মানুষের প্রথম কোডন আবিষ্কার
১৯৬১ সালের মে মাসের এক নিঝুম রাত। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (NIH)-এর একটি সাধারণ ল্যাবরেটরিতে তখনো বাতি জ্বলছে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম বড় এক ‘গোয়েন্দা অভিযান’ চলছে। টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো কাঁচের টিউব, রিএজেন্টের বোতল আর নোটবই। এই শান্ত পরিবেশের আড়ালেই চলছিল এমন এক পরীক্ষা, যা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জীববিজ্ঞানের চিরচেনা ইতিহাস বদলে দেবে।
এই গল্পের মূল নায়ক মার্শাল নিরেনবার্গ। তখনো তিনি বিজ্ঞানের জগতের কোনো মহাতারকা নন; বরং শান্ত, ধৈর্যশীল আর ভীষণ কৌতূহলী এক তরুণ গবেষক। তাঁর সঙ্গে আছেন সহকর্মী জে. হাইনরিখ ম্যাথেই। তাঁরা দুজন মিলে এমন এক দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যার ওপাশে কী আছে তা নিয়ে তখন পুরো বৈজ্ঞানিক বিশ্ব উত্তেজিত—ডিএনএ-র ভাষা কীভাবে প্রোটিনে রূপ নেয়?
তখনো মার্শাল নিরেনবার্গ বিজ্ঞানের জগতের কোনো মহাতারকা নন; বরং শান্ত, ধৈর্যশীল আর ভীষণ কৌতূহলী এক তরুণ গবেষক। তাঁর সঙ্গে আছেন সহকর্মী জে. হাইনরিখ ম্যাথেই।
কোডিং সমস্যার সেই গোলকধাঁধা
১৯৫৩ সালে ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স গঠন আবিষ্কারের পর একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল—জীবনের সব নীল নকশা লেখা আছে চারটি রাসায়নিক অক্ষরে (A, T, G, C)। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। এই মাত্র চার অক্ষরের বর্ণমালা কীভাবে ২০টি আলাদা অ্যামিনো অ্যাসিডের নির্দেশিকা তৈরি করে? এটিই ছিল সেই বিখ্যাত ‘কোডিং সমস্যা’।
তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা তখন কাগজে-কলমে নানা হিসাব কষছেন। জর্জ গ্যামো গাণিতিকভাবে দেখিয়েছিলেন, যদি তিনটি করে অক্ষর মিলে একটি সংকেত তৈরি হয়, তাহলে ৪×৪×৪ = ৬৪টি সমন্বয় পাওয়া সম্ভব। ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য যা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। জন্ম নিল ‘ট্রিপলেট কোড’-এর ধারণা। ফ্রান্সিস ক্রিক আবার প্রস্তাব করলেন এক রহস্যময় ‘অ্যাডাপ্টর’ অণুর কথা। কিন্তু সমস্যা একটাই—সবই ছিল অনুমান। ল্যাবরেটরির টেবিলে দাঁড়িয়ে কেউ তখনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেননি যে, এই নির্দিষ্ট অক্ষরের মানে এই নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড।
কোষহীন কারখানায় জীবনের স্পন্দন
নিরেনবার্গ ও ম্যাথেই এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা ভাবলেন, জ্যান্ত কোষের ভেতর হাজারো রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভিড়ে নির্দিষ্ট একটি সংকেত ধরা অসম্ভব। তাই তাঁরা কোষকে ভেঙে তার ভেতরের যন্ত্রপাতি—রাইবোজোম আর এনজাইমগুলোকে আলাদা করে নিলেন। তৈরি হলো এক ‘সেল-ফ্রি সিস্টেম’ বা কোষহীন ব্যবস্থা।
এটি ছিল অনেকটা এমন এক কারখানা, যার দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে কিন্তু ভেতরের মেশিনগুলো সচল আছে। এবার দরকার ছিল শুধু একটি নির্দিষ্ট নির্দেশ বা কাঁচামাল। তাঁরা ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডের একটি মিশ্রণ নিলেন, যার মধ্যে একটিকে তেজস্ক্রিয় বা রেডিওঅ্যাকটিভ করে রাখা হয়েছিল যেন সেটিকে আলাদা করে চেনা যায়।
নিরেনবার্গ ও ম্যাথেই এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা ভাবলেন, জ্যান্ত কোষের ভেতর হাজারো রাসায়নিক বিক্রিয়ার ভিড়ে নির্দিষ্ট একটি সংকেত ধরা অসম্ভব।
পলি-ইউ: যখন রহস্য কথা বলে উঠল
পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত। তাঁরা কৃত্রিমভাবে তৈরি এক অদ্ভুত আরএনএ ব্যবহার করলেন, যার আগাগোড়া ছিল শুধু একটিই অক্ষর—U (ইউরাসিল)। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘পলি-ইউ’। সংকেতটা ছিল অনেকটা এমন: UUUUUUUUU...
তাঁদের যুক্তি ছিল পরিষ্কার—যদি ট্রিপলেট কোড সত্যি হয়, তবে রাইবোজোম এই সংকেত পড়তে গিয়ে বারবার ‘UUU’ খুঁজে পাবে। আর এর ফলে যে প্রোটিন তৈরি হবে, তাতে থাকবে শুধু এক ধরণের অ্যামিনো অ্যাসিড। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেটি কোনটি?
২৬ মে, ১৯৬১ এর ভোররাতের সেই নিস্তব্ধ ল্যাবে ম্যাথেই যখন পলি-ইউ প্রয়োগ করলেন, হঠাৎ করে তেজস্ক্রিয়তার কাউন্টারটি লাফিয়ে উঠল। দেখা গেল, প্রোটিন শিকলে দলে দলে যুক্ত হচ্ছে একটিই অ্যামিনো অ্যাসিড— ফেনাইলঅ্যালানিন। রহস্যের জট খুলে গেল মুহূর্তেই। পৃথিবীর মানুষ প্রথমবারের মতো জীবনের ভাষার একটি শব্দ পড়তে পারল: UUU = ফেনাইলঅ্যালানিন।
যদি ট্রিপলেট কোড সত্যি হয়, তবে রাইবোজোম এই সংকেত পড়তে গিয়ে বারবার UUU খুঁজে পাবে। আর এর ফলে যে প্রোটিন তৈরি হবে, তাতে থাকবে শুধু এক ধরণের অ্যামিনো অ্যাসিড।
মস্কোর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ও নোবেল জয়
১৯৬১ সালের আগস্টে মস্কোর আন্তর্জাতিক বায়োকেমিস্ট্রি কংগ্রেসে নিরেনবার্গ যখন তাঁর এই ফলাফল উপস্থাপন করলেন, প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। কিন্তু ফ্রান্সিস ক্রিক এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে নিরেনবার্গকে আবারও বড় মঞ্চে ফলাফল তুলে ধরার সুযোগ করে দিলেন। মুহূর্তে পুরো বিজ্ঞান বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। শুরু হলো এক নতুন দৌড়—কে আগে পুরো কোড ভাঙতে পারে?
পরবর্তী কয়েক বছরে নিরেনবার্গের সাথে যোগ দিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী হার গোবিন্দ খোরানা এবং রবার্ট হলি। খোরানা কৃত্রিম আরএনএ তৈরির মাধ্যমে পুরো মানচিত্র তৈরি করলেন, আর হলি দেখালেন অনুবাদের মূল চাবি টিআরএনএ-র গঠন। ১৯৬৮ সালে এই তিন নক্ষত্রকে দেওয়া হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার।
মস্কোর সেই মঞ্চে যে নীরবতা দিয়ে শুরু হয়েছিল, নোবেল জয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পেল। মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, আমরা আসলে একটি মহাজাগতিক সফটওয়্যারের অংশ, যার কোড এখন আমাদের হাতের মুঠোয়।