সাক্ষাৎকার
অচেনা মেইল পেয়ে কল ব্যাক করতেই শুনলেন নোবেল জয়ের খবর
২০২৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া তিন বিজ্ঞানীর একজন পিটার হেগেম্যান। তাঁর গবেষণার গল্পটা বেশ অদ্ভুত ও মজার। তিনি কাজ করতেন ক্ল্যামাইডোমোনাস নামের একধরনের সবুজ শ্যাওলা বা শৈবাল নিয়ে। এই শ্যাওলারা কীভাবে আলোর দিকে ছুটে যায়, সেই নিখাদ কৌতূহল থেকেই তিনি এর পেছনের রহস্য খুঁজতে শুরু করেন। আর সেই শ্যাওলার জিনের সূত্র ধরেই জন্ম নেয় অপটোজেনেটিকসের মতো যুগান্তকারী এক প্রযুক্তি, যা দিয়ে আলো ফেলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। চলুন, নোবেল প্রাইজের ওয়েবসাইটের প্রতিনিধি অ্যাডাম স্মিথের সঙ্গে তাঁর ফোনালাপটি পড়া যাক। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন কাজী আকাশ।
অ্যাডাম স্মিথ: হ্যালো। আমি কি পিটার হেগেম্যানের সঙ্গে কথা বলছি?
পিটার হেগেম্যান: হ্যাঁ, বলছি।
অ্যাডাম স্মিথ: চমৎকার। আপনাকে ধন্যবাদ। আমি নোবেল প্রাইজ ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে অ্যাডাম স্মিথ বলছি। নোবেল পুরস্কার জেতার জন্য আপনাকে অনেক অভিনন্দন!
পিটার হেগেম্যান: হ্যাঁ, ধন্যবাদ। আমি আসলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছি।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনি কীভাবে জানতে পারলেন যে নোবেল পেয়েছেন?
পিটার হেগেম্যান: আমি অচেনা এক মানুষের কাছ থেকে একটা ইমেইল পেয়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমাকে কল ব্যাক করুন, আপনার জন্য একটা জরুরি খবর আছে।’ আমি প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিইনি। কিন্তু পরে অবচেতন মনে খেয়াল করলাম, নম্বরটার শুরুতে ০০৩৬। নৌকায় পাল তোলার অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে পড়ল, এটা তো সুইডেনের কোড! আমি ভাবলাম, সুইডেন থেকে ইমেইল, ব্যাপারটা তো বেশ অদ্ভুত। তাই আমি আরেকটু ভালোভাবে খেয়াল করলাম এবং ওই নম্বরে কল করলাম। ওপাশের মানুষটি ছিলেন নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান!
অ্যাডাম স্মিথ: দারুণ গল্প!
পিটার হেগেম্যান: হ্যাঁ। তিনি আমাকে বেলা ১১টার একটু আগে ফোন করেছিলেন, তাই তাঁর সঙ্গে কথা বলা আর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যে খুব বেশি সময়ের ব্যবধান ছিল না।
আমি প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিইনি। কিন্তু পরে অবচেতন মনে খেয়াল করলাম, নম্বরটার শুরুতে ০০৩৬। নৌকায় পাল তোলার অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে পড়ল, এটা তো সুইডেনের কোড!
অ্যাডাম স্মিথ: খবরটা শোনার পর আপনার প্রথম কী মনে হয়েছিল?
পিটার হেগেম্যান: প্রথমে তো আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। এরপর বুঝতে পারলাম, আমি আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও বন্ধু গিওর্গ নাগেল এবং কার্ল ডাইসারোথের সঙ্গে যৌথভাবে এই পুরস্কার পেয়েছি। সবুজ শৈবাল থেকে ফটোরিসেপ্টর খুঁজে বের করা এবং সেটিকে স্নায়ুবিজ্ঞানের কাজে লাগানোর জন্য আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছি। এই দুই বন্ধুর সঙ্গে পুরস্কারটা ভাগ করে নিতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। হ্যাঁ, এমন একটা খবর পাওয়া নিশ্চিতভাবেই অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। তবে কী ঘটে গেল তা পুরোপুরি হজম করতে একটু সময় তো লাগেই।
অ্যাডাম স্মিথ: তা তো বটেই, আমি বুঝতে পারছি। এটা যেমন আপনাদের যৌথ কাজের উদ্যাপন, তেমনি এটা আপনার ব্যক্তিগত কৌতূহলেরও বড় স্বীকৃতি। ক্ল্যামাইডোমোনাস শৈবালের আলোর দিকে ছুটে যাওয়ার ক্ষমতা আপনাকে অবাক করেছিল এবং আপনি এর পেছনের রহস্য খুঁজতে চেয়েছিলেন। সেই কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।
পিটার হেগেম্যান: একদমই সহজ ছিল না। কারণ এই সমস্যাটি নিয়ে প্রথম গবেষণাপত্রটি ছাপা হয়েছিল ১৮৬৬ সালে! সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভা নদীর পানির ক্ল্যামাইডোমোনাস নিয়ে এক রুশ বিজ্ঞানী সেই গবেষণা করেছিলেন। সেটি জার্মান ভাষায় লেখা ছিল এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে প্রকাশিত একটি ফরাসি জার্নালে ছাপা হয়েছিল। এটা অনেক দিনের পুরোনো একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন। ওই বিজ্ঞানী এমন একটা সময়ে এই অণুজীবটি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, যখন বিদ্যুৎই ছিল না! অথচ সেই সময়েও তিনি কত সুন্দরভাবে তাঁর পরীক্ষার বর্ণনা দিয়েছিলেন, ভাবলে অবাক লাগে।
একদমই সহজ ছিল না। কারণ সমস্যাটি নিয়ে প্রথম গবেষণাপত্রটি ছাপা হয়েছিল ১৮৬৬ সালে! সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভা নদীর পানির ক্ল্যামাইডোমোনাস নিয়ে এক রুশ বিজ্ঞানী সেই গবেষণা করেছিলেন।
অ্যাডাম স্মিথ: এটা আসলে প্রকৃতির সবকিছু নিয়েই গবেষণা করার গুরুত্বটা মনে করিয়ে দেয়। এই সামান্য একটা সবুজ শ্যাওলা থেকেই যে আপনি...
পিটার হেগেম্যান: ...হ্যাঁ, পুরোটাই কৌতূহল। ব্যাপারটা খুব মজার। আমার এখনো পরিষ্কার মনে আছে, সায়েন্স জার্নালে যখন প্রথম এই বিষয়ে লেখা ছাপা হয়, তখন তারা মন্তব্য করেছিল, ‘পুকুরের শ্যাওলা থেকে পাওয়া আয়ন চ্যানেল।’ এই কথায় ক্ল্যামাইডোমোনাস নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা মোটেও খুশি হতে পারেননি!
অ্যাডাম স্মিথ: প্রকৃতির কোনো অংশকেই ছোট করে দেখা উচিত নয়।
পিটার হেগেম্যান: হ্যাঁ। তবে নিউরনের জন্য এই চ্যানেলরোডপসিন দেওয়ার পর থেকে ক্ল্যামাইডোমোনাস বেশ বিখ্যাত হয়ে গেছে।
অ্যাডাম স্মিথ: বাহ, কী দারুণ একটা গল্প! সত্যিই অভাবনীয়।
পিটার হেগেম্যান: হ্যাঁ। অনেক সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘অপটোজেনেটিকসকে আরও উন্নত করার জন্য আপনি নতুন প্রজন্মকে কী পরামর্শ দেবেন?’ আমি সবসময় একটাই উত্তর দিই—তাদের অপটোজেনেটিকস উন্নত করার কোনো দরকার নেই। তাদের উচিত নতুন কিছু নিয়ে কাজ করা।
আমার এখনো পরিষ্কার মনে আছে, সায়েন্স জার্নালে যখন প্রথম এই বিষয়ে লেখা ছাপা হয়, তখন তারা মন্তব্য করেছিল, ‘পুকুরের শ্যাওলা থেকে পাওয়া আয়ন চ্যানেল।’
অ্যাডাম স্মিথ: আহা! খুব কী দারুণ পরামর্শ। প্রকৃতি বা নতুন কোনো কিছু থেকে অনুপ্রেরণা নাও এবং ঝুঁকি নিতে শেখো।
পিটার হেগেম্যান: হ্যাঁ। প্রকৃতিতে গবেষণা করার মতো এত এত অদ্ভুত ও চমৎকার প্রাণী আছে!
অ্যাডাম স্মিথ: একদম ঠিক। আমাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার আজকের দিনটি দারুণ কাটুক।
পিটার হেগেম্যান: ঠিক আছে। আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। বিদায়।