সাক্ষাৎকার
এখন জীবন্ত প্রাণীর ভেতরটাও আমরা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি— কার্ল ডাইসারোথ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী
স্টকহোম থেকে যখন ফোনটা আসে, তখন যুক্তরাষ্ট্রে মাঝরাত। চারপাশ নিস্তব্ধ, কিন্তু কার্ল ডাইসারোথ তখনো জেগে কাজ করছিলেন। নোবেল পুরস্কার জেতার খবরটা পাওয়ার ঠিক পরপরই নোবেল প্রাইজের ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে অ্যাডাম স্মিথ তাঁকে ফোন করেন। একজন বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং বাবা হিসেবে কার্লের জীবনের নানা দিক উঠে এসেছে এই ছোট্ট সাক্ষাৎকারে। বাংলায় অনুবাদ করেছেন কাজী আকাশ।
অ্যাডাম স্মিথ: হ্যালো, হ্যালো। আমি কি কার্ল ডাইসারোথের সঙ্গে কথা বলছি?
কার্ল ডাইসারোথ: হ্যাঁ, আমি কার্ল বলছি।
অ্যাডাম স্মিথ: হাই! আমি নোবেল প্রাইজের ওয়েবসাইট থেকে অ্যাডাম স্মিথ বলছি। প্রথমেই আপনাকে অনেক অনেক অভিনন্দন।
কার্ল ডাইসারোথ: ধন্যবাদ। আসলেই এটা অবিশ্বাস্য সম্মান। আমি মোটেই এই পুরস্কার আশা করিনি, তবে আমি ভীষণ আনন্দিত।
অ্যাডাম স্মিথ: খবরটা তো আপনি একদম মাঝরাতে পেলেন! যখন ফোনটা বেজে উঠল, তখন আপনি ঠিক কী করছিলেন?
কার্ল ডাইসারোথ: আমি আসলে...আমার একটু রাত জাগার অভ্যাস আছে। একটা গবেষণাপত্র নিয়ে কাজ করছিলাম। কাজ শেষ করে মাত্র বিছানায় গিয়ে একটু শুয়েছি, ঠিক তখনই ফোনটা এল। আমি নিশাচর। তাই তখনো ঘুমিয়ে পড়িনি। তবে এখন একটা অবস্থায় ছিলাম যে না ঘুমিয়েছি, না জেগে আছি…হে হে। মনে হচ্ছে না আগামী বেশ কিছুক্ষণ আর চোখের পাতা এক করতে পারব!
আমি আসলে...আমার একটু রাত জাগার অভ্যাস আছে। একটা গবেষণাপত্র নিয়ে কাজ করছিলাম। কাজ শেষ করে মাত্র বিছানায় গিয়ে একটু শুয়েছি, ঠিক তখনই ফোনটা এল।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনার কিন্তু ঘুমটা খুব দরকার। কারণ আপনাকে তো একসঙ্গে অনেকগুলো দিক সামলাতে হয়—গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো, রোগীদের চিকিৎসা করা, আর সেই সঙ্গে বাড়িভর্তি বাচ্চাদের!
কার্ল ডাইসারোথ: একদম ঠিক বলেছেন। বাচ্চারা অবশ্য এখন ঘুমাচ্ছে। আমার চেয়ে ওদের ঘুমটাই বেশি দরকার। সত্যি বলতে, এতগুলো দিক একসঙ্গে সামলানো বেশ কঠিন, কিন্তু একইসঙ্গে এটা খুব আনন্দেরও।
অ্যাডাম স্মিথ: তা তো বটেই! আশা করি বাচ্চারা অন্তত আজ রাতটা শান্তিতে ঘুমাবে। যদিও আপনার বাড়িতে হয়তো এখনই মানুষের ভিড় জমতে শুরু করবে। এই রাতটা কীভাবে কাটাবেন বলে ভাবছেন?
কার্ল ডাইসারোথ: বাচ্চাদের এখন শান্তিতে ঘুমাতে দেব। আমি নিজে বরং কিছুটা সময় নিরিবিলিতে কাটাব। ভেবে দেখব আমাদের এই দীর্ঘ পরিশ্রমের কথা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আমার শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং গবেষকদের কথা ভাবব, যাদের ছাড়া এই কাজটা সম্ভব হতো না। তাদের সবার প্রতি আমার বুকভরা কৃতজ্ঞতা। এখন আসলে একটু দম নেওয়ার সময়, পেছন ফিরে দেখার সময়। এরপর আমরা কোথায় যেতে পারি, তা ভাবার সময়।
শরীরের কোনো এক জায়গায় নিখুঁতভাবে পরিবর্তন করে জানতে চাইতেন তার ফলাফল। বিজ্ঞানীদের জন্য তো বটেই, এমনকি রোগবালাই কীভাবে তৈরি হয়, তা বোঝার জন্যও এটা খুব জরুরি।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনাদের আবিষ্কৃত অপটোজেনেটিকস তো রীতিমতো একটা জাদুকরি প্রযুক্তি। জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ইচ্ছামতো সুইচ অন-অফ করে এটি অনেক অজানা রহস্য ভেদ করছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে জানা গেছে, এমন প্রিয় কোনো আবিষ্কারের কথা কি একটু বলবেন? এমন কিছু, যা আমরা আগে জানতাম না, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি।
কার্ল ডাইসারোথ: জীববিজ্ঞানের মতো এত জটিল ব্যবস্থায় কোনো কোষের কাজ নিখুঁতভাবে বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেওয়া স্নায়ুবিজ্ঞানের জন্য বিশাল ব্যাপার। এখন জীবন্ত প্রাণীর ভেতরটাও আমরা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। সাম্প্রতিক সময়ের আমার সবচেয়ে প্রিয় উদাহরণটা হলো হৃৎপিণ্ড নিয়ে। আমরা খুব নিখুঁতভাবে হৃৎস্পন্দনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি এবং দেখেছি, হৃৎস্পন্দনের ওঠা-নামা কীভাবে মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, শরীর থেকে মস্তিষ্কে কীভাবে তথ্য আদান-প্রদান হয়, তা আমরা দেখতে পেরেছি। শরীরের অন্য একটি অঙ্গের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে আমরা দেখেছি, এটি কীভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা মানসিক নানা রোগের ওপর প্রভাব ফেলে।
এতদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ঠিক এই জিনিসটাই চাইতেন। শরীরের কোনো এক জায়গায় নিখুঁতভাবে পরিবর্তন করে জানতে চাইতেন তার ফলাফল। বিজ্ঞানীদের জন্য তো বটেই, এমনকি রোগবালাই কীভাবে তৈরি হয়, তা বোঝার জন্যও এটা খুব জরুরি। আর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার কাছে এর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ মস্তিষ্কের অনেক রহস্যের জট এখন খোলার অপেক্ষায়।
রোগীদের জীবনে ঠিক কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে, তা কাছ থেকে দেখার কারণেই আমি ল্যাবে বসে নতুন নতুন পরীক্ষার নকশা করতে পারি।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনি যেমনটা বললেন, আপনি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এবং আপনি এখনো নিয়মিত রোগীদের সময় দেন।
কার্ল ডাইসারোথ: হ্যাঁ।
অ্যাডাম স্মিথ: নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষদের সঙ্গে আপনি যে কথা বলেন, এই অভিজ্ঞতাটা আপনার গবেষণায় কীভাবে সাহায্য করে?
কার্ল ডাইসারোথ: এটা আমাকে সবসময় নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। মানুষের জীবনে কোন জিনিস সবচেয়ে জরুরি, তা বুঝতে সাহায্য করে। রোগীরা যখন তাঁদের যন্ত্রণার কথা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন...আমি জানি, যারা এই কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের পক্ষেও এটা ভাষায় প্রকাশ করা কতটা কঠিন! এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করা তো আরও কঠিন। রোগীদের জীবনে ঠিক কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে, তা কাছ থেকে দেখার কারণেই আমি ল্যাবে বসে নতুন নতুন পরীক্ষার নকশা করতে পারি। আমার শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারি, একটা অসুস্থ মস্তিষ্কের ঠিক কোথায় নজর দেওয়া দরকার।
রোগীরা যখন তাঁদের যন্ত্রণার কথা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন...আমি জানি, যারা এই কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের পক্ষেও এটা ভাষায় প্রকাশ করা কতটা কঠিন!
অ্যাডাম স্মিথ: আমি জানি মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করার ব্যাপারে আপনি ভীষণ আগ্রহী। নোবেল পুরস্কার তো এই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙার ক্ষেত্রে একটা বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে, তাই না?
কার্ল ডাইসারোথ: আমারও তা-ই বিশ্বাস। আমি সবসময় মানুষকে বোঝাতে চাই, প্রতিটি মানসিক রোগেরই একটা বড় প্রেক্ষাপট থাকে। মানুষের ভেতরে এই সমস্যাগুলো এমনি এমনি তৈরি হয়নি; আমাদের পরিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে টিকে থাকার জন্য হয়তো এদের কোনো না কোনো দরকার ছিল।
মানব ইতিহাসের এই বিশাল পথচলা, আমাদের জিন ও অভিজ্ঞতার যে দারুণ মেলবন্ধন, তা যদি আমরা একটু গভীরভাবে বুঝতে পারি, তাহলে একে অপরের প্রতি আমরা আরও সহানুভূতিশীল হতে পারব। যে মানুষগুলো নীরবে কষ্ট পাচ্ছে, যাদের বোঝানোর মতো ভাষা নেই, এই বড় পরিসরের ভাবনাটা তাদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব করতে পারে। আমার বিশ্বাস, এর মাধ্যমে মানুষের প্রতি মানুষের বোঝাপড়া ও সহানুভূতি আরও বাড়বে।
অ্যাডাম স্মিথ: খুব চমৎকার এবং গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভীষণ ভালো লাগল। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
কার্ল ডাইসারোথ: আপনার সঙ্গে কথা বলেও আমার খুব ভালো লেগেছে। ভালো থাকবেন। বিদায়।