ডিএনএ সংখ্যার রহস্য
১৯৪০-এর দশকের শেষ দিক। পৃথিবী তখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। ইউরোপ একটু একটু করে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এদিকে নতুন বৈজ্ঞানিক শক্তি হিসেবে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক এ সময়ে নিউইয়র্ক শহর প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত হয়ে উঠছে। সকালের কুয়াশা ভেদ করে রাস্তায় ট্যাক্সির হর্ন শোনা যাচ্ছে, ফুটপাতে তাকালেই চোখে পড়ছে মানুষের ব্যস্ত পদচারণ। অন্যদিকে দূর থেকে ভেসে আসছে সাবওয়ে ট্রেনের গর্জন। শহর জেগে উঠছে। কিন্তু সেদিন সকালে শহরের এই কোলাহল থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এক পুরোনো ভবনের ওপরের তলার একটি ল্যাবরেটরি।
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজপত্রের মাঝে বসে আছেন এক ব্যক্তি। কখনো তিনি পেনসিল দিয়ে খুব দ্রুত আঁকছেন, কখনো বা নোটবুকের পাতায় কিছু লিখছেন। আবার মাঝেমধ্যে থেমে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছেন, যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো গল্প শুনতে চাইছেন। তাঁর চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে একধরনের নীরব জেদ। প্রকৃতির ভেতর লুকিয়ে থাকা এক গভীর সত্য খুঁজে বের করার তীব্র জেদ।
এতক্ষণ যে মানুষটার কথা বলছিলাম, তাঁর নাম আরউইন শার্গাফ। বহু প্রতিভায় বিস্তৃত শার্গাফ যে শুধু গবেষণাগারে বন্দী বিজ্ঞানী ছিলেন, তা কিন্তু নয়। তিনি ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ, ভাষাবিদ, সাহিত্যপ্রেমী ও দার্শনিক।
আমেরিকায় এসে আরউইন শার্গাফ আরও মনোযোগ দিয়ে, আগের চেয়েও দৃঢ়ভাবে গবেষণায় নিজেকে ডুবিয়ে দেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কোনো দিনই জনপ্রিয়তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা ছিল না।
জীবনের শুরুর দিকে শার্গাফ অনেকটা সময় কাটান অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি শাসনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে ভিয়েনা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। দীর্ঘদিন ইউরোপে গড়ে তোলা তাঁর জীবন একপ্রকার ভেঙে পড়ে। পরিচিত শহর, পরিচিত মানুষ—সবকিছু ছেড়ে নতুন দেশে এসে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয় তাঁকে। কিন্তু এই ধাক্কা তাঁর চিন্তা বা কাজকে কখনোই থামাতে পারেনি।
বরং যুক্তরাষ্ট্রে এসে তিনি আরও মনোযোগ দিয়ে, আগের চেয়েও দৃঢ়ভাবে গবেষণায় নিজেকে ডুবিয়ে দেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কোনো দিনই জনপ্রিয়তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তিনি মঞ্চ কাঁপানো ঝলমলে কোনো বক্তা বা জনসমক্ষে বড় কোনো নেতা ছিলেন না। তিনি কোনো কিছুরই সহজ উত্তর পছন্দ করতেন না। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতি কখনো অকারণে কোনো নিয়ম তৈরি করে না।
প্রোটিন তৈরি হয় বিশ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো অসংখ্য উপায়ে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে। তারা লম্বা শৃঙ্খল বানাতে পারে।
প্রোটিন বনাম ডিএনএ: জীবনের আসল নায়ক কে
বিশ শতকের শুরুর দিকের জীববিজ্ঞান আজকের মতো এত পরিষ্কার এবং সাজানো-গোছানো ছিল না। তখনো অনেক কিছুই অনুমান ও ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। জীবনের গোপন রহস্যের চাবিকাঠি হিসেবে তখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো প্রোটিনকে। এর পেছনে যুক্তিও ছিল যথেষ্ট শক্ত।
প্রোটিন তৈরি হয় বিশ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো অসংখ্য উপায়ে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে। তারা লম্বা শৃঙ্খল বানাতে পারে, আবার সেই শিকল ভাঁজ হয়ে জটিল ত্রিমাত্রিক আকারও নিতে পারে। প্রোটিন কখনো এনজাইম হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া চালায়, কখনো হরমোন হয়ে শরীরের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সংকেত পাঠায়, আবার কখনো অ্যান্টিবডি হয়ে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। জীবনের দৃশ্যমান প্রায় প্রতিটি কাজেই প্রোটিনের সক্রিয় ভূমিকা চোখে পড়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বেশির ভাগ বিজ্ঞানীর কাছে তখন প্রোটিনই ছিল জীবনের আসল নায়ক।
প্রোটিন কখনো এনজাইম হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া চালায়, কখনো হরমোন হয়ে শরীরের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সংকেত পাঠায়, আবার কখনো অ্যান্টিবডি হয়ে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে।
আর ডিএনএ? সেটি তো তৈরি মাত্র চারটি উপাদান দিয়ে—A, T, G, C। বাইরে থেকে দেখলে ব্যাপারটা খুবই সাদামাটা লাগে। নেই কোনো জটিল ভাঁজ বা বিশ রকম উপাদানের বৈচিত্র্য। অনেকের চোখে তখনো ডিএনএ ছিল একঘেয়ে দীর্ঘ একধরনের শিকল, যা হয়তো কোষের ভেতরে কাঠামোগত কোনো ভূমিকা রাখে। অনেকটা বাড়ির খুঁটির মতো। খুঁটি যেমন বাড়িকে ধরে রাখে, কিন্তু বাড়ির ভেতরের সব কাজ তো মানুষই করে! সেই যুক্তিতে, জীবনের নির্দেশ বা তথ্য বহনের মতো সূক্ষ্ম ও জটিল কাজ নিশ্চয়ই করবে প্রোটিনের মতো কোনো শক্তিশালী ও বহুরূপী অণু।
এসব প্রচলিত ধারণার মধ্যেই আরউইন শার্গাফ একটু আলাদা করে ভাবছিলেন। তিনি সহজে প্রচলিত ধারণা মেনে নেওয়ার মানুষ ছিলেন না। জনপ্রিয় মতামতের গা ভাসানোর বদলে তিনি বরং প্রশ্ন তুলতে ভালোবাসতেন। তাঁর মনে সব সময় একটা অস্বস্তি কাজ করত—‘আচ্ছা, যদি ডিএনএ সত্যিই এতই তুচ্ছ ও সাধারণ হয়, তাহলে প্রকৃতি কেন একে এত যত্ন করে সব জীবের কোষে সংরক্ষণ করে রেখেছে? কেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি এত নিখুঁতভাবে কপি হয়?’
বেশির ভাগ বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, এত সাধারণ গঠনের একটি অণু কখনোই জীবনের অসীম বৈচিত্র্যের নকশা বহন করতে পারে না। ডিএনএকে তাঁরা ভাবতেন একটি যান্ত্রিক উপাদান; কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা একধরনের নীরব অংশ, যার কাজ অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু শার্গাফের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্য রকম। তিনি সরলতার মধ্যেই গভীরতা খুঁজতেন। তাঁর মনে হতো, প্রকৃতির যে জিনিসটিকে বাইরে থেকে সবচেয়ে সহজ মনে হয়, তার ভেতরেই হয়তো সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে।
আরউইন শার্গাফ সহজে প্রচলিত ধারণা মেনে নেওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না। জনপ্রিয় মতামতের গা ভাসানোর বদলে তিনি বরং প্রশ্ন তুলতে ভালোবাসতেন।
সত্য সন্ধানে সংখ্যার খেলা
ওসওয়াল্ড এভারি যখন প্রমাণ করলেন, ডিএনএই বংশগতির বাহক, তখন অনেকেই সেই ফলাফল পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি। প্রোটিনের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থা এত সহজে নড়েনি। কিন্তু শার্গাফ সেই কাজকে বরং আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এভারি যদি ঠিক হন, তাহলে জীববিজ্ঞানের ভিত্তিটাই নতুন করে ভাবতে হবে। আর সেই নতুন ভাবনার শুরুটা হতে পারে সংখ্যার ভেতর থেকে ডিএনএর গঠনের সূক্ষ্ম নিয়মগুলো খুঁজে বের করার মাধ্যমে।
শার্গাফ তাই আবেগ বা তর্ক নয়, বরং সংখ্যার দিকে তাকালেন। তিনি বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীবের ডিএনএ বিশ্লেষণ করতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে তাঁর গবেষণার ফলাফল থেকে একটি অদ্ভুত নিয়ম স্পষ্ট হতে শুরু করল। প্রথমে ব্যাপারটা খুব সাধারণ মনে হলেও পরে বোঝা গেল, এই সরল নিয়মের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক বিশাল বৈজ্ঞানিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
শার্গাফ ঠিক করলেন, অনুমান বা তর্ক দিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে সত্য খুঁজতে হবে। তাই তিনি নেমে পড়লেন কাজে। নানা রকম জীবের ডিএনএ সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ, প্রাণী; যা পাওয়া যায়। তাঁর লক্ষ্য একটাই—সংখ্যাগুলো নিজের চোখে দেখা। তারপর শুরু হলো বিশ্লেষণ। রাসায়নিক পদ্ধতিতে তিনি ডিএনএ ভেঙে চারটি মূল অংশে আলাদা করলেন: অ্যাডেনিন (A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G) এবং সাইটোসিন (C)।
শার্গাফ দেখলেন, সব জীবের ডিএনএ এক রকম নয়। কোথাও অ্যাডেনিন বেশি, কোথাও গুয়ানিন। কোনো জীবের ডিএনএতে A এবং T মিলিয়ে বেশি, আবার কোথাও G এবং C বেশি।
তৎকালীন সময়ে কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। আজকের মতো তখন কোনো স্বয়ংক্রিয় মেশিন বা উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। একেকটা মাপ নিতে সময় লাগত, ভুল হওয়ার ঝুঁকি ছিল, আবার তা বারবার যাচাইও করতে হতো।
কিন্তু শার্গাফ ছিলেন ধৈর্যশীল মানুষ। তিনি জানতেন, প্রকৃতির নিয়ম যদি সত্যি হয়, তবে তা একবার নয়, বারবার একইভাবে দেখা যাবে। তাই তিনি থামলেন না। নমুনা বাড়ালেন, হিসাব মেলালেন, আবার পরীক্ষা করলেন। ধীরে ধীরে তাঁর সামনে একটা ছবি পরিষ্কার হতে লাগল। তিনি দেখলেন, সব জীবের ডিএনএ এক রকম নয়। কোথাও অ্যাডেনিন বেশি, কোথাও গুয়ানিন। কোনো জীবের ডিএনএতে A এবং T মিলিয়ে বেশি, আবার কোথাও G এবং C বেশি। অর্থাৎ মোট গঠন প্রজাতিভেদে বদলাচ্ছে। কিন্তু এই ভিন্নতার মাঝেও একটি আশ্চর্য মিল বারবার সামনে আসছে। A-এর পরিমাণ প্রায় সব সময় T-এর সমান। আবার G-এর পরিমাণ প্রায় সব সময় C-এর সমান।
একবার নয়, বারবার। বিভিন্ন নমুনায়, বিভিন্ন প্রজাতিতে, আলাদা আলাদা পরীক্ষায়। শার্গাফ বুঝলেন, এটা কাকতালীয় নয়। এটি প্রকৃতির একটা নির্দিষ্ট নিয়ম। পরে এই পর্যবেক্ষণই বিজ্ঞান জগতে শার্গাফের নিয়ম নামে পরিচিতি পায়।
শার্গাফের স্বভাবও ছিল একটু ভিন্ন। তিনি গভীরে চিন্তা করতেন, ধীরে ধীরে এগোতেন। দ্রুত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মানুষ ছিলেন না।
আজ আমাদের কাছে এটি হয়তো খুব সাধারণ মনে হয়। স্কুলের বইয়ে শেখানো হয়, A জোড়া বাঁধে T-এর সঙ্গে, আর G জোড়া বাঁধে C-এর সঙ্গে। কিন্তু তখন এই ধারণা ছিল একেবারেই নতুন। এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ডিএনএর ভেতরের অক্ষরগুলো এলোমেলোভাবে সাজানো নয়। এদের মধ্যে একটি গভীর ও নির্দিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে।
শার্গাফ এখানেই থামেননি। তিনি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, এই সমানতা কেন? কীভাবে ঘটছে? তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কাঠামোগত কারণ আছে। তিনি কিছু মডেল বানানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় ডিএনএর সঠিক রাসায়নিক গঠন নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। উপকরণ সীমিত ছিল, তথ্য ছিল অসম্পূর্ণ।
শার্গাফের স্বভাবও ছিল একটু ভিন্ন। তিনি গভীরে চিন্তা করতেন, ধীরে ধীরে এগোতেন। দ্রুত তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মানুষ ছিলেন না। পরে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, তিনি কাঠামো কল্পনা করার চেষ্টা করেছিলেন। অর্থাৎ, মডেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ধারণাগত কাঠামো তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি হয়তো একসময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। ১৯৫০ সালে শার্গাফ এটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। এই ফলাফল নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু শার্গাফের ভেতরে তখনো একধরনের অস্বস্তি রয়ে গেল। তিনি হয়তো সংখ্যার এই মিল খুঁজে পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মাথায় ঘুরছিল আরেকটা প্রশ্ন—এই সমানতা আসলে কীভাবে ঘটছে? কেনই বা এমন হচ্ছে?
শার্গাফ অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, ওয়াটসন এবং ক্রিকের রসায়নের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তাঁরা এমনকি ডিএনএর বেসগুলোর সঠিক রাসায়নিক গঠনও জানতেন না।
সেই ঐতিহাসিক নাটকীয় সাক্ষাৎ
১৯৫২ সালের মে মাসে শার্গাফ ইংল্যান্ড ভ্রমণে যান এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের সঙ্গে দেখা করেন। সেই সাক্ষাৎটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় মুহূর্ত। শার্গাফের দৃষ্টিতে ওয়াটসন এবং ক্রিক ছিলেন নিতান্তই অপেশাদার এবং উদ্ধত। ক্রিক তখনো তাঁর পিএইচডিও শেষ করেননি, আর ওয়াটসন ছিলেন অত্যন্ত কম বয়সী।
শার্গাফ যখন তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁরা কী নিয়ে কাজ করছেন; তাঁরা জানালেন ডিএনএর মডেল বানানোর চেষ্টা করছেন। শার্গাফ অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, এই দুই তরুণের রসায়নের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তাঁরা এমনকি ডিএনএর বেসগুলোর সঠিক রাসায়নিক গঠনও জানতেন না। শার্গাফ কিছুটা বিদ্রূপের সুরে তাঁদের নিজের সেই সংখ্যার নিয়মের কথা (A=T, G=C) জানালেন। পরে শার্গাফ এই সাক্ষাৎ নিয়ে লিখেছিলেন:
‘তারা ছিল অবিশ্বাস্যভাবে অজ্ঞ। তারা কিছুই জানত না, অথচ তারা বিশ্বের রহস্য সমাধান করতে চেয়েছিল।’
কিন্তু শার্গাফ জানতেন না, তাঁর দেওয়া সেই সংখ্যার চাবিকাঠি এই দুই তরুণের মস্তিষ্কে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করবে।
ওয়াটসন ও ক্রিক যখন কিংস কলেজের রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিনের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ছবিগুলো (রোজালিন্ডের অনুমতি ছাড়াই) হাতে পেলেন, তখন তাঁদের সামনে জ্যামিতিক ধাঁধাটি পরিষ্কার হতে শুরু করল। রোজালিন্ডের ছবি বলছিল, ডিএনএ একটি প্যাঁচানো মই বা হেলিক্স। কিন্তু সেই মইয়ের ভেতরের সিঁড়িগুলো কীভাবে সাজানো?
ঠিক এখানেই শার্গাফের নিয়ম জাদুর মতো কাজে এল। ওয়াটসন বুঝতে পারলেন, যেহেতু A এবং T সব সময় সমান পরিমাণে থাকে, তার মানে তারা একে অপরের সঙ্গে জোড়া বাঁধে। ঠিক তেমনি G জোড়া বাঁধে C-এর সঙ্গে। এই বেস পেয়ারিং ছিল ডাবল হেলিক্সের মূল ভিত্তি। ১৯৫৩ সালের ২৫ এপ্রিল নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত সেই ঐতিহাসিক প্রবন্ধে ওয়াটসন ও ক্রিক শার্গাফের নিয়মের উল্লেখ করলেন ঠিকই, কিন্তু পুরো কৃতিত্ব চলে গেল তাঁদের পকেটে।
শার্গাফের দৃষ্টিতে ওয়াটসন এবং ক্রিক ছিলেন নিতান্তই অপেশাদার এবং উদ্ধত। ক্রিক তখনো তাঁর পিএইচডিও শেষ করেননি, আর ওয়াটসন ছিলেন অত্যন্ত কম বয়সী।
বঞ্চনার ইতিহাস ও একাকিত্বের আক্ষেপ
১৯৬২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। মঞ্চে উঠলেন জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিস ক্রিক এবং মরিস উইলকিন্স। রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন তত দিনে ক্যানসারে মারা গেছেন। শার্গাফকে জুরিবোর্ড পুরোপুরি এড়িয়ে গেল।
শার্গাফ এই বঞ্চনা কখনো মেনে নিতে পারেননি। তাঁর আক্ষেপ পুরস্কার না পাওয়া নিয়ে যতটা ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল বিজ্ঞানের ধরন বদলে যাওয়া নিয়ে। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান এখন একটি প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সত্য সন্ধানের চেয়ে আগে পৌঁছানোটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ওয়াটসন ও ক্রিককে সায়েন্টিফিক পপ স্টার বলে উপহাস করতেন। তিনি লিখেছিলেন:
‘ছোট দুই টুকরো কাগজ দিয়ে তারা বিশ্ব জয় করে নিল, অথচ বছরের পর বছর ল্যাবে হাড়ভাঙা খাটুনি করা মানুষগুলোকে কেউ মনে রাখল না।’
শার্গাফের কষ্টটা শুধু ব্যক্তিগত হিংসা ছিল বললে ভুল হবে। তিনি আসলে ভেতর থেকে অন্য রকম মানুষ ছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি ছিল তাঁর গভীর শ্রদ্ধা। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান মানে ধীরে এগোনো, ধৈর্য নিয়ে চিন্তা করা, শব্দ বেছে কথা বলা। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল প্রায় সাহিত্য বা দর্শনের মতো নীরব, গম্ভীর সাধনা। তাই যখন ওয়াটসন ও ক্রিক তাঁদের ডাবল হেলিক্স মডেল প্রকাশ করলেন এবং হঠাৎ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে গেলেন, শার্গাফ সেটা সহজভাবে নিতে পারেননি। তাঁর চোখে ব্যাপারটা খুব দ্রুত এবং নাটকীয় ঘোষণা মনে হয়েছিল। তিনি ভাবতেন, বিজ্ঞান এতটা চটকদার হওয়ার কথা নয়।
শার্গাফ লিখেছিলেন, ‘ছোট দুই টুকরো কাগজ দিয়ে তারা বিশ্ব জয় করে নিল, অথচ বছরের পর বছর ল্যাবে হাড়ভাঙা খাটুনি করা মানুষগুলোকে কেউ মনে রাখল না।’
তিনি মনে করতেন, প্রকৃতিকে বোঝার কাজটা বিনয়ের সঙ্গে করা উচিত। তাঁর ভয় ছিল, বিজ্ঞান যেন ধীরে ধীরে প্রদর্শনী হয়ে যাচ্ছে, গবেষণা যেন প্রতিযোগিতায় বদলে যাচ্ছে। জীবনের শেষ দিকে তিনি তাঁর আত্মজীবনী হেরাক্লিটিয়ান ফায়ার-এ এই হতাশার কথা খোলাখুলি লিখেছেন। সেখানে তিনি নিজের একাকিত্বের কথা বলেছেন, বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তাঁর অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন। অনেক সময় তিনি নিজেকে বহিরাগত বলে মনে করতেন, যেন তিনি বিজ্ঞানজগতের ভেতরে থেকেও বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
যে নিউইয়র্ক শহরে তিনি এত বছর কাজ করলেন, সেই শহরই যেন ধীরে ধীরে তাঁকে ভুলে যেতে শুরু করল। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁর ল্যাব বন্ধ হয়ে যায়, তাঁর বইপত্র সরিয়ে ফেলা হয়। একজন গবেষকের জন্য নিজের ল্যাব মানে শুধু কাজের জায়গা নয়, তাঁর চিন্তার ঘর, জীবনের বড় একটি অংশ। সেটি হারানো অনেক সময় গভীর আঘাত দেয়। শার্গাফের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।
যে নিউইয়র্ক শহরে শার্গাফ এত বছর কাজ করলেন, সেই শহরই যেন ধীরে ধীরে তাঁকে ভুলে যেতে শুরু করল। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁর ল্যাবও বন্ধ হয়ে যায়।
শার্গাফের অমোঘ অবদান
আজ শার্গাফ বেঁচে নেই (২০০২ সালে মারা যান), কিন্তু তাঁর আক্ষেপের সুর আজও বিজ্ঞান জগতে প্রতিধ্বনিত হয়। শার্গাফের নিয়ম ডিএনএর গঠন বোঝার ক্ষেত্রে মৌলিক ভূমিকা রেখেছে, যা পরে জিনোম সিকোয়েন্সিংসহ আধুনিক জেনেটিক প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে। আজ বায়োইনফরমেটিকস বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যে বিশাল বিপ্লব ঘটছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই মানুষটিই।
তাঁর নিয়মের গভীরতা কতখানি, তা বোঝা যায় যখন আমরা দেখি, বিভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, A + T এবং G + C-এর অনুপাত প্রজাতিভেদে আলাদা। যেখানে G-C বন্ধন বেশি থাকে, সেই ডিএনএ বেশি তাপ সহ্য করতে পারে। এটি পিসিআর প্রযুক্তিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরউইন শার্গাফের গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান শুধু গবেষণাগারের পরীক্ষা নয়; এটি মানুষের আবেগ, ইগো এবং ভাগ্যেরও খেলা। ইতিহাসে যাঁরা বিজয়ী হন, তাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। ওয়াটসন এবং ক্রিক বিজয়ী হয়েছিলেন কারণ তাঁরা সাহসের সঙ্গে কল্পনা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু শার্গাফ ছিলেন সেই পথপ্রদর্শক, যিনি অন্ধকারের মধ্যে মশাল জ্বালিয়ে পথ দেখিয়েছিলেন।
তাঁর আক্ষেপ হয়তো চিরকাল থাকবে, কিন্তু সভ্যতার ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন সেই চারটি অক্ষরের অদ্ভুত সম্পর্কের মাঝে। প্রতিটি মানুষের কোষের ভেতরে যখন ডিএনএ প্রতিলিপি তৈরি হয়, তখন নিঃশব্দে শার্গাফের নিয়ম পালিত হয়। মানুষ হয়তো তাঁকে ভুলে গেছে, কিন্তু প্রকৃতি প্রতিদিন শার্গাফকে সম্মান জানায়।
আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে শার্গাফের সেই নির্জন ল্যাবরেটরির খসখস শব্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য সন্ধানের পথটি কখনো সহজ নয়। কেউ হয়তো হাততালি পায়, কেউ পায় না। কিন্তু সত্য কখনো বদলে যায় না। আরউইন শার্গাফ হয়তো নোবেল মেডেলটি তাঁর ড্রয়ারে রাখতে পারেননি, কিন্তু বিজ্ঞানের মূল স্তম্ভটি তিনিই গেঁথে দিয়েছিলেন।