চলে গেলেন দেশের প্রথম নারী বন্যপ্রাণী গবেষক অধ্যাপক নূরজাহান সরকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নূরজাহান সরকারছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা বা স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বাইরে প্রকৃতির কথা বলা মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। আজীবন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করে যাওয়া এমন মানুষ খুবই কম। হয়তো প্রকৃতি তার রাজ্যকে পরম মমতায় আগলে রাখার জন্য মানবজাতির মধ্য থেকেই কিছু মানুষকে আপন মনে সুরক্ষাকবচ হিসেবে তৈরি করে নেয়। কালের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলার বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় গত ছয় দশক ধরে এমনই এক সুরক্ষাকবচ ছিলেন অধ্যাপক নূরজাহান সরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নূরজাহান সরকার ছিলেন দেশের প্রথম নারী বন্যপ্রাণী গবেষক ও শিক্ষক। মায়ের মমতায় তিনি আজীবন যুদ্ধ করেছেন বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায়, যা ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। কখনো কোনো মেগা প্রকল্পে যুক্ত হয়ে বা তোষামোদ করে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করেননি; বরং তাঁর কণ্ঠে সর্বদা ছিল বন্যপ্রাণী সুরক্ষার জোরালো আওয়াজ। বন্যপ্রাণীর সুরক্ষায় তিনি রাজপথে দাঁড়াতেও পিছপা হননি।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার ৭৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অনন্তকালের যাত্রায় শামিল হয়েছেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন তাঁর হাজারো শিক্ষার্থী, বন্যপ্রাণী কর্মী, প্রাণিবিদ, গবেষক এবং শিক্ষক। গত ছয় দশকে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী গবেষণার ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে শতাধিক গবেষণাপত্র, হাজারো বাংলা লেখনী এবং টেলিভিশন-রেডিওতে অসংখ্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক আয়োজন।

আরও পড়ুন
১৯৪৮ সালে ঝালকাঠির নলছিটির ভেরনবাড়িয়া গ্রামে জন্ম নেন নূরজাহান সরকার। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনায় আগ্রহী। বৃত্তির অর্থে পড়াশোনা করেছেন তিনি।

সামাজিক বাধা পেরিয়ে প্রথম নারী গবেষক

ষাটের দশকে বাংলাদেশের একজন নারীর জন্য সচরাচর সমাজব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিজেকে উজাড় করে দেওয়াটা সহজ ছিল না। সামাজিক ধরাবাঁধা চৌকাঠ পেরিয়ে বন-জঙ্গলে ঘোরা কিংবা মানুষের দ্বারে দ্বারে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রথম নারী হিসেবে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম নারী, যিনি বন্যপ্রাণীবিদ্যায় দেশের বাইরে থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের পক্ষীবিদ্যায়ও তিনি ছিলেন প্রথম পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বন্যপ্রাণী শাখায় তিনি ছিলেন প্রথম নারী শিক্ষক। এমন অসংখ্য কালজয়ী ইতিহাসের সাক্ষী অধ্যাপক নূরজাহান সরকার। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তি আর সুদৃঢ় মনোবলের অধিকারী।

১৯৪৮ সালে ঝালকাঠির নলছিটির ভেরনবাড়িয়া গ্রামে জন্ম নেন নূরজাহান সরকার। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনায় আগ্রহী। বৃত্তির অর্থে পড়াশোনা করেছেন তিনি। শিক্ষাজীবনে কখনো দ্বিতীয় হননি।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশের পক্ষীবিদ্যায়ও অধ্যাপক নূরজাহান সরকার ছিলেন প্রথম পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বন্যপ্রাণী শাখায় তিনি ছিলেন প্রথম নারী শিক্ষক।

তবে তাঁর এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। সে সময় মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু নূরজাহান সরকার সেই পথ বেছে নেননি। তিনি ঠিক করেছিলেন, আগে নিজের পড়াশোনা শেষ করবেন। তাঁর মা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় সহায়। এমএসসি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মেয়ের বিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে তিনি ছিলেন অনড়।

উচ্চশিক্ষায় নূরজাহান বেছে নেন বন্যপ্রাণীবিদ্যা। তখন একজন নারীর জন্য এই বিষয় বেছে নেওয়া ছিল অনেক সাহসের ব্যাপার। বন-জঙ্গলে গিয়ে গবেষণা করা এবং দুর্গম এলাকায় কাজ করার কারণে তাঁকে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। প্রখ্যাত প্রাণিবিদ অধ্যাপক কাজী জাকের হোসেনও তাঁকে এই পেশার কঠিন দিকগুলো সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

কিন্তু নূরজাহান সরকার পিছপা হননি। কেন বন্যপ্রাণী নিয়ে পড়তে চান, তা লিখিতভাবে জানিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অটল ছিলেন। প্রকৃতির কাছাকাছি বড় হওয়ায় বন ও মাঠের কাজ তাঁর কাছে কখনোই ভয়ের ছিল না।

রমনা পার্ক ও বলধা গার্ডেন থেকে শুরু হয় তাঁর মাঠগবেষণা। পরে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কাজ। কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে থামাতে পারেনি। গবেষণার পাশাপাশি তিনি সাধারণ মানুষকে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যুক্ত করার নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শুধু আইন নয়, মানুষের সচেতনতা ও ভালোবাসাই বন্যপ্রাণী রক্ষার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।

আরও পড়ুন
রমনা পার্ক ও বলধা গার্ডেন থেকে শুরু হয় নূরজাহান সরকারের মাঠগবেষণা। পরে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কাজ।

ভাষাহীন প্রাণীর নির্ভীক কণ্ঠস্বর

শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি অধ্যাপক নূরজাহান সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান, তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভাষাহীন বন্যপ্রাণীর কণ্ঠস্বর। বন্যপ্রাণীরা তো মানুষের ভাষায় নিজেদের কথা বলতে পারে না, তাই তাদের হয়ে কথা বলতেন তিনি। বন্যপ্রাণীর স্বার্থবিরোধী কোনো ঘটনা তাঁর নজরে এলে তিনি কখনোই নীরব থাকতেন না। প্রয়োজনে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন, মানুষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং বন্যপ্রাণীর অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

বিশালদেহী হাতি থেকে শুরু করে ছোট্ট টুনটুনি, কোনো প্রাণীই তাঁর কাছে ছোট ছিল না। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে।

তিনি মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন, বন্যপ্রাণী আমাদের প্রতিপক্ষ নয়; তারা আমাদের সহযাত্রী ও পরম বন্ধু। কৃষিতে পরাগায়ন, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, বীজ ছড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বন ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা; প্রতিটি ক্ষেত্রেই বন্যপ্রাণীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের অর্থনীতি ও মানবজীবন নানাভাবে তাদের ওপর নির্ভরশীল। নিজের লেখা, বক্তব্য ও দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে তিনি এই চরম সত্যটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন।

আরও পড়ুন
বিশালদেহী হাতি থেকে শুরু করে ছোট্ট টুনটুনি, কোনো প্রাণীই নূরজাহান সরকারের কাছে ছোট ছিল না। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে।

বন্যপ্রাণীর জন্য তাঁর এই অবস্থান শুধু একজন গবেষকের দায়িত্ববোধ থেকেই ছিল না, এর সঙ্গে মিশে ছিল গভীর মমতা ও দায়বদ্ধতা। যে প্রাণীরা মানুষের ভাষায় নিজেদের কষ্টের কথা বলতে পারে না, তাদের না-বলা কথাগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরাকেই তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন।

তাই অধ্যাপক নূরজাহান সরকার শুধু একজন শিক্ষক বা বন্যপ্রাণী গবেষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রকৃতির পক্ষে দাঁড়ানো এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। তাঁর কণ্ঠে বহুবার উঠে এসেছে সেই প্রাণীদের কথা, যাদের বাঁচানো মানেই আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখা।

তাঁর এই নিঃস্বার্থ কর্মফল তাঁকে এনে দিয়েছিল গভীর শ্রদ্ধা, সম্মান এবং স্বীকৃতি। তিনি তাঁর কাজের জন্য বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত হন। পেয়েছেন ‘প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক’সহ অসংখ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা।

সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক নূরজাহান সরকারের বর্ণাঢ্য ও কর্মময় জীবনী এ দেশের প্রকৃতি ও বনকর্মীদের চিরকাল আলোকিত করুক। তাঁর সেই নির্ভীক আওয়াজ বেঁচে থাকুক নতুন প্রজন্মের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে।

লেখক: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন