যুক্তরাষ্ট্রে মিলল বিরল দুই মাথার কচ্ছপ, রূপকথার গল্প যেন বাস্তব
মাত্র ৫.২ গ্রামের একটি ছোট্ট কচ্ছপছানা, যার শরীর একটি কিন্তু মাথা দুটি! ম্যাসাচুসেটসের সৈকতে পাওয়া রূপকথার মতো দেখতে এই প্রাণীটি আসলে কীভাবে জন্ম নিল? দুই মাথার আলাদা স্নায়ুযুদ্ধ সামলে একটি শরীর নিয়ে কীভাবে হাঁটছে, কীভাবে খাবার খাচ্ছে? জিন আর পরিবেশের কোন ভয়ংকর ত্রুটির কারণে ভ্রূণটি পুরোপুরি আলাদা হতে পারল না?
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের কেপ কড এলাকাটি এমনিতে গলদা চিংড়ি ও ভয়ংকর গ্রেট হোয়াইট শার্কের জন্য পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু সম্প্রতি এই ছুটির কাটানোর চমৎকার জায়গাটিতে এমন এক অতিথি এসে হাজির হয়েছে, যাকে দেখে জীববিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অবাক! মাত্র ৫.২ গ্রাম ওজনের ছোট্ট একটি ডায়মন্ডব্যাক টেরাপিন কচ্ছপছানা উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে। তবে ওজনের জন্য এটি জনপ্রিয় হয়নি, বরং এর শরীর একটি হলেও মাথা দুটি। রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে যেন আস্ত একটি অদ্ভুত প্রাণী বাস্তবের মাটিতে নেমে এসেছে!
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ম্যাসাচুসেটসের বার্নস্টেবলে অবস্থিত কেপ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারে এই বিরল প্রাণীটিকে নিয়ে আসা হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলফ্লিট শহরের একটি সংরক্ষিত বাসা তৈরির জায়গা থেকে ম্যাস অডুবন ওয়েলফ্লিট বে ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির প্রতিনিধিরা প্রাণীটিকে উদ্ধার করেন। আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কীভাবে সম্ভব হলো?
মাত্র ৫.২ গ্রাম ওজনের ছোট্ট একটি ডায়মন্ডব্যাক টেরাপিন কচ্ছপছানা উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে। তবে ওজনের জন্য এটি জনপ্রিয় হয়নি, বরং এর শরীর একটি হলেও মাথা দুটি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই শারীরিক অবস্থাকে বলা হয় বাইসেফালি। এটি মূলত ভ্রূণের বিকাশের সময় ঘটা একটি বিরল ত্রুটি। মাতৃগর্ভের ভেতর যখন মাত্র একটি ভ্রূণ ভেঙে অভিন্ন যমজ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন কোনো কারণে সেই বিভাজনটি সম্পূর্ণ না হলে এমনটা ঘটে। এর ফলে যমজ প্রাণীরা একটি শরীরের সঙ্গেই জোড়া লেগে থাকে, কিন্তু তাদের দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও আলাদা মাথা তৈরি হয়।
নিউ ইংল্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের অধীনে কেপ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টার পরিচালিত হয়। এর প্রধান নির্বাহী জ্যাক মের্টজ জানিয়েছেন, ডায়মন্ডব্যাক টেরাপিন প্রজাতির মধ্যে বাইসেফালির ঘটনা বেশ বিরল। তিনি জানান, এই অদ্ভুত জন্মের পেছনে জিনতত্ত্ব এবং এপিজেনেটিকসের ভূমিকা রয়েছে।
জ্যাক মের্টজ বলেন, ‘কচ্ছপদের দীর্ঘায়ু, ডিম পাড়ার জন্য প্রতি বছর একই জায়গায় ফিরে আসার প্রবণতা এবং বিপন্ন প্রজাতি হওয়ার কারণে এদের জিনের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণেই হয়তো এমন ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।’ শুধু তা-ই নয়, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার সময় পারিপার্শ্বিক পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, মাটির গঠন, এমনকি মা-বাবা কচ্ছপটি কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসেছিল কি না, তার ওপরও ভ্রূণের এই বিকাশ নির্ভর করে।
শরীর আর মাথার মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় বন্য পরিবেশে কচ্ছপছানাগুলোর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে এরা প্রকৃতির এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্যের একটি বড় সূচক হিসেবে কাজ করে।
দুই মাথার বেঁচে থাকার স্নায়ুযুদ্ধ
মাথা দুটি হওয়ার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, সিদ্ধান্ত কে নেবে? ডান দিকের মাথা হয়তো চাইছে ডানে যেতে, আর বাঁ দিকের মাথা চাইছে সোজা যেতে। ফলে একটি সাধারণ কচ্ছপের মতো হাঁটাচলা করা বা খাবার খাওয়া এদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুই মাথাওয়ালা বা আংশিকভাবে জোড়া লাগা সামুদ্রিক কচ্ছপের ছানাদের মুখমণ্ডল ও মেরুদণ্ডে বড় ধরনের সমস্যা থাকে। এরা সাধারণ কচ্ছপছানাদের চেয়ে আকারেও ছোট হয়। শরীর আর মাথার মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় বন্য পরিবেশে এদের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে এই কচ্ছপছানাগুলো প্রকৃতির এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্যের একটি বড় সূচক হিসেবে কাজ করে। কারণ এদের ত্রুটিগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা পরিবেশের দূষণ বা অন্যান্য পরিবর্তনের আঁচ পান।
অদ্ভুত হলেও সত্যি, দুই মাথার প্রাণী পৃথিবীতে এটিই প্রথম নয়। গত পাঁচ বছরে শুধু ওই এলাকাতেই এটি তৃতীয় বাইসেফালিক কচ্ছপ।
এছাড়াও নেদারল্যান্ডসের উপকূলে দুই মাথার পরপয়েস (ডলফিনের মতো প্রাণী) এবং তুরস্কের সৈকতে দুই মাথার ডলফিনও পাওয়া গেছে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুই মাথাওয়ালা বা আংশিকভাবে জোড়া লাগা সামুদ্রিক কচ্ছপের ছানাদের মুখমণ্ডল ও মেরুদণ্ডে বড় ধরনের সমস্যা থাকে।
কোথায় দেখা মেলে এদের
ডায়মন্ডব্যাক টেরাপিন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক এবং উপসাগরীয় উপকূলের ঈষৎ লোনা পানির জলাভূমিতে বাস করে। ব্র্যাকিশ ওয়াটার হলো এমন পানি, যা নদীর মিঠা পানির চেয়ে বেশি নোনতা, কিন্তু সাগরের নোনা পানির চেয়ে কম। সাধারণত যেখানে নদী গিয়ে সাগরে মেশে, সেখানেই এদের দেখা মেলে। ম্যাসাচুসেটসের বিপন্ন প্রজাতি আইন অনুযায়ী এই কচ্ছপগুলোকে হুমকির সম্মুখীন ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমানে বিশেষজ্ঞ পশুচিকিৎসকেরা এই বিরল কচ্ছপছানাটির শারীরিক অবস্থার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। জ্যাক মের্টজের ভাষায়, ‘এটি একটি রোমাঞ্চকর বিষয় এবং এর ওপর আরও অনেক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আমরা এই দুই মাথার প্রাণীদের যত্ন নিতে পেরে দারুণ আনন্দিত। এই প্রাণীকে নিয়ে গবেষণা হয়তো ভবিষ্যতের গবেষণায় নতুন কোনো দরজা খুলে দেবে।’