তীব্র গরমে কেন মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে, দূর করার উপায় কী
আপনি হয়তো গরমের দিনে নিয়ম করে পর্যাপ্ত পানি খাচ্ছেন, ঠিকমতো ঘুমাচ্ছেন এবং সুন্দর একটি রুটিন মেনে চলছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর ও মন কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করে, ক্লান্ত লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং মনে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। যদি এমনটা মনে হয়ে থাকে, তবে আপনি শুধু একা এই সমস্যায় ভুগছেন না।
গরমে তাপমাত্রা যত ওপরে ওঠে, মানসিক চাপের মাত্রাও তত বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত গরমে সাধারণত শারীরিক অস্বস্তি নিয়ে যতটা ভাবি, এই গরম মনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা অনেকেই ভাবেন না। গরম সরাসরি মেজাজ, চিন্তাভাবনা ও মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু কেন এমন হয়?
মূলত গরম বাড়লে শরীর ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য বাড়তি শক্তি খরচ করতে শুরু করে। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে আমরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ি। একই সঙ্গে গরমের কারণে রাতে ভালো ঘুম না হওয়ায় মস্তিষ্কের বিশ্রামে ঘাটতি দেখা দেয়, যা খিটখিটে ও মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে।
মূলত গরম বাড়লে শরীর ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য বাড়তি শক্তি খরচ করতে শুরু করে। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে আমরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
গরম যেভাবে শরীর ও মনকে বদলে দেয়
তীব্র তাপমাত্রা শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক স্ট্রেস বা চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলে। যখন খুব গরম পড়ে, তখন শরীর ভেতরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করে। ফলে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন কর্টিসলের নিঃসরণ বাড়ে। যেহেতু হরমোনের ওঠানামা মেজাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, তাই গরম বাড়ার সঙ্গে মানুষের মনে উদ্বেগ, অস্থিরতা ও খিটখিটে ভাব দেখা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সায়েন্স সাময়িকীর গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের কারণে মস্তিষ্কে নরএপিনেফ্রিন নামে একটি রাসায়নিকের মাত্রা বেড়ে যায়। এই রাসায়নিকটি মূলত মানুষের লড়াই অথবা পালিয়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। সহজ কথায়, বাইরে বিশেষ কোনো ঝামেলার কারণ না থাকলেও আমাদের মস্তিষ্ক এই তীব্র গরমকেই একটি বড় হুমকি বা বিপদ হিসেবে ধরে নেয়। এই জৈবিক ও রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণেই গরমে অস্থির ও খিটখিটে হয়ে ওঠে মেজাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সায়েন্স সাময়িকীর গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের কারণে মস্তিষ্কে নরএপিনেফ্রিন নামে একটি রাসায়নিকের মাত্রা বেড়ে যায়।
তীব্র গরম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বেশ গুরুতর প্রভাব পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে তীব্র উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো সমস্যা অন্য সময় থেকে অনেক বেড়ে যায়।
এটি নিয়ে ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গরম যখন ৩৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তির হার প্রায় ৭.৮ শতাংশ বেড়ে যায়। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই মানসিক সমস্যা আছে, যাঁরা বয়স্ক বা যাঁদের ঘরে এসি বা ফ্যানের ভালো ব্যবস্থা নেই, তাঁরা এই ঝুঁকিতে বেশি পড়েন।
২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণা অনুযায়ী, রাতের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হলেই মানুষের ঘুমের মান খুব খারাপ হয়ে যায়। আর এই অনিদ্রাই পরে মানুষের মনে তীব্র উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গরম যখন ৩৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তির হার প্রায় ৭.৮ শতাংশ বেড়ে যায়।
প্রচণ্ড গরমে শরীর ও মন ঠান্ডা রাখার উপায়
তীব্র গরমে শরীর ও মনের অস্থিরতা থেকে মনকে শান্ত করার কিছু সহজ এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায় আছে। প্রচণ্ড গরমের দিনগুলোতে সুস্থ ও সতেজ থাকতে এই সাধারণ কৌশলগুলো দারুণ কাজে আসতে পারে।
প্রথমেই চোখেমুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দেওয়া উচিত, কিংবা কপালে কিছুক্ষণের জন্য বরফ বা আইস প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এটি করলে শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেগাস নার্ভ বা স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা পুরো শরীর ও মনকে দ্রুত একটি শান্ত অবস্থায় নিয়ে আসে।
গ্রীষ্মের তীব্র রোদের সময়, বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ভারী বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের কাজ করা থেকে একদম বিরত থাকুন। দিনের সবচেয়ে জরুরি কাজগুলো খুব সকালে অথবা বিকেলের পর সন্ধ্যার দিকে করার চেষ্টা করুন।
গরমে শরীর সতেজ রাখতে শুধু সাধারণ পানি পানের অভ্যাস বদলানো দরকার। যদি আপনার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘাম হয়, তবে সাধারণ পানির বদলে ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইনের মতো ইলেকট্রোলাইটযুক্ত তরল পান করুন। কারণ, শরীরে সামান্য পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন হলেও তীব্র ক্লান্তি ও মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।
গ্রীষ্মের তীব্র রোদের সময়, বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ভারী বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের কাজ করা থেকে একদম বিরত থাকুন।
প্রচণ্ড গরমে অনেকেই ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার খেতে চান না, যা শরীরে পানির ঘাটতি আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার হুট করে শরীর খুব বেশি গরম হয়ে গেলে ফ্যান, ভেজা কাপড় কিংবা কুলিং স্প্রে ব্যবহার করে দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে।
যখন বাইরে প্রচণ্ড গরম থাকে, তখন কিছুটা ধীরে চলতে হবে। সব কাজ একবারে করার কোনো প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে জরুরি কথা, তীব্র গরমে শরীর ম্যাজম্যাজ করলে বা মেজাজ খারাপ লাগলে নিজেকে দুর্বল ভেবে কখনোই দোষ দেবেন না। এটি কোনো মানসিক বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং অতিরিক্ত তাপমাত্রার বিরুদ্ধে শরীরের ভেতরের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও জৈবিক প্রতিক্রিয়া।