মানুষের মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন হয় কেন

মাথাব্যথা আমাদের সবারই একটা কমন অসুখ। এমন কেউ নেই, যে জীবনে কখনো মাথাব্যথায় ভোগেনি। প্রায় সব বয়সের মানুষই কোনো না কোনো সময় মাথাব্যথায় ভোগে। মাথাব্যথার মূলত দুটি ধরন আছে। সাধারণ মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন। এই লেখাটি মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে। চলুন জেনে নেওয়া যাক।

মাথাব্যথার তীব্রতা তীক্ষ্ণ ছুরির মতো হোক বা ভেতরে ভেতরে ধুকপুক করার মতো হোক, আপনার সারাটা দিন নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমাদের মস্তিষ্ক নিজে আসলে ব্যথা অনুভব করতে পারে না। তাহলে ব্যথার সময় মাথাটা যেন ভারী কোনো বস্তুর নিচে চাপা পড়ছে বা ফেটে যাচ্ছে, এমন অনুভূতি আসে কীভাবে? মাথাব্যথা বিষয়টি বেশ জটিল। কেন হয়, কীভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি কাজ করে, এসব নিয়ে এখনো অনেক কিছু জানার বাকি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যথা তৈরি হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান একসঙ্গে কাজ করে।

আমাদের শরীরের স্নায়ুগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ব্যথার খবরও ঠিক এভাবেই মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্কের ভেতরে নিজস্ব কোনো ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ু নেই। কিন্তু মাথার রক্তনালি এবং মস্তিষ্ককে ঘিরে রাখা ও সুরক্ষা দেওয়া বিভিন্ন গঠন ব্যথা বুঝতে পারে।

আমাদের শরীরের স্নায়ুগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে
ছবি: এলুমাইন্ড সেন্টারস

এসব জায়গায় আঘাত লাগলে বা কোনো ধরনের ক্ষতি হলে সেখান থেকে বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থ বের হয়। এই রাসায়নিকগুলো স্নায়ুকে সক্রিয় করে তোলে এবং বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কে বার্তা পাঠায়। অর্থাৎ মাথাব্যথা আসলে মস্তিষ্কের ব্যথা নয়, বরং মস্তিষ্কের চারপাশের সংবেদনশীল অংশগুলো থেকে আসা বৈদ্যুতিক সংকেতের ফল।

আরও পড়ুন
আমাদের শরীরের স্নায়ুগুলো বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ব্যথার খবরও ঠিক এভাবেই মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্কের ভেতরে নিজস্ব কোনো ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ু নেই।

মস্তিষ্ক শুধু ব্যথার খবরই জানায় না, স্নায়ুর মাধ্যমে শরীরকে এটাও নির্দেশ দেয় যে ব্যথার প্রতিক্রিয়ায় কী কী উপসর্গ দেখা দেবে। তাই মাথাব্যথার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় অস্বাভাবিক ক্লান্তি, চোখে পানি আসা, নাক দিয়ে পানি পড়া, পেট খারাপ লাগা কিংবা তীব্র আলো ও জোরে শব্দ সহ্য না হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। মাথাব্যথার ফলে মানুষের শরীরে কেন এ ধরনের উপসর্গ দেখা যায়, এটা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার না। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব অস্বস্তিকর অনুভূতি মানুষকে নিজের জীবনযাপন নিয়ে আরও সচেতন হতে বাধ্য করে। যেমন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, আলো-শব্দ এড়িয়ে চলা বা নিয়মিত খাবার ও ঘুমের দিকে নজর দেওয়া। দীর্ঘমেয়াদে এসব অভ্যাস ভবিষ্যতে মাথাব্যথার আক্রমণ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

অনেক সময় শারীরিক চাপের কারণে মাথাব্যথা হতে পারে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে

অনেক সময় মাথাব্যথা হতে পারে শরীরের ওপর কোনো চাপের ইঙ্গিত। এই চাপের কারণে মস্তিষ্ক, মাথা ও গলার চারপাশের স্নায়ু ও রক্তনালিতে রাসায়নিক ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। সেখান থেকেই মাথাব্যথার শুরু। এই চাপ নানারকম হতে পারে। যেমন সংক্রমণ, অ্যালার্জি, বয়ঃসন্ধিকাল বা পিরিয়ডের সময় হরমোনের ওঠানামা, ঠিকমতো না ঘুমানো, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, খাবার বাদ দেওয়া কিংবা অতিরিক্ত ক্যাফেইন খেলেই হতে পারে। মানসিক চাপও বড় একটি কারণ। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সময় অনেকেরই মাথা ধরে। এমনকি আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে সাইনাসে চাপ পড়লেও মাথাব্যথা হতে পারে।

আরও পড়ুন
অনেক সময় মাথাব্যথা হতে পারে শরীরের ওপর কোনো চাপের ইঙ্গিত। এই চাপের কারণে মস্তিষ্ক, মাথা ও গলার চারপাশের স্নায়ু ও রক্তনালিতে রাসায়নিক ও শারীরিক পরিবর্তন ঘটে।

শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি মোটামুটি একই রকম। প্রতি ১১ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জন কখনো না কখনো মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগেছে। মাইগ্রেনে মাথার ভেতর বেশ তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এর সঙ্গে বমি ভাব, আলো বা জোরে শব্দে অস্বস্তির মতো সমস্যাও থাকে। মাইগ্রেন চলাকালে দৈনন্দিন কাজকর্ম করাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। কারণ সামান্য কাজও ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগেও অনেক সময় শরীর খারাপ লাগতে পারে বা খিটখিটে হয়ে যেতে পারে মনমেজাজ। আবার ব্যথা কমে যাওয়ার পরও কিছু সময় অস্বস্তি থেকে যেতে পারে। মাথাব্যথা শুধু ব্যথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, এর প্রভাব শুরু হয় বেশ আগে থেকে। আবার শেষও হয় একটু সময় নিয়ে।

মাইগ্রেনে মাথার ভেতর বেশ তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়
ছবি: পল ব্র্যাডবেরি / গেটি ইমেজ

এখন প্রশ্ন হলো, মাইগ্রেন জিনিসটা আসলে কী? মাইগ্রেন নিয়ে পুরোনো ধারণাগুলোতে বলা হতো, এই ব্যথার কারণ মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের ওঠানামা। কিন্তু এখনকার গবেষণা বলছে, রক্তপ্রবাহ বা রক্তনালির পরিবর্তন সরাসরি ব্যথা শুরু না করলেও পুরো প্রক্রিয়ায় এগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ ও হরমোন, বিশেষ করে সেরোটোনিন ও ইস্ট্রোজেন মাইগ্রেনে আক্রান্ত মানুষের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের কিছু অতিসংবেদনশীল স্নায়ুকোষ একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ঢেউয়ের মতো কার্যকলাপ শুরু করে। ফলে সেরোটোনিনের মতো কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা রক্তনালিকে সংকুচিত করে ফেলে। সেরোটোনিন স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন, তবে এটি শরীরের বিভিন্ন জায়গার রক্তনালি সরু করে দিতে পারে।

আরও পড়ুন
বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ ও হরমোন, বিশেষ করে সেরোটোনিন ও ইস্ট্রোজেন মাইগ্রেনে আক্রান্ত মানুষের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

আবার সেরোটোনিন বা ইস্ট্রোজেনের মাত্রা পরিবর্তিত হলে অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেন শুরু হয়। সেরোটোনিনের পরিবর্তন নারী-পুরুষ উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু ইস্ট্রোজেনের ওঠানামা শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই ঘটে। নারীদের জীবনে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন পর্যায়ে বদলায়। যেমন প্রজননের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকে, পরে ধীরে ধীরে কমে আসে। সন্তানধারণে সক্ষম বয়সে নারীদের শরীরে প্রতিমাসেই ইস্ট্রোজেনের মাত্রায় পরিবর্তন হয়। এই হরমোনগত ওঠানামার সঙ্গেই নারীদের মাইগ্রেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা যায়। এ কারণেই পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি।

মাইগ্রেন তখনই হয়, যখন মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত পাঠানোর কাজে যুক্ত স্নায়ু ঠিকভাবে কাজ করে না
ছবি: স্টেপ অ্যাহেড ক্লিনিক

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে আবার হঠাৎ কমে গেলে রক্তনালিতে সংকোচন শুরু হতে পারে। ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে গেলে মুখ ও মাথার ত্বকের স্নায়ুগুলো ব্যথার প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। আরও সহজে বললে, মাইগ্রেন তখনই হয়, যখন মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত পাঠানোর কাজে যুক্ত স্নায়ু এবং আশপাশের গঠনগুলো ঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে মস্তিষ্কের এই অস্বাভাবিক উদ্দীপনাতেও ব্যথা ও অস্বস্তি তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কখনোই মাথাব্যথার কারণ হওয়ার কথা না। এই সমস্যার পেছনে পরিবেশগত ও জিনগত প্রভাব থাকে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জন্মগতভাবেই মাইগ্রেন হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই দেখা যায়, মাইগ্রেনে ভোগা বেশিরভাগ মানুষের পরিবারে আরও কেউ না কেউ একই সমস্যায় আক্রান্ত।

আরও পড়ুন
গবেষণায় দেখা গেছে, মাইগ্রেন তখনই হয়, যখন মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত পাঠানোর কাজে যুক্ত স্নায়ু এবং আশপাশের গঠনগুলো ঠিকভাবে কাজ করে না।

মাথাব্যথা ঠিক কোন ধরনের, এটা চিহ্নিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঠিক চিকিৎসা অনেকটাই নির্ভর করে ব্যথার ধরন বোঝার ওপর। মাইগ্রেন সাধারণত বেশ তীব্র হয়, তাই শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে এ ধরনের মাথাব্যথা সবচেয়ে বেশি ভোগায়। মাথাব্যথা হওয়ার ঝুঁকি কমানোর কিছু কার্যকর উপায়ও আছে। যেমন পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা। একই সঙ্গে নিয়মিত খাবার খাওয়া, ঠিকমতো ঘুমানো এবং দৈনন্দিন জীবনে শরীরচর্চা করা মাথাব্যথা প্রতিরোধে বেশ সাহায্য করে। আসলে জীবনযাপনের এই ছোট ছোট অভ্যাসই অনেক সময় বড় ধরনের মাথাব্যথা থেকে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করলে মাথাব্যথা হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়
ছবি: ব্রিটানিকা

আইবুপ্রোফেনের মতো সাধারণ ব্যথানাশক অনেক সময় মাথাব্যথা কমাতে যথেষ্ট হলেও কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে যখন ব্যথা খুব তীব্র বা বারবার ফিরে আসে, এই ধরনের ব্যথায় হুটহাট ব্যথানাশক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আবার এমন কিছু ওষুধও আছে, যেগুলো শুধু ব্যথা কমায় না, বরং মাথাব্যথার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে বা আগেভাগেই প্রতিরোধ করতেও সাহায্য করে।

আরও পড়ুন
মাথাব্যথা হওয়ার ঝুঁকি কমানোর কিছু কার্যকর উপায়ও আছে। যেমন পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা। একই সঙ্গে নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং ঠিকমতো ঘুমানো।

ওষুধ ছাড়াও অন্য ধরনের চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে। যেমন শরীরের পেশি ঠিক রাখতে ফিজিওথেরাপি উপকারী। মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা আচরণগত সমস্যার ওপর কাজ করতে বিহেভিয়ারাল থেরাপি অনেককে স্বস্তি এনে দেয়। আবার আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইসও আছে, যেগুলো স্নায়ুতন্ত্রের নির্দিষ্ট অংশকে উদ্দীপিত করে মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

মাথাব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা খুবই জরুরি, বিশেষ করে যদি এটা নতুন সমস্যা হয় বা আগের তুলনায় ব্যথার ধরন বদলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে অন্য কোনো গুরুতর সমস্যাকে বাদ দেওয়ার জন্য ব্রেইন ইমেজিং বা রক্ত পরীক্ষা করানোর প্রয়োজনও হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাথাব্যথার সমস্যা যত দ্রুত চিহ্নিত করা যায়, তত দ্রুত চিকিৎসক আপনার জন্য উপযোগী চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারবেন। শুরুতেই ব্যবস্থা নিলে কষ্ট কমে, জীবনযাত্রার মানও অনেক ভালো থাকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

সূত্র: জনস হপকিন্স মেডিসিন ডট অর্গ ও দ্য কনভারসেশন

আরও পড়ুন