জোরে হাঁচি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন, চাকরির ইন্টারভিউতে কথা বলার মাঝে কিংবা কোনো গম্ভীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিন লিউ পরামর্শ দেন, হাঁচি দেওয়ার সময় নাক ও মুখ দুটি পথই একসঙ্গে একদম বন্ধ করে দেবেন না। মুখ দিয়ে অন্তত কিছুটা বাতাস বের হওয়ার সুযোগ দিলে ভেতরের বাতাসের তীব্র চাপ অনেকটাই কমে যায়।
হাঁচি দেওয়ার সময় অবশ্যই একটি টিস্যু ব্যবহার করা উচিত। আর হাতের কাছে টিস্যু না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে নাক-মুখ ঢেকে হাঁচি দেওয়া যেতে পারে।
হাঁচি পুরোপুরি শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে তা থামানোর একটি ছোট্ট সুযোগ থাকে। হাঁচি শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বদলে ফেলে কিংবা জিব দিয়ে মুখের ওপরের তালুতে চাপ দিয়ে তা থামানো সম্ভব। এ ছাড়া নাক বা ওপরের ঠোঁটের নিচে আঙুল দিয়ে হালকা চেপে ধরলেও হাঁচি আর আসে না। আসলে এই কাজগুলো করলে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে হাঁচির সংকেত পৌঁছাতে পারে না, ফলে হাঁচি আর আসে না।
তবে এই সুযোগটি থাকে খুবই অল্প সময়ের জন্য। হাঁচির প্রক্রিয়াটি একবার পুরোপুরি শুরু হয়ে গেলে আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। তখন আমাদের শরীর মূলত নিজের নিয়মেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে। তাই কোনো জোরজবরদস্তি না করে স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর উপায়ে হাঁচিটি হতে দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।