কাস্তেঠোঁটের কাস্তেচ্যাগা

একঝাঁক কাঁচিচ্যাগাছবি: আদনান আজাদ

ডিম্বাকার বিলটির বুকজোড়া এখন সদ্য রোপণকৃত আমন ধানের চারা। মাঘ মাস পর্যন্ত পায়ের পাতা ডোবা জল থাকে বিলের খণ্ড খণ্ড জমিগুলোতে। শুধু বিলের মাঝখানটায় একটা গোলাকৃতির জলাশয়ের হাঁটুজল ক্রমে কমতে কমতে থকথকে জলকাদা হয়ে যায় একসময়।

মাঘের শেষভাগ। এক বালক ছিপ-বড়শি হাতে জলাভূমিটার পাড়ে এসে বড়শিতে ছোট আকারের একটা ব্যাঙ গাঁথল প্রথমে, তারপরে বাঁশের কঞ্চির ছিপের গোড়াটা পুঁতে দিল কাদামাটিতে। সুতাসহ ব্যাঙটি লম্ফঝম্ফ শুরু করেছে। দু-চার দিন পরপর এখানে জলকাদায় নামে দু-তিনটি শামুকভাঙা (Asian openbill) পাখি। একেকটায় মাংস হয় দুই থেকে চার কেজি। ওরা খায় ছোট ছোট মাছ, গুগলী শামুক, ব্যাঙ ও জলজ বড় ধরনের পোকামাকড়। আপেল শামুকের কোনো অভাব নেই। (এই শামুকের শুকনা খোলা পুড়িয়ে আজ থেকে ৫০–৬০ বছর আগে বাংলাদেশে পান খাওয়ার চুন তৈরি করা হতো।) এই আপেল শামুক শামুকভাঙা পাখিদের কাছে অতিপ্রিয় খাবার।

কাঁচিচ্যাগা পাখি মূলত জলজ বড় ধরনের পোকামাকড় খায়
ছবি: ফ্রিপিক

এই শামুক শামুকভাঙারা ওদের শক্ত-লম্বা ঠোঁটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় রেখে সাঁড়াশির মতো চাপ দিয়ে ভেঙে ফেলে শামুকের খোল—খোল পড়ে যায়, ভেতরের মাংসপিণ্ড মজা করে খায়। বড়শি পাতা ওই দুষ্টু বালক এসব কথা জানে—জানে, সদ্য ডিম ফুটে বেরোনো একেবারে গোলাকার ছোট ছোট কাছিমছানাও টুপুস করে গিলে ফেলে শামুকভাঙা। ওই বালকের খুব ইচ্ছা—বড়শিতে সে শামুকভাঙা আটকাবেই। বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে সে শামুকভাঙার তিনখানা বড় বড় খসে পড়া পালক কুড়িয়ে নিল, বাড়ি গিয়ে গুঁজে রাখবে রান্নাঘরের বেড়ায়।

আরও পড়ুন
আপেল শামুক শামুকভাঙারা ওদের শক্ত-লম্বা ঠোঁটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় রেখে সাঁড়াশির মতো চাপ দিয়ে ভেঙে ফেলে শামুকের খোল—খোল পড়ে যায়, ভেতরের মাংসপিণ্ড মজা করে খায়।

দূর থেকে একঝাঁক পাখি আসছে জলাশয়টির দিকে। বেশ ঘন হয়েই উড়ছে ওগুলো, বারবার ডানে-বাঁয়ে কাত হচ্ছে—রোদের আলোয় ওগুলোর প্রসারিত ডানা ও পিঠের উপরিভাগে শিল্পিত-চিত্রিত রংগুলো ইচ্ছা করেই শূন্যে ডিসপ্লে প্রদর্শন করছে। টান টান ঘাড়-মাথা, লেজের তলা দিয়ে বাইরে প্রসারিত দুখানা পা ও লম্বাটে ডানার ছন্দময় ওঠানামা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। ডাকাডাকিও করছে মিষ্টি সুরেলা ‘টিট্টি টি’ ও ‘টিউ-উ’ শব্দে, হয়তোবা নিজেদের ভেতর কথা চালাচালি করছে—সামনের জলাশয়টায় নামা যায় কি না!

জলাভূমিটার ওপরে এসে শূন্যে নান্দনিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে দু-তিনবার পাক খেল পাখিগুলো, তারপর নেমেই পড়ল ওদের হাঁটুসমান জলকাদায়। নেমেই ওরা ওদের কাস্তেঠোঁট চালাতে শুরু করল জলকাদার ভেতরে—ঠোঁটের আগার দিকটা কাঁচির আগার মতো বাঁকানো কিনা, তাই ঠোঁট একটু দূরের জলকাদায় ঢুকিয়ে ঠোঁট টেনে আনছে নিজেদের বুকের দিকে, আবার সামনে ঠেলছে, ঘোরাচ্ছে ডানে-বাঁয়ে। জিব ও ঠোঁটগুলো এদের অতিশয় স্পর্শকাতর। ঠোঁটে জলপোকা-কেঁচোজাতীয় জলজ প্রাণী বা পলাতক জলপোকা তথা জলের উপরিভাগের অন্য পোকামাকড় ঠোঁটের স্পর্শে এলেই বুঝে ফেলে এরা, খেতে আর দেরি করে না।

উড়ন্ত একঝাঁক কাঁচিচ্যাগা
ছবি: আদনান আজাদ

মূলত এরা যেমন জলাভূমি তথা হাওর-বাঁওড়-বিল-ঝিল-নদীতীর-চর ও সমুদ্রের মোহনায় চরা পাখি, তেমনি সুযোগ থাকলে খাল-ডোবা-পুকুর-দিঘির পাড়সহ ধানখেতেও চরে। পাখিগুলো ওদের বুক-গলাসমান জলে যেমন চরতে পারে, তেমনি পারে হাঁটু-ঊরু ডোবা জলকাদায়ও। পা ফেলার গতিতে ছন্দ যেমন আছে, ঠোঁট-মাথা-গলা জলে ডোবানোর দৃশ্যেও আছে নান্দনিকতা। জলকাদার জলচর খাবার খোঁজার কৌশলটা এদের চোখ চেয়ে দেখার মতো। বন্দুকের গুলির ছররা যদি লাগে ওদের ঠোঁটে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা লাফে উঠে পড়বে ওপরে, তারপর জলকাদায় নেমে ঠোঁট-মাথা-গলা একেবারে আকাশমুখী করে কেবলই ডানে-বাঁয়ে ঝাঁকাতে থাকবে—ঠোঁটে বড় চোট লাগে তো! দর্শনীয় ওই বক্র ঠোঁটটিও কম শত্রু নয়!

আরও পড়ুন
মূলত কাঁচিচ্যাগারা যেমন জলাভূমি তথা হাওর-বাঁওড়-বিল-ঝিল-নদীতীর-চর ও সমুদ্রের মোহনায় চরা পাখি, তেমনি সুযোগ থাকলে খাল-ডোবা-পুকুর-দিঘির পাড়সহ ধানখেতেও চরে।

এইমাত্র জলাশয়ে নামা কাস্তেঠোঁটের পাখিগুলোর চোখে পড়ল লম্ফঝম্ফরত ব্যাঙটি। দুটি অনভিজ্ঞ পাখি (হয়তোবা জীবনের প্রথম ওরা এসেছে বাংলাদেশে, আনাড়ি ও অনভিজ্ঞ) মজাদার খাবার ভেবে যেই না দ্রুত এগোতে চাইল, অমনি অভিজ্ঞ পাখিগুলো বিপদসূচক হুইসেল বাজাতে লাগল, ভয় ভয় কৌতূহলী চোখে টান টান গলা-মাথা ও ঠোঁটে তাকিয়ে রইল ব্যাঙটির দিকে। পা বাড়াল না ওদিকে। তাই বলে এই পাখিরা যে ‘ব্যাঙফাঁদে’ বা অন্যান্য ফাঁদে পড়ে না, তা কিন্তু নয়। আরও একটি মজার ফাঁদে এই পাখিদের বেশ কবার পড়তে দেখেছি আমি।

আপেল শামুকের হাঁ করা মুখের ভেতরে পা বা পায়ের আঙুল ফেলতেই ভীত আপেল শামুক ভয়ে ওদের মুখের শক্ত খোলটা দেয় বন্ধ করে। আটকা পড়ে পা বা পায়ের আঙুল। ভয়ে দিশাহারা এই পাখিরা তখন মুক্তি পাওয়ার জন্য যা লম্ফঝম্ফ করে না! এ রকম ক্ষেত্রে অনেক সময় ধরে ফেলা সম্ভব পাখিটিকে। ক্বচিৎ কাঁকড়ার সাঁড়াশিতে পড়ে। যদিও যথেষ্ট চতুর ও সাবধানী পাখি এরা। ব্যাঙফাঁদে এই পাখিগুলো না পড়লেও শামুকভাঙা কিন্তু পড়ে। কেননা লম্ফরত ব্যাঙ দেখলে শামুকভাঙাদের আর হুঁশজ্ঞান থাকে না।

আরও পড়ুন
আপেল শামুকের হাঁ করা মুখের ভেতরে পা বা পায়ের আঙুল ফেলতেই ভীত আপেল শামুক ভয়ে ওদের মুখের শক্ত খোলটা দেয় বন্ধ করে। আটকা পড়ে পা বা পায়ের আঙুল।

কাস্তেঠোঁটের পাখিগুলো বাংলাদেশে শীতের পরিযায়ী পাখি। কাস্তেচ্যাগা, কাঁচিচ্যাগা, রাঙাচ্যাগা, রামচ্যাগাসহ ছোট গুলিন্দা নামেও পরিচিত এগুলো। বাগেরহাট-ফকিরহাটে এগুলো কাঁচিচ্যাগা নামে বহুল পরিচিত। সাতক্ষীরার কিছু অঞ্চলে পরিচিত কাস্তেচরা (Black-headed ibis) নামে। ইংরেজি নাম Whimbrel এবং বৈজ্ঞানিক নাম Numenius phaeopus। দৈর্ঘ্য মোট ৪৩ সেন্টিমিটার। একনজরে হালকা হলুদ রঙের লম্বা পায়ের পাখি। বিশ্রামের সময় এরা এক পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে কাস্তেঠোঁটটা পিঠের পালকে গুঁজে দিয়ে ঝিমায়-ঘুমায়।

কাস্তেঠোঁটের পাখিগুলো বাগেরহাট-ফকিরহাটে কাঁচিচ্যাগা নামে বহুল পরিচিত
ছবি: শরীফ উদ্দিন / ই-বার্ড

পাখার দুপ্রান্ত কালো, সেই কালো রঙের ওপরে আড়াআড়িভাবে সরু-সাদা রেখা টানা—একই রকম সাদা পাঁচ–ছয়টি আড়াআড়ি রেখা টানা পাখার বাকি হালকা হলুদ অংশটুকুতেও—চমত্কার কারুকাজ যেন! লেজের ওপরেও আড়াআড়ি চার–পাঁচটি টান একই রকমের। সাদাটে গলা-বুক-পেট ও লেজের তলাজুড়ে অসংখ্য ছোট ছোট বাদামি ছিট। ঠোঁটটির রং কালচে। পা ধূসর। পায়ের ঊরু তুলোট সাদা। এদের চোখের ওপর দিয়ে সাদাটে একটা রেখা টানা আছে।

লেখক: পাখিবিশারদ

*লেখাটি ২০২২ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন