অন্য প্রাণীদের মতো আমরা কাঁচা মাংস খেতে পারি না কেন

অন্য প্রাণীরা কাঁচা মাংস অনায়াসে হজম করে ফেলতে পারলেও আমরা তা খেতে পারি না কেন?ছবি: গেটি ইমেজ/আইস্টক

একটা শিয়াল বা কুকুর রাস্তায় পড়ে থাকা পচা মাংস অনায়াসে খেয়ে নেয়। আর শকুন তো আধপচা শবদেহ দিব্যি গলাধঃকরণ করে নিশ্চিন্তে। আর বাঘ, সিংহসহ অন্যান্য মাংসাসী জন্তুর কাঁচা মাংস খেয়েই বেঁচে থাকে। তাতে এসব জীব-জন্তুদের কখনো হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে বলে কখনো শোনা যায়নি! কিন্তু মানুষ সামান্য কম-সিদ্ধ মাংস খেলেই সবকিছু গড়বড় হয়ে যেতে পারে। আর কাঁচা মাংস খেলে তো কথাই নেই। পেটের নানারকম অসুখে ভুগতে শুরু করে। তখন শৌচাগার হয়ে উঠতে পারে তার স্থায়ী ঠিকানা। তাহলে প্রশ্ন আসে, অন্য প্রাণীরা কাঁচা মাংস অনায়াসে হজম করে ফেলতে পারলেও আমরা তা খেতে পারি না কেন? অন্য প্রাণীদের সঙ্গে আমাদের এই পার্থক্য কোথায়?

প্রশ্নটা শুনতে সহজ মনে হলেও উত্তরটা বেশ জটিল। এর পেছনে রয়েছে মানুষের হাজার হাজার বছরের খাদ্যাভাস, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অভিযোজনের কাহিনি। তবে সে কথা বলার আগে শুরুতেই একটা জরুরি সংশোধনী দেওয়া দরকার। আমরা আসলে একেবারেই কাঁচা মাংস খাই না, তা কিন্তু নয়। যেমন ফ্রান্সের স্টেক টার্টার কিংবা জাপানের সুশি বা সাশিমির কথাই ধরুন—এগুলো কিন্তু কাঁচা বা প্রায়-কাঁচা মাছ বা মাংসের তৈরি। সেগুলো দুনিয়ায় লাখো মানুষ আনন্দের সঙ্গে খায়। তাতে খেয়ে খুব বেশি সমস্যা হয়েছে বলে শোনা যায় না। অবশ্য সেখানে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়।

আরও পড়ুন
অন্য প্রাণীরা—যেমন পাখি, শিয়াল, শকুন—কাঁচা এবং অনেক সময় পচা মাংসও অনায়াসে হজম করে ফেলতে পারে। কারণ তাদের পাকস্থলী ও অন্ত্র তীব্র অম্লযুক্ত এবং জীবাণুনাশক।

যাই হোক, মানুষের ক্ষেত্রে কাঁচা মাংস বা কাঁচা মাছ খাওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রোগজীবাণু। কাঁচা মাংসে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীব থাকতে পারে। সেগুলো পেটে ঢুকলে আমাদের মারাত্মক সব অসুস্থতা ঘটাতে পারে। এই ঝুঁকি কতটা বেশি, তা নির্ভর করে মাংসটা কতটা সাবধানে কাটা হয়েছে, কতক্ষণ খোলা বাতাসে রাখা হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ের ওপর। আরও মজার ব্যাপার হলো—মাটন বা গরুর কিমার ক্ষেত্রে কতটি গরুর মাংস একসঙ্গে মেশানো হয়েছে, তার উপরও এ ঝুঁকির পরিমাণ নির্ভর করে। কারণ পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি প্যাকেটে যত বেশি গরুর মাংস মেশানো থাকে, দূষণের সুযোগও তত বেশি।

অন্য প্রাণীরা—যেমন পাখি, শিয়াল, শকুন—কাঁচা এবং অনেক সময় পচা মাংসও অনায়াসে হজম করে ফেলতে পারে। কারণ তাদের পাকস্থলী ও অন্ত্র তীব্র অম্লযুক্ত এবং জীবাণুনাশক। প্রকৃত মাংসাশী—যেমন সিংহ বা নেকড়ে—তাদের পাকস্থলীর অ্যাসিড অত্যন্ত শক্তিশালী। এর পিএইচ (pH) প্রায় ১-এর কাছাকাছি। এই শক্তিশালী অ্যাসিড সহজেই কাঁচা মাংসে থাকা বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী আর পচনশীল উপাদানকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

শকুনের কথা বলতে গেলে তো রীতিমতো অবাক হতে হয়। এক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, একটি শকুনের মুখে পাঁচশোরও বেশি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া বাস করতে পারে, অথচ সেই একই শকুনের পাকস্থলীতে থাকে মাত্র ৭০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া। অর্থাৎ তাদের পেটের ভেতর রয়েছে সত্যিকারের এক প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক কারখানা। শকুনের পেটে গেলেই বেশিরভাগ ক্ষতিকর জীবাণু কুপোকাত। আমাদের জন্য যা চরম বিপজ্জনক, সেই ব্যাকটেরিয়াগুলো শকুনের পেটে সুখে শান্তিতে বসবাস করে।

আরও পড়ুন
এক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, একটি শকুনের মুখে পাঁচশোরও বেশি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া বাস করতে পারে, অথচ সেই একই শকুনের পাকস্থলীতে থাকে মাত্র ৭০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া।

অন্যদিকে মানুষের পাকস্থলীর অ্যাসিড তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে কাঁচা মাংসে থাকা সালমোনেলা বা ই. কোলাইয়ের মতো জীবাণু আমাদের পেটে সহজেই বেঁচে থাকতে পারে। আর সেগুলো আমাদের শরীরে সংক্রমণ ঘটায়। তাতে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি—ডায়রিয়া, বমি, জ্বর—যা অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে। অবশ্য অন্য প্রাণীরাও ক্ষতিকর জীবাণু থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ মাংসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর পরজীবী অনেক সময় তাদেরও আক্রান্ত করে।

অন্য জীবজন্তুর মতো মানুষের ক্ষেত্রে এরকম কোনো ব্যবস্থা নেই। মানুষের পরিপাকতন্ত্র শুরু থেকেই মাংসখেকো প্রাণীদের থেকে আলাদা। তাই আমাদের জন্য দূষিত বা জীবাণুযুক্ত মাংস নিরাপদ করার একমাত্র উপায় হলো তাপ। রান্নার সময় তাপমাত্রা ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছালে বেশিরভাগ ক্ষতিকর জীবাণু মরে যায়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাংস সঠিকভাবে রান্না হয়েছে কিনা বোঝার জন্য অনুমানের উপর নয়, থার্মোমিটারের উপর ভরসা রাখতে।

আবার প্রকৃত শিকারি (বাঘ, সিংহ) প্রাণীদের ধারালো ক্যানাইন দাঁত থাকে। এটা দিয়ে তারা সহজেই মাংস ছিঁড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু মানুষের দাঁত তুলনামূলকভাবে ভোঁতা, যা মিশ্র খাদ্যের জন্য উপযোগী। আমরা ফল, শাকসবজি, শস্য আর রান্না করা মাংস—সবই খেতে পারি; কিন্তু কাঁচা, শক্ত মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য আমাদের চোয়াল যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। আসলে আমাদের চোয়াল দীর্ঘসময় ধরে কাঁচা মাংস চিবিয়ে ভাঙার জন্য তৈরি হয়নি।

আরও পড়ুন
আমাদের জন্য জীবাণুযুক্ত মাংস নিরাপদ করার একমাত্র উপায় হলো তাপ। রান্নার সময় তাপমাত্রা ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছালে বেশিরভাগ ক্ষতিকর জীবাণু মরে যায়।

প্রশ্ন আসতে পারে, শুধু জীবাণু থেকে বাঁচাটাই কি আমাদের পূর্বপুরুষদের রান্না শেখার একমাত্র কারণ ছিল? সম্ভবত না। কারণ সেই আদিম যুগে জীবাণু সম্পর্কে এসব জ্ঞান মানুষের ছিলই না। তাই অনেক গবেষক মনে করেন, রান্নার শুরুটা হয়েছিল একটু ভিন্ন কারণে।

অনেক বিজ্ঞানীর অনুমান, আদিম কালে মানুষ কাঁচা মাংসই খেত। কিন্তু মানুষ আগুন জ্বালানো আর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করার পর ধীরে ধীরে সব বদলে যেতে শুরু করে। মানুষ প্রথম আগুন জ্বালানো এবং নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল প্রায় দশ লাখ বছর আগে। সে সময় দেখা গেল, কাঁচা মাংসের চেয়ে রান্না করা মাংস সুস্বাদু এবং চাবানোও সহজ। এমনকি তা হজম করা আরও সহজ এবং কম সময় লাগে। তখন থেকেই মানুষের মধ্যে অভ্যাসটা রয়েই গেল।

রান্নার এই সুবিধা কেবল মাংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডের প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্ট রিচার্ড রাংহাম পরামর্শ দিয়েছেন, সবজি, মূল এবং কন্দজাতীয় খাবারগুলোও রান্না করলে অনেক বেশি হজমযোগ্য হয়ে ওঠে। এগুলো মাংসের মতো অত শক্তি না দিলেও আদিম মানুষদের বাড়তি কিছু সুবিধা দিয়েছিল।

আসলে রান্না করার ফলে মাংস এবং সবজির কঠিন আঁশগুলো ভেঙে যায়। ফলে হজমে কম সময় ও কম শক্তি লাগে। ফলে আমাদের শরীর কম শক্তি ব্যয় করে বেশি পুষ্টি পেতে শুরু করে। এর মানে হলো, খাওয়ার পেছনে কম সময় ব্যয় করে বাকি সময় অন্য কাজে দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল আরও বিস্ময়কর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই রান্না করে খাওয়ার কারণেই আমাদের মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরও পড়ুন
মানুষ প্রথম আগুন জ্বালানো এবং নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল প্রায় দশ লাখ বছর আগে। সে সময় দেখা গেল, কাঁচা মাংসের চেয়ে রান্না করা মাংস সুস্বাদু এবং চাবানোও সহজ।

এ ব্যাপারে ব্রাজিলিয়ান বিজ্ঞানী সুজানা হার্কুলানো-হৌজেল এবং কারিনা ফনসেকা-আজেভেদো একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব কষেছেন। রান্না আবিষ্কারের আগে, আদিম মানুষকে যদি কাঁচা খাবার থেকেই এত শক্তি যোগাড় করতে হতো, তাহলে তাকে প্রতিদিন আট থেকে নয় ঘণ্টা শুধু খেতেই হতো। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক সচল রাখার জন্য প্রচুর শক্তির দরকার। হিসেবে দেখা যায়, মস্তিষ্কের ওজন শরীরের মোট ওজনের মাত্র আড়াই শতাংশ হলেও শরীরের নেওয়া মোট শক্তির ২০ শতাংশ সে একাই খরচ করে। তাই রান্না করে খাওয়ার কারণে একদিকে যেমন মাংস ও সবজি নরম হয়েছে, তেমনি চোয়াল ও দাঁত ছোট হয়েছে, হজমে শক্তি কম লেগেছে। আর সেই উদ্বৃত্ত শক্তি মস্তিষ্কে নিতে পেরেছে। ফলে ধীরে ধীরে আমাদের মস্তিষ্ক বড় হতে পেরেছে। সেই বড় মস্তিষ্ক নিয়েই মানুষ আজকের আধুনিক ও বুদ্ধিমান মানুষে পরিণত হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। প্রকৃত মাংসাশী প্রাণীরা নিয়মিত কাঁচা মাংস খায়। তাই তাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সেই অনুযায়ী শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। মানুষের ইমিউন সিস্টেম গড়ে উঠেছে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন পরিবেশে—যেখানে রান্না করা খাবারই প্রধান। ফলে আমরা কাঁচা মাংসের ঝুঁকির সঙ্গে ততটা মানিয়ে নিতে পারি না।

কাজেই বলা যায়, মাংস রান্না করা আমাদের বুদ্ধিমান হতে সাহায্য করেছে। তাই বলে বেশি বেশি বারবিকিউ করলেই যে আপনি আরও বুদ্ধিমান হয়ে যাবেন, তা কিন্তু নয়।

সূত্র: সায়েন্স অব হোয়াই/ জে ইনগ্রাম

উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুন